লেখক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী। সম্প্রতি মিয়ানমার পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। সীমান্ত পার হয়ে নিয়মিত গোলা, মর্টার এসে পড়ছে, ইতিমধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা তো রয়েছেই। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো কী রকম?
নাঈম আশফাক চৌধুরী : বর্তমানে আমাদের সামনে অ্যাকচুয়েলি দুটো ইস্যু। একটা হচ্ছে মিয়ানমার ইস্যু, আরেকটা হলো রোহিঙ্গা ইস্যু। দুটি ইস্যুই আবার একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং উভয় ইস্যুই বাংলাদেশের জন্য প্রবল সমস্যা সৃষ্টি করছে। এ-কারণে আমি এই দুটোকেই বলছি আলাদা আলাদা ইস্যু। এখানে মিয়ানমারের যে কনফ্লিক্ট ইস্যু আছে, সেটার আবার বিভিন্ন ধরনের আঙ্গিক রয়েছে। যেমন, জিও স্ট্র্যাটেজিক বা জিওপলিটিক্যাল, জিওইকোনমিক, সিকিউরিটি... মানে বিভিন্ন ডাইমেনশন রয়েছে মিয়ানমার ইস্যুর। এটার জিওপলিটিক্যাল এবং জিওস্ট্র্যাটেজিক যে বিষয়টা আছে সেটা বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাব যে, পৃথিবীর বিভিন্ন রিজিওনাল এবং গ্লোবাল পাওয়ারের এখানে ইন্টারেস্ট আছে। এবং এটা মিয়ানমারের বর্তমান ইস্যুগুলোকে আরও জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে।
দেশ রূপান্তর : সিকিউরিটি ইস্যুকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
নাঈম আশফাক চৌধুরী : মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সংঘাতে বিবদমান তিন ধরনের অংশ বা অংশীদার রয়েছে। প্রথমে মিয়ানমারের ‘তাতমাদো’ অর্থাৎ আর্মড ফোর্সেস, অন্যদিকে ইএওস অর্থাৎ এথনিক আর্মড অর্গানাইজেশন এবং তৃতীয়ত রয়েছে পিডিএফ অর্থাৎ পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট। পিডিএফ হলো ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজির মিলিটারি উইং-এর অংশ। ইএওস-এর প্রায় ৩০-৩৫টা বিভিন্ন ধরনের এথনিক মিলিটারি উইং রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৮-৯টা বিভিন্ন ধরনের এথনিক আর্মড অর্গানাইজেশন তাতমাদোর বিরুদ্ধে ফাইট করছে। এটা মিয়ানমারের বিভিন্ন স্টেটে চলমান। বলতে গেলে ১৯৪৮-এর দিকে অর্থাৎ মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর থেকেই সংঘাতটা শুরু হয়েছে এবং এটা কনটিনিউ করছে। গত বছরের অক্টোবরের ২৭ তারিখে এটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বিদ্রোহীরা বেশ কিছু বড় অপারেশন চালিয়েছে। আমাদের যেটা বেশি এফেক্ট করছে সেটা হলো রাখাইনে যে অপারেশনটা করছে আরাকান আর্মি। থ্রি ব্রাদারহুডের উইং হলো আরাকান আর্মি। সেখানে তাদের অপারেশন চলমান আছে। এসবের একটা বড় ধরনের ইমপ্যাক্ট আমাদের দেশে হুমকি হিসেবে পড়েছে। এক নম্বর হলো তাদের বুলেট, মর্টার শেল এগুলো আমাদের দেশের ভেতরে আসছে। মারাও গিয়েছে আমাদের দেশের কয়েকজন। এটা আমরা ফেস করছি এবং ভবিষ্যতে হয়তো আরও বেশি করব। দুই নম্বর হচ্ছে, মিয়ানমারের যে কনভেনশনাল প্যারা মিলিটারি ফোর্সেস, তারা আরাকান আর্মির তাড়া খেয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছে। দিস ইজ দ্য সিকিউরিটি ট্র্যাপ ফর বাংলাদেশ। তাদের ৩৩০ জন বাংলাদেশে এসেছিল, আমরা তাদের ফেরত দিয়েছি। তৃতীয় সিকিউরিটি থ্রেট যেটা আমি চিন্তা করছি সেটা হলো, আরাকান আর্মিরও অনেকে হয়তো বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে থাকতে পারে। সেটাও আমাদের জন্য সিকিউরিটি থ্রেট। আরাকান আর্মি যেভাবে সাকসেস পাচ্ছে, সেটাকে তারা (তাতমাদো) সহজভাবে নেবে এটাও আমি দেখছি না। হয়তো বা তারা এটার কাউন্টার অফেন্সিভ করবে, সেই অফেন্সিভের একটা প্রভাব আমাদের দেশে পড়বে। বর্ডার ভায়োলেন্স আরও বেশি হতে পারে।
দেশ রূপান্তর : সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সেই প্রতিক্রিয়া কি যথাযথ বা ইনাফ মনে করেন?
