এখনো বরাদ্দ বাকি ৩০৩ একর

চট্টগ্রামের আগামীর বন্দর বলে খ্যাত বে-টার্মিনালের জন্য ১০ বছরে ভূমি বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৫৬৭ একর। এখনো বাকি আছে ৩০৩ একর। ২০১৪ সালে ভূমি বরাদ্দের আবেদন করার পর নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রথম দফায় ৬৭ একর ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে পাওয়া যায় প্রায় সাত বছর আগে। সর্বশেষ গত মাসে পাওয়া গেল ৫০০ একর।

বরাদ্দকৃত এই ৫০০ একর সরকারি খাসজমি বন্দোবস্তের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (চবক) সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে ৩ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৭ সালে ব্যক্তি মালিকানাধীন ৬৭ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল ৩৬২ কোটি টাকায়। চট্টগ্রাম বন্দরের পক্ষ থেকে ৮৭০ একর ভূমির আবেদন করা হয়েছিল।

প্রতীকী মূল্যে বে-টার্মিনালের জন্য ৫০০ একর ভূমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ভূমি বরাদ্দের ফলে বে-টার্মিনালের নির্মাণকাজে অনেক গতি আসবে। ২০১৪ সাল থেকে ভূমি বরাদ্দ নিয়ে কার্যক্রম চলমান থাকলেও সর্বশেষ গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে এবং এর ফসল হলো প্রতীকী মূল্যে বরাদ্দ পাওয়া।’

বাকি ৩০৩ একর ভূমি কবে নাগাদ পাওয়া যাবে জানতে চাইলে রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল বলেন, বাকি জায়গাগুলোর মধ্যে কিছু জায়গা রয়েছে ব্যক্তি মালিকানাধীন ও কিছু সরকারের বন বিভাগের জায়গা। কিন্তু এখন আর বন নেই। তাই সেসব জায়গা কোন প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ দেওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই হয়তো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

নগরীর হালিশহর সাগর পাড়ে বে-টার্মিনালের জন্য ভূমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের মে মাসে। প্রথম দফায় ভূমি বন্দোবস্তের আবেদন করা হয়। পরে তা অধিগ্রহণের জন্য আবেদন করা হলে ৬৭ একর ভূমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অবশিষ্ট থেকে যায় ৮০৩ একর ভূমি। গত ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ৮০৩ একর ভূমির জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অধিগ্রহণ মূল্যবাবদ ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি ৮৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪১ টাকা চেয়ে চট্টগ্রাম বন্দরকে চিঠি লেখে। জেলা প্রশাসনের এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নৌ-মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখে প্রতীকী মূল্যে বরাদ্দের জন্য। নৌ-মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতীকী মূল্যে বন্দোবস্ত হিসেবে ভূমি বরাদ্দ দিতে বলা হয়। আর সেই হিসেবে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভূমি বন্দোবস্ত বাবদ ৭৯২ একর খাসভূমির বিপরীতে ১১ হাজার ১০০ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য বলা হয় বন্দর কর্তৃপক্ষকে। আর এই চিঠি চালাচালির পর্যায়ে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাসজমি-১ অধিশাখার উপসচিব মো. আমিনুর রহমান স্বাক্ষরিত ৩টি স্মারকে ৫০০ দশমিক ৬৯৬৩ একর ভূমি ৩ কোটি ৩ টাকা প্রতীকী মূল্যে বরাদ্দের আদেশ দেওয়া হয়।

এই আদেশের ১(জ) শর্তে বলা হয়, ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়েল, ১৯৯০-এর ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে অকৃষি জমির দীর্ঘমেয়াদি লিজ চুক্তি অনুযায়ী তা ৩০ বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা পরে ৯৯ বছর পর্যন্ত নবায়ন করা যাবে।

ভূমি বরাদ্দে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (ভূমি অধিগ্রহণ) তানভীর-আল-নাসীফ বলেন, ‘ভূমি বরাদ্দের অনেক প্রক্রিয়া রয়েছে। সেসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বরাদ্দ দিতে হয়। আর বে-টার্মিনাল তো জাতীয় ইস্যু। এখানে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কাছ থেকেও নির্দেশনা এসেছে।’

অধিগ্রহণ ও বন্দোবস্তের মধ্যে তফাত প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে প্রত্যাশিত সংস্থাকে দিয়ে থাকি। সেই হিসেবে হয়তো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রথম দফায় ৬৭ একর ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন যে ৫০০ একর ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, এর সবটুকুই সরকারি খাসজমি। আর খাসজমি বন্দোবস্ত আকারে বরাদ্দ দেওয়া হয়।’

চাহিদা অনুযায়ী ভূমি বরাদ্দ বাকি থাকলেও কবে নাগাদ বে-টার্মিনালের কাজ শুরু হবে, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল বলেন, ‘চলতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে বে-টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু করব। তিনটি টার্মিনালের দুটি টার্মিনাল পোর্ট অব সিঙ্গাপুর (পিএসএ) ও ডিপি ওয়ার্ল্ড নির্মাণ করবে। একটি টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতায় নির্মাণের সিদ্ধান্ত থাকলেও এখন আবুধাবি পোর্ট বিনিয়োগ করতে পারে। আর তাহলে সম্পূর্ণ বে-টার্মিনাল নির্মিত হবে বিদেশি অর্থায়নে।’

হালিশহরের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগরের ভেতরের প্রায় ২৩০০ একর জায়গায় বে-টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। জোয়ার-ভাটা, দিন-রাত, বাঁকা চ্যানেল কিংবা ড্রাফট (গভীরতা) বিবেচনায় জাহাজ কর্ণফুলী নদীর জেটিতে ভিড়লেও বে-টার্মিনালের ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা নেই। বর্তমানে কর্ণফুলী নদীর জেটিতে পৌঁছাতে একটি জাহাজকে ১৫ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু বে-টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে তা শূন্য কিলোমিটারের মধ্যেই বার্থিং করতে পারবে। বে-টার্মিনাল নির্মাণ হলে যেকোনো দৈর্ঘ্য ও প্রায় ১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে। বিপরীতে বর্তমান চ্যানেলে মাত্র ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ কর্ণফুলীতে প্রবেশ করতে পারে। সেই ক্ষেত্রেও জাহাজকে দুটি বাঁক অতিক্রম করতে হয় এবং দিনের মাত্র চার ঘণ্টা সময় পাওয়া যায়। কিন্তু বে-টার্মিনালে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ পরিচালনা করা যাবে। বিদ্যমান পোর্ট জেটিতে একসঙ্গে ১৬টি জাহাজ বার্থিং বা ভেড়ানো গেলেও বে-টার্মিনালে গড়ে প্রায় ৫০টি জাহাজ একই সঙ্গে বার্থিং করা যাবে। বন্দরের জেটির দৈর্ঘ্য চার কিলোমিটার হলেও বে-টার্মিনালের দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার। ল্যান্ড লর্ড পদ্ধতিতে চালু হতে যাওয়া বে-টার্মিনাল চট্টগ্রামের গভীর সমুদ্রবন্দরের অভাব ঘোচাবে বলে বন্দর-সংশ্লিষ্টদের ধারণা।