খুলনায় আদালতে জবানবন্দি ধর্ষণের শিকার সেই তরুণীর

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ অভিযোগ করার পর অপহরণের শিকার সেই তরুণী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এ জবানবন্দি দিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বিচারক রওনক জাহান তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন।

এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডুমুরিয়া থানার ওসি (তদন্ত) মুক্ত রায় চৌধুরী ভুক্তভোগীকে আদালতে হাজির করেন। জবানবন্দি শেষে তাকে মায়ের হেফাজতে দেওয়া হয়েছে।

তবে গত বৃহস্পতিবার ডুমুরিয়া থানায় ধর্ষণ ও অপহরণ মামলা রেকর্ড হলেও পুলিশ মামলার প্রধান আসামি উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী এজাজ আহমেদসহ সাতজনকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

ডুমুরিয়া থানার ওসি সুকান্ত কুমার সাহা জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের আদেশে থানায় আসার পর রাতেই মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে।

মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ওসি (তদন্ত) মুক্ত রায় চৌধুরীকে। তিনি জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন উপজেলা চেয়ারম্যান এজাজ আহমেদের চাচাতো ভাই রুদাঘরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গাজী তৌহিদুজ্জামান, গাজী আবদুল হক, আল আমিন গাজী, আক্তারুল আলম, সাদ্দাম গাজী ও মো. ইমরান হোসাইন। এ ছাড়া অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি বিকেলে ওই তরুণীকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে ঘটনাস্থল থেকে ডুমুরিয়া উপজেলার রুদাঘরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গাজী তৌহিদুজ্জামানকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন স্থানীয় লোকজন। তবে পরে ওই তরুণী সাংবাদিকদের বলেন, তাকে ধর্ষণ বা অপহরণের ঘটনা ঘটেনি। তার পরিবারও কোনো মামলা করবে না বলে ওইদিন রাতে নগরীর সোনাডাঙ্গা মডেল থানা থেকে বাড়িতে ফিরে যান।

এ ঘটনার ১ মাস ১০ দিন পর গত বুধবার দুপুরে ভুক্তভোগীর খালাতো ভাই বাদী হয়ে খুলনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ ধর্ষণ ও অপহরণ মামলা করেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গত ২৭ জানুয়ারি রাতে ডুমুরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা গাজী এজাজ আহমেদ শাহপুর বাজারের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভুক্তভোগীকে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনার পরদিন রাতেই ভুক্তভোগীকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করা হয়। এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার জন্য তিনি ২৮ জানুয়ারি বিকেলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির সামনে গিয়ে জানতে পারেন, ওসিসি কর্তৃপক্ষ উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী এজাজ আহমেদ ও ইউপি চেয়ারম্যান গাজী তৌহিদুজ্জামানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভুক্তভোগীকে যথাযথ চিকিৎসা না দিয়ে ছাড়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ভুক্তভোগী ও তার মা ওসিসি থেকে বের হওয়ামাত্র ইউপি চেয়ারম্যান গাজী তৌহিদুজ্জামানের নেতৃত্বে এজাহারভুক্ত আসামিসহ ১০-১৫ জন তাদের টেনেহিঁচড়ে মাইক্রোবাসে তুলে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এ সময় আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে মোটরসাইকেলসহ গাজী তৌহিদুজ্জামানকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।

পরে গভীর রাতে অজ্ঞাতনামা দুই-তিনজন ভুক্তভোগী ও তার মাকে খুন-জখম করার হুমকি দিয়ে নগরীর সোনাডাঙ্গা থানায় নিয়ে ভুক্তভোগীকে দিয়ে পুলিশের কাছে মিথ্যা বক্তব্য দিতে বাধ্য করে। এরপর পুলিশকে ম্যানেজ করে গাজী তৌহিদকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এ ছাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী এজাজ ও ইউপি চেয়ারম্যান গাজী তৌহিদ ভুক্তভোগীকে ডুমুরিয়া থানা এলাকার অজ্ঞাত একটি স্থানে আটকে রাখেন।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, বাদী আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তি। পক্ষান্তরে আসামিরা অনেক অর্থ ও পেশিশক্তির অধিকারী, নারী নির্যাতনকারী, ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারকারী, আইন অমান্যকারী। তারা ভুক্তভোগীকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এরপরও বাদী ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে ডুমুরিয়া থানায় মামলা করতে গেলে থানা পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ট্রাইব্যুনালে এসে মামলা করতে বিলম্ব হয়। ঘটনার দিন ছাড়াও ভুক্তভোগীকে বিয়ের প্রলোভনে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন বাদী।

এদিকে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এ মামলায় আমাদের পক্ষ থেকে ভিকটিমকে সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হবে।’