নাঈম আশফাক চৌধুরী : এটা ইন্টারেস্টিং কোশ্চেন। আমরা যে কাজটি করেছি যে, মিয়ানমারের বিজেপি এবং অন্যান্য প্যারা মিলিটারি ফোর্সেস এসেছিল তাদের হ্যান্ডওভার করলাম সেটা সঠিক হয়েছে কি হয়নি এটা বলতে চাচ্ছেন কি?
দেশ রূপান্তর : সে প্রশ্নসহ আরও যেটা জানতে চাচ্ছি- সীমান্ত পার হয়ে গুলি আসছে, আমাদের দুই নাগরিকের মৃত্যুও হলো ইত্যাদি। এসবের তীব্র প্রতিক্রিয়া আমরা কূটনৈতিক পর্যায়ে দেখেছি। সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে এটা কি যথেষ্ট মনে করেন?
নাঈম আশফাক চৌধুরী : ক্রিটিকালি দেখলে বিজিপি বা মিয়ানমারের প্যারা মিলিটারি ফোর্সের যারা এই দেশের ভেতরে এসেছে তারা দুটো আইন ভঙ্গ করেছে। প্রথমত, তারা আন্তর্জাতিক সীমা অতিক্রম করে অন্য দেশের ভেতরে এসেছে। দ্বিতীয়ত, তারা অস্ত্রসহ এই দেশের ভেতরে ঢুকেছে। এখন এই আইনগত বিষয়কে আমরা এড়িয়ে গিয়ে তাদের মিয়ানমারের জান্তা সরকারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছি। এটা ঠিক হয়েছে কি হয়নি সেই প্রশ্ন ছাড়াও আরও অনেক বিষয় এখানে সম্পৃক্ত। যেমন, এরা হচ্ছে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কনভেনশনাল প্যারা মিলিটারি ফোর্সেস। তাদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি এবং আবার ফেরত দিয়েছি। এখন মিয়ানমার ফিরে গিয়ে তারা আবার আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। অথবা কেন পোস্ট ছেড়ে পালিয়েছে সেই কারণে তারা বিচারের মুখোমুখি হতে পারে। তাদের বিচার কিংবা ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসব আমাদের বিবেচনা করা উচিত ছিল। আরাকান আর্মির বিষয়ও এখানে রয়েছে। তারা মূলত রাখাইন রাজ্যের রাখাইন জনগোষ্ঠী। মিয়ানমার প্রশ্নে আমাদের মেইন অবজেকটিভ কী? -রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া। তারা ওখানে ফিরে যাবে এবং রাখাইনে থেকে যাবে। রাখাইনে যদি তাদের থেকে যেতে হয় তাহলে সেখানে গিয়ে যাদের সঙ্গে থাকা লাগবে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছাড়া তো এই প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। ফলে বিজিপির সদস্যদের ফিরিয়ে দেওয়াটা আরাকান আর্মি কীভাবে দেখবে সেটাও বিবেচনা করা দরকার ছিল।
এর সঙ্গে আবার আরও কিছু জিওস্ট্র্যাটেজিক বিষয় সম্পৃক্ত, সেটা হলো ইন্ডিয়ান ইন্টারেস্ট ইন রাখাইন অর মিয়ানমার। মিয়ানমারে ইন্ডিয়ান ইনভেস্টমেন্ট এফেক্টেট হয়েছে আরাকান আর্মির অপারেশনের ফলে। এখন আপনি আরকান আর্মির বিরুদ্ধে যদি কিছু করেন, তারা সেটা মনে রাখবে। বিপদের সময় যে আপনাকে তারা কাছে পেল না বা আপনার পদক্ষেপ যে তাদের বিরুদ্ধে গিয়েছে, সেটা তারা ভালোভাবেই মনে রাখতে পারে। এখন পরিস্থিতি যেমন, তাতে করে আরাকান আর্মি যদি আগামীতে রাখাইনের সব দখল করে নেয় এবং তখন যদি আমরা তাদের বলি রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দাও, ফিরিয়ে নাও, তোমাদের সঙ্গে তাদের থাকতে দাও তখন তারা কী করবে? আমরা এমন প্রশ্ন চিহ্ন রাখার সুযোগ তৈরি করছি।
