চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে এস আলম গ্রুপের চিনি পরিশোধন কারখানার গুদামে লাগা আগুন এখনো পুরোপুরি নেভেনি। গত সোমবার আগুন লাগার পর থেকে কাজ করে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে আগুনে পোড়া চিনির গলিত বর্জ্য দুদিন ধরে পাশের কর্ণফুলী নদীতে পড়ায় বিভিন্ন রকম মাছ ও জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠতে শুরু করেছে। গতকাল বুধবার সকাল থেকে নদীর দুই তীরে মাছ ভেসে উঠতে দেখে কয়েকশ মানুষ মাছ ধরতে নেমে পড়েন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোড়া চিনির বর্জ্যরে কারণে নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে গেছে। সে কারণে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন না পেয়ে মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী ভেসে উঠছে।
গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, ১ নম্বর গুদামটির পোড়া চিনির গলিত পানি দুটি নালা হয়ে সরাসরি গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। এলাকাজুড়ে দুর্গন্ধও ছড়িয়ে পড়েছে। পানিতে পোড়া তেল ও ফেনার মতো ভাসছে চিনির বর্জ্য। এতে নদীর পানি দূষিত হয়ে মরছে মাছ। স্থানীয়রা নদী থেকে হাত দিয়েই মাছ ধরছে। আবার কেউ কেউ জাল ফেলেও মাছ ধরছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার থেকেই নদীতে মাছ মরে ভেসে উঠছে। এতে হাত দিয়েই নদীতে মাছ ধরা যাচ্ছে। এভাবে দূষণ হতে থাকলে নদীর মাছ প্রায় হারিয়ে যাবে।
গতকাল মঙ্গলবার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুল হাসানের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কারখানার ড্রেন ও নদী থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে। তিনি বলেন, নমুনা পানি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পানির বিভিন্ন উপাদানের কী ক্ষতি হয়েছে তা বলতে পারব।
কামরুল ইসলাম বলেন, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মান ১-এর নিচে (প্রতি লিটারে যেখানে ৫ থেকে ৬ থাকার কথা) এবং পিএইচ মান ৩.৪ (যা ৬ থেকে ৯ এর মধ্যে থাকার কথা) এ নেমে এসেছে। আর এতেই মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী মারা পড়ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এখন বৃষ্টির মৌসুম নয় তাই প্রাকৃতিক স্বাদুপানির উৎস নেই, এছাড়া উজান থেকেও তেমন পানি আসছে না। আবার জোয়ারের গতিও বেশি নয়, তাই সহসা পানির এই সমস্যা সমাধান হওয়ার সুযোগ নেই। তবে ধীরে ধীরে পানির অবস্থার উন্নতি হতে পারে।’
মাছ নিয়ে গবেষণা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাওয়ার কারণেই মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী অক্সিজেনের অভাবে মারা পড়ছে। এছাড়া কর্ণফুলী আরও আগে থেকেই দূষিত ছিল। এখন পোড়া চিনির পানি নদীতে মিশে পানিকে আরও দূষিত করল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসমাঈল হোসেন বলেন, ‘চিনি আগুনে পুড়ে ব্ল্যাক কার্বন তৈরি করে। এই কার্বন পানি যখন নদীর পানিতে এসে মেশে তখন পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি পিএইচ মানও কমিয়ে ফেলে। আর এতেই বিপত্তি দেখা দিয়েছে।’
কিন্তু অপরিশোধিত চিনির মধ্যে কী কী উপাদান রয়েছে? সেখানে অন্য কোনো রাসায়নিক উপাদান ছিল কি না সেটাও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. মোহাম্মদ ইসমাঈল হোসেন। এ বিষয়ে জানতে কথা হয় রাজশাহী সুগার মিলের ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে। রসায়নের ছাত্র আবদুর রাজ্জাক বলেন, অপরিশোধিত চিনিকে কার্বনেশন ও সালফিটেশন পদ্ধতিতে পরিশোধন করা হয়। আমরা সালফিটেশন পদ্ধতিতে পরিশোধন করলেও এস আলম সুগার মিলে কার্বনেশন পদ্ধতি ব্যবহার হয় বলে জানি।
সরকারি মহসিন কলেজের রসায়ন বিভাগের সাবেক শিক্ষক মুহম্মদ ইদ্রিস আলী কর্ণফুলী দূষণ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। কার্বনেশন পদ্ধতি ব্যবহার করলে কী ঘটতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চিনি পুড়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই এখানে বেশি কার্বন উৎপন্ন হবে। এই কার্বন পানিতে মিশ্রিত হলে পানির মধ্যে কার্বনের ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাবে। এখানেও তাই ঘটেছে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। চিনির আগুনে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে আগুন নেভাতে সময় লাগছে।
এস আলম গ্রুপের ব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ) মো. হোসেন রানা বলেন, একই স্থানে মোট ছয়টি গুদাম আছে। সোমবার এক নম্বর গুদামে আগুন লাগে। এ গুদামে এক লাখ মেট্রিক টনের বেশি অপরিশোধিত চিনি ছিল। সবই পুড়ে গেছে। যার বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি। গুদামটিতে এখনো আগুন জ্বলছে।
কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুমা জান্নাত বলেন, চিনিকলের আগুন নেভানোর কাজে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, কোস্টগার্ড, র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য সহযোগিতা করেছেন।