পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় ‘ভুলা’ বা ‘ইচা চিংড়ি’ আহরণ এবং শুঁটকির নামে অবাধে ধ্বংস করা হচ্ছে সামুদ্রিক প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী। এক দশক ধরে নিষিদ্ধ ছোট ফাঁসের বেহুন্দি বা কুসুম জালে প্রকাশ্যে এসব মাছ শিকার এবং শুঁটকি করা হলেও নীরব আইন প্রয়োগকারী সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, স্বচ্ছ দেহ, বড় কালো চোখ এবং লেজের গোড়ায় লাল রঙের ফোঁটাযুক্ত আকারে ছোট চিংড়িকে স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীরা ভুলা চিংড়ি বলে
থাকলেও এটি গুঁড়া ইচা চিংড়ি বা Paste Shrimp নামে সবার কছে পরিচিত। sergestidae Acetes sp. বৈজ্ঞানিক নামের এ ভুলা বা গুঁড়া ইচা চিংড়ি বছরের নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সাগরে ধরা পড়ে। সর্বোচ্চ ১ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যরে এই চিংড়ির আয়ুষ্কাল ৯০ দিন। সামুদ্রিক অনেক মাছের খাদ্য হিসেবে এটি বেশ জনপ্রিয়।
পটুয়াখালীর উপকূলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সমুদ্র উপকূল থেকে অনতিদূরে গিয়ে একশ্রেণির জেলে নিষিদ্ধ অতিক্ষুদ্র ফাঁসের বেহুন্দি জাল, কুসুম জাল ব্যবহার করে ভুলা চিংড়ি শিকার করছেন। এই চিংড়ির সঙ্গে ধরা পড়ছে সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর রেণু। জেলেরা সাগরপাড়ে বসেই অপ্রয়োজনীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্যর রেণু ফেলে দিয়ে শুধু ভুলা চিংড়ি সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য নিয়ে আসছেন জেলার মহিপুর থানার নিজামপুর মৎস্য আড়ত ঘাটে। এখান থেকে আড়তমালিকদের মাধ্যমে খোলা ডাকে এসব ভুলা চিংড়ি নগদ-বাকিতে কিনছেন চাতালমালিকরা।
সরজমিনে আরও দেখা যায়, সামুদ্রিক এই চিংড়িকে কেন্দ্র করে মহিপুর থানার আন্ধারমানিক নদীর তীরের সুধীরপুর, নিজামপুর, পুরান মহিপুর, গোড়াখাল, নজীবপুর, ধুলাসর, কাউয়ারচর, আঁশাখালী, গঙ্গামতি; কলাপাড়া থানার সোনাতলা নদীতীরের হাজীপুর, তেগাছিয়া ও বরগুনা জেলার তালতলীর নিদ্রাসকিনা, সওদাগারপাড়া এলাকায় গড়ে উঠেছে অস্থায়ী পাঁচ শতাধিক ভুলা চিংড়ি শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ চাতাল। এসব চাতালে ভুলা চিংড়ি মাছ শুকিয়ে যাত্রীবাহী বাসে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার শুঁটকির মোকামে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন চাতালমালিক জানান, দাম কম ও স্বাদযুক্ত হওয়ায় ক্রেতাপর্যায়ে ভুলা চিংড়ির রয়েছে বেশ কদর। ফলে নিজামপুরে গড়ে উঠেছে প্রায় ৩০টির মতো শুধু ভুলা চিংড়ি বেচা-কেনার আড়ত। এসব আড়তকে কেন্দ্র করে দাদন নিয়ে সাগর থেকে ভুলা চিংড়ি ধরছেন ৬০০ থেকে ৭০০ জেলে। গড়ে উঠেছে প্রায় পাঁচ শতাধিক শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ চাতাল। আড়তমালিকরা দরিদ্র জেলেদের নৌকা-ট্রলার তৈরি, জাল, জ্বালানিসহ খাদ্যসামগ্রী দিয়ে আবার যাদের নৌকা রয়েছে, তাদের দাদন দিয়ে সাগরে ভুলা চিংড়ি ধরার জন্য সাগরে পাঠাচ্ছেন।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, একোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিষিদ্ধ চিকন ফাঁসের জাল দিয়ে ভুলা বা গুঁড়া ইচা চিংড়ি ধরার ফলে প্রায় ৯৬টি পরিচিত প্রজাতিসহ এক হাজার প্রজাতির মাছের রেণু ও খাদ্যকণা জুপ্লাঙ্কটন এবং ফাইটো প্লাঙ্কটন ধ্বংস হচ্ছে।