দেশ রূপান্তর : মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু বলেছেন, মিয়ানমারের পরিস্থিতি শোচনীয় হতে পারে এবং এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ও ভারতকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনার মন্তব্য কী?
নাঈম আশফাক চৌধুরী : আমি আরেকটা বড় থ্রেট চিন্তা করছি সেটা হলো আরাকান আর্মি যুদ্ধ করতে ইন্টার্নালি হোক বা এক্সটার্নালি- তারা অস্ত্র পাচ্ছে তার পরিমাণ অনেক বেশি। আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে এই হিউজ পরিমাণ অস্ত্র এবং গোলাবারুদের কোনো হিসাব আছে কি না। একটা কনভেনশনাল আর্মি যখন যুদ্ধে যায় তখন তার প্রতিটি অস্ত্র, প্রতিটি গুলির হিসাব থাকে। আরাকান আর্মির হিসাব ছাড়া অস্ত্র ও গোলাগুলি তো আছেই, সেই সঙ্গে বিজিপি ও তাতমাদোর ফেলে যাওয়া অস্ত্র চোরাকারবারি বা অন্য কারও হাতে পড়বে না তার নিশ্চয়তা নেই। পাশাপাশি সীমান্তের ওপারের এই অস্ত্রশস্ত্র সবই যে কনভেনশনাল যুদ্ধের খাতেই ব্যবহৃত হচ্ছে সেটারও নিশ্চয়তা নেই। এমনকি এই অস্ত্র সংগ্রহে আমাদের দেশের ইউপিডিএফ, জেএসএস, কুকি চিন বা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো তৎপর হতে পারে। এটা বাংলাদেশের জন্য সিরিয়াস একটি থ্রেট। এরপর যে সিকিউরিটি থ্রেটের কথা বলছি সেটাকে আমরা বলি নার্কো-টেরোরিজম। আপনারা জানেন ওয়ার্ল্ডের বেশির ভাগ পপি চাষ হতো আফগানিস্তানে। কিন্তু আফগানিস্তানে তালেবান সরকার আসার পরে সেটা একদম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন পপি চাষের একশ ভাগই চলে এসেছে মিয়ানমারে। মিয়ানমারকে আমরা জানি পার্ট অফ দ্য গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল। মেথ, ইয়াবার সঙ্গে সঙ্গে অপিয়ামেরও উৎস এখন মিয়ানমার। এগুলোর রেকর্ডও আছে। দিস ইজ পার্ট অফ দ্যাট গেইম। মিয়ানমার যে এখন নার্কো-টেরোরিজম তৈরি করছে তার ইফেক্ট সারা বিশ্বেই পড়বে। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের সিকিউরিটির ক্ষেত্রে এই নার্কো-টেরোরিজম বেশি ভোগান্তি তৈরি করবে। এর সঙ্গে আবার সম্পৃক্ত আছে হিউম্যান ট্রাফিকিং, ড্রাগ ট্রাফিকিং এবং আর্মস ট্রাফিকিং। এখন ডোনাল্ট লু যেটা বলেছেন, তিনি হয়তো প্রথমত কনভেনশনাল এবং আন-কনভেনশনাল যে সংঘাত চলছে সধারণভাবে সেটা বুঝিয়েছেন। তবে আমি মনে করি, তিনি পরিত্যক্ত অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ায় সেখানকার কমিউনাল সংঘাত এবং নার্কো-টেরোরিজমের ইঙ্গিতও দিয়েছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন গ্লোবাল এবং রিজিওনাল পাওয়ার নিজেদের ইন্টারেস্ট তুলতে সক্রিয় হয়ে উঠবে। ফলে এখানে এক্সটার্নাল ইনভলভমেন্টও আরও আসতে পারে।
