ডিসি সম্মেলন শেষ

ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ নানা নির্দেশনা

চার দিনের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে রোজায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার মনিটরিং, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নসহ নানা নির্দেশনা পেয়েছেন ডিসিরা। গতকাল বুধবার সম্মেলন শেষ হয়েছে।

গত রবিবার প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের শাপলা হলে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৪ উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। চার দিনব্যাপী এবারের সম্মেলনে ৩০টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ২৫টি কার্য অধিবেশন।

কার্য অধিবেশনগুলো হয় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। বাকি পাঁচটি অধিবেশনের মধ্যে একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, একটি জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়, একটি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং আরও দুটি অধিবেশন হয়। একই সঙ্গে ৫৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, কার্যালয় ও সংস্থা সম্পর্কে ডিসিদের পক্ষে থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ৩৫৬টি প্রস্তাবনা জমা পড়েছে। এবারের সম্মেলনে সরকারপ্রধানের পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী এবং সচিবরা আলোচনায় যোগ দেন এবং ডিসিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

সম্মেলনে প্রধান আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে ছিল ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণরোধ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম জোরদার করা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসৃজন ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং ই-গভর্ন্যান্স, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন, উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও সমন্বয় করা প্রভৃতি।

ডিসি সম্মেলন শুরুর আগের দিন গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন জানিয়েছিলেন, গত বছর (২০২৩) মোট ২১২টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি, অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল এরকম সিদ্ধান্ত হয়েছিল ৫২টি, যার বাস্তবায়নের হার ৮৯ শতাংশ। তিন বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের (মধ্যমেয়াদি) জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ৯০টি। এগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের হার ৫৯ শতাংশ। আর পাঁচ বছরের জন্য যেসব সিদ্ধান্ত (দীর্ঘমেয়াদি) নেওয়া হয়েছিল ৭০টি। এখন পর্যন্ত যার বাস্তবায়নের হার ৪৫ শতাংশ। বাস্তবায়নের এ হারে তারা সন্তুষ্ট।

এ সম্মেলনে ৩৫৬টি প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২২টি প্রস্তাব এসেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিষয়ে। অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে জনসেবা বাড়ানো, জনদুর্ভোগ কমানো, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ নির্মাণ, পর্যটনের বিকাশ, আইনকানুন বা বিধিমালা সংশোধন, জনস্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রমজান সামনে রেখে যেকোনো ধরনের খাদ্য মজুদ ও ভেজালের বিরুদ্ধে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সারা দেশে ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘সামনে রমজান মাস আসছে। এ সময় কিছু কিছু ব্যবসায়ী সবসময় মজুদদারি করে, পণ্যের দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটতে চায়। সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে, কেননা এটি আমাদের আশু করণীয় কাজ। কোথাও যেন ভোক্তাদের কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে না হয়। আমাদের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। পরনির্ভরশীলতা কমাতে হবে।’

সম্মেলনের তৃতীয় দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতি মাসে প্রয়োজন হলে প্রতি সপ্তাহেই জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) বাজার মনিটরিং করার নির্দেশ দেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ আমাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ করেছি, তারা যেন প্রতি মাসে এবং প্রয়োজন হলে প্রতি সপ্তাহেই বাজার মনিটরিং করে।’

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে দেশের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে আরও চার সেতুর প্রস্তাব দেন ডিসিরা। সেগুলো হচ্ছে পদ্মা নদীতে রাজবাড়ী-পাটুরিয়া ঘাটে দ্বিতীয় সেতু এবং যমুনায় বাহাদুরাবাদ-বালাসী ঘাটে আরেকটি সেতুর পাশাপাশি কক্সবাজার ও মহেশখালীকে যুক্ত করতে বাঁকখালী নদী এবং বরগুনার বেতাগী নদীর ওপর সেতু।

এরপর সেতু সচিব মনজুর হোসেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘২০৫০ সাল পর্যন্ত সরকারের বাস্তবায়নাধীন পরিকল্পনার মধ্যে এ চার সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একে একে বাস্তবায়ন করা হবে।’ তবে পদ্মা নদীতে রাজবাড়ী-পাটুরিয়াকে যুক্ত করতে সেতু নাকি টানেল কোনটা হবে তা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর সরকার ঠিক করবে ধরনটি কেমন হবে।

সারা দেশের অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অভিযানে ডিসিদের সহায়তা চান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন।

অনিবন্ধিত মাদ্রাসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ডিসিরা। একজন ডিসি আলোচনায় আনেন অনিবন্ধিত, নাম-পরিচয়হীন নুরানি মাদ্রাসার নামে কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার বিষয়ে। সেগুলো নিবন্ধনের প্রক্রিয়া কী, সেগুলোর নিয়ন্ত্রক কারা তা জানতে চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম দিনের অধিবেশন শেষে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছিলেন, যেসব নুরানি মাদ্রাসা গড়ে উঠছে, সেগুলোর যথাযথ নিবন্ধন আছে কি না, সেগুলোতে কীভাবে শিক্ষাক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করব। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যাতে সাংঘর্ষিক না হয়, সে বিষয়ে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে নিজের ঘরকে দুর্নীতিমুক্ত করতে ডিসিদের বলেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ।

সাইবার নিরাপত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে তৃতীয় দিনের অধিবেশনে ডিসিদের চারটি কৌশল অনুসরণের কথা বলেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।

গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর এটিই প্রথম ডিসি সম্মেলন। ফলে এবারের সম্মেলনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের বিষয়েও ডিসিদের বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।