দেশ রূপান্তর : কিছুদিন আগে আমাদের র্যাব প্রধান বললেন যে মিয়ানমার নানানভাবে উসকানি দিচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানোর জন্য। এই মন্তব্যকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
নাঈম আশফাক চৌধুরী : ওনার স্টেটমেন্টকে এক্সপ্লেইন করা আমার ঠিক হবে না। কিন্তু নিরাপত্তা ইস্যুর ছাত্র হিসেবে আমি বলব যে, মিয়ানমারে এখন চলমান যে যুদ্ধ বা সংঘাত বা কমিউনাল সিভিল ওয়ারের সিচুয়েশন চলমান এটা আমাদের দেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং হিউম্যান সিকিউরিটির জন্য বড় হুমকি, যা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
দেশ রূপান্তর : আরাকান আর্মি বা অন্য গ্রুপগুলো যে আছে তারা জাতীয় মুক্তির জন্য নাকি ড্রাগ ট্রাফিকিংয়ের কন্ট্রোল নিয়ে লড়ছে, নাকি দুটোই? আমরা তো শুনে আসছি জান্তা বাহিনী বা বিজিপিও সীমান্তে এসবের সঙ্গে জড়িত ছিল।
নাঈম আশফাক চৌধুরী : নার্কো-টেরোরিজমের বেশ কয়েকটি আঙ্গিক রয়েছে। যতটুকু বুঝি এটা কারও একক নিয়ন্ত্রণে নেই। বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর প্রত্যেকের সোর্স অফ ইনকাম বা সোর্স অফ মানি একই উৎস থেকে আসছে বলে মনে হয় না। যদিও তাদের ইউনিফাইড যুদ্ধটা একদম ইউনিক ছিল অর্থাৎ থ্রি ব্রাদারহুড গত বছর অক্টোবরে যা হয়েছে, যা আগে কখনই হয়নি। দেখলাম তারা ইউনিফাইডলি তাতমাদোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু তারা মূলত বিচ্ছিন্নভাবে যেমন যুদ্ধ করছে, তেমনি তাদের সোর্স অফ ইনকামও আলাদা। এটা তারা ইন্টার্নালি এবং এক্সটার্নালি কালেক্ট করছে বলে আমার ধারণা। তো ড্রাগ ট্রাফিকিং বা নার্কো-টেরোরিজম এককভাবে কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে না। অন্যদিকে, এটা প্রমাণ করা খুবই কঠিন যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাতমাদো এই ড্রাগ ট্রাফিকিং বা নার্কো-টেরোরিজমে যুক্ত। কিন্তু এমন অভিযোগ তো আছেই যে, যারাই যে অঞ্চলেরই ড্রাগস ট্রেড নিয়ন্ত্রণ করে তারা তাতমাদোকে প্রাতিষ্ঠানিক হোক বা ব্যক্তি পর্যায়ে হোক চাঁদা দিয়েই কাজ করে বা করত। এখানে তাতমাদো না বলে বলা যায়- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পাশে না রেখে মিয়ানমারে এটা কন্ট্রোল করা খুবই কঠিন।
দেশ রূপান্তর : আপনি তো মিয়ানমার নিয়ে বইও লিখেছেন। শুনে আসছি অ্যাকাডেমিকভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে মিয়ানমার নিয়ে আমাদের বোঝাপড়াটা একটু কম আর কি। আপনার কি মনে হয় এবং আমরা আরও কিছু করতে পারি?
নাঈম আশফাক চৌধুরী : ‘উই ক্যান চেঞ্জ আওয়ার ফ্রেন্ডস বাট উই ক্যাননট চেঞ্জ আওয়ার নেইবার’। তাই না? যদি তাই হয় তাহলে আমাদের সঙ্গে ইন্ডিয়ার যে সম্পর্ক, জনগণের সঙ্গে জনগণের যে সম্পর্ক, পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে পলিটিক্যাল পার্টির যে সম্পর্ক, ব্যবসায়ীর সঙ্গে ব্যবসায়ীর যে সম্পর্ক, সিকিউরিটি ফোর্সের সঙ্গে সিকিউরিটি ফোর্সের যে সম্পর্ক সেটা কি আমরা আমাদের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে করতে পেরেছি? এ বিষয়ে কোনো এফোর্ট দিয়েছি? অবশ্যই না। আমরাও কি খুব কম দায়ী? আমরাও তো এফোর্টটা দিইনি। যদিও এখন সেই সিচুয়েশন নেই। প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক তো কেবল সরকার টু সরকার না, সেটা আদার কমিউনিটি, মানে অ্যাকাডেমি থেকে শুরু করে সমাজের অন্যান্য যারা আছে তাদের ওপরও নির্ভর করে। মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক সেটা তো বহু আগের। কিন্তু এটাকে আমরা পরিচর্যা করিনি।
দেশ রূপান্তর : এবার আমরা দেখলাম যে আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের অ্যাড্রেস করে কথা বলছে। তাদের যে এলায়েন্স হয়েছে ঐখানেও রোহিঙ্গা প্রতিনিধি রাখার কথাও বলেছে।
নাঈম আশফাক চৌধুরী : মানে হলো সংঘাত যে পর্যায়ে আছে, তাতে করে আরাকান আর্মির এখন রিকোগনিশান বা সাপোর্ট দরকার। ফলে তারা রোহিঙ্গাদের অ্যাড্রেস করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এখন যদি আমি আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করছে তাদের সাপোর্ট করি বা এমন ভূমিকা নিই যা তাদের বিরুদ্ধে যায় সেটা তো ভবিষ্যতের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে কঠিন করে তুলবে।
দেশ রূপান্তর : বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরির কথা বলছেন অনেকে। আপনি কি মনে করেন এবং এ রকম কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত কি আপনি পান?
নাঈম আশফাক চৌধুরী : আমরা এতক্ষণ যা আলোচনা করলাম, তাতেই এটা পরিষ্কার যে মিয়ানমার ইস্যু বা রোহিঙ্গা ইস্যুর সঙ্গে অনেকগুলো স্টেকহোল্ডার জড়িত। যেমন তাতমাদো, জান্তা সরকার ছাড়াও বিদ্রোহী ও এথনিক গ্রুপগুলো জড়িত। পাশাপাশি রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও রিজিওনাল বা আঞ্চলিক লাভ-লোকসান। এই পরিস্থিতিতে সেখানে বিভিন্ন ধরনের গ্রুপের যারা যুদ্ধ করছে তাদের সঙ্গে যদি সম্পর্ক স্থাপন না হয় তাহলে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তার সঙ্গে বিভিন্ন জিও-স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারেস্টসহ এক্সটার্নাল পাওয়ার আছে। অর্থাৎ ইউএসএ, চায়না, ইন্ডিয়া ইভেন জাপান, থাইল্যান্ড, আশিয়ান এদের সবারই কিন্তু ডাইরেক্ট-ইন-ডাইরেক্ট একদম সম্পৃক্ততা রয়েছে সেখানে। যতগুলো স্টেকহোল্ডার আছে তাদের আমি যদি এনগেজড না করি তাহলে আমি আমাদের জাতীয় স্বার্থকে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে বা রক্ষা করতে পারব কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
দেশ রূপান্তর : প্রশ্নটা উঠেছে কনভেনশনাল নাকি আন-কনভেনশনাল পথে কথাবার্তা হবে?
নাঈম আশফাক চৌধুরী : কনভেনশনালি আরাকান আর্মি তো নট রিকোগনাইজড বাই অল অথবা টিএনএ অথবা থ্রি ব্রাদারহুড এখনো তো রিকোগনাইজ হয়নি। অপরদিকে এনইউজির অফিস এখন ইউরোপ-আমেরিকা সব জায়গাতেই আছে, থাইল্যান্ডে আছে, সিঙ্গাপুরে আছে। তাদের ইউএসএ স্পনসর করছে। কিন্তু তাদেরও সবাই রিকোগনাইজড করেনি। অপরদিকে ইন্ডিয়া বলেন, চায়না বলেন এরা কিন্তু জান্তা সরকারকে যেরকম কমিউনিকেট করছে আবার একই সময় তাতমাদোকেও তারা রিকোগনাইজ করছে। রাশিয়া ইকুইপ করছে, চায়না অস্ত্র দিয়ে ইকুইপ করছে তাদের। সুতরাং তাদেরও আমাদের সঙ্গে এনগেজ করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে কনভেনশনালি আমার মিনিস্ট্রি অফ ফরেন অ্যাফেয়ার্স কি তাদের সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে? খুব সম্ভবত উত্তর হবে, না। যদি না পারি তাহলে আমাকে এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যে ব্যবস্থার মাধ্যমে একটা ক্রেডিবল এনগেজমেন্ট তৈরি করা যায়। এটা কনটাক্ট বা কমিউনিকেট না এটা হবে এনগেজমেন্ট বা সম্পৃক্তকরণ। মনে করেন আমার অর্গানাইজেশনের কেউ একজন আরাকান আর্মির কারও সঙ্গে যোগাযোগ করল এটা কিন্তু কমিউনিকেশন হলো, কন্টাক্ট হলো কিন্তু এনগেজমেন্ট হয়নি। কেন এনগেজমেন্ট হয়নি? কারণ হলো একটা ক্রেডিবল প্লাটফর্ম থেকে আপনাকে যোগাযোগ করতে হবে যার একটা ভ্যালিড অথরিটি থাকবে, যা ভবিষ্যতে রেফার করা যাবে। আমি শুধু না, অনেকেই বলছেন যে, উই নিড এ প্ল্যাটফর্ম। যে প্ল্যাটফর্ম স্পেশাল এনভয়েজ হতে পারে, একটা কমিশন হতে পারে। এই প্ল্যাটফর্মের অধীনে বিভিন্ন ক্যাটাগরির লোক থাকলে ভালো হয়। যেমন, মিনিস্ট্রি থাকবে, সিকিউরিটির লোক থাকবে, অ্যাকাডেমিশিয়ান থাকবে, ব্যাবসা-বাণিজ্যের লোক থাকবে, সাংবাদিক থাকবে। বিভিন্ন ধরনের লোকজন থাকবে। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে যখন যোগাযোগ করা হবে, কন্টাক্ট করা হবে তখন এটাকে এনগেজমেন্ট বলব আমরা। কারণ একটা ক্রেডিবল প্ল্যাটফর্ম থেকে আপনি কথা বলছেন যা রেফারেন্স হিসেবে ভবিষ্যতে উল্লেখ করা যাবে। সেই প্লাটফর্মে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিও থাকবে। আমি বলছি যে একটা প্ল্যাটফর্ম লাগবে। যে প্ল্যাটফর্ম থেকে বিভিন্ন ধরনের স্টেকহোল্ডার যারা এনগেজড হয়ে গেছে মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের সঙ্গে আমাদের এনগেজমেন্ট অবশ্যই প্রয়োজন। কারা থাকবে, কে কে থাকবে সেটা আলোচনার ব্যাপার। কিন্তু আমি বলছি নরমাল, ফরমাল, কনভেনশনাল ডায়লগ বা ডিপ্লোমেটিক এফোর্ট উইল নট ওয়ার্ক।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।
মেজর জেনারেল নাইম : আপনাকেও ধন্যবাদ।
অনুলিখন : মোজাম্মেল হক হৃদয়