বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের কর দিতে হবে না। সংশোধিত পিএসসিতে (উৎপাদন বণ্টন চুক্তি) এমন সুবিধার পাশাপাশি সাগরে প্রাপ্ত গ্যাসের হিস্যার পরিমাণ আগের চেয়ে বৃদ্ধি এবং গ্যাস রপ্তানির সুযোগসহ বিনিয়োগকারীদের আরও কিছু সুবিধা নিশ্চিত করার কারণে বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহী হবে বলে মনে করছে সরকার। যার ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যে ৫৫টি বিদেশি কোম্পানিকে দরপত্রে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। যাদের মধ্যে অনেকেই আগ্রহ দেখিয়ে পেট্রোবাংলার সঙ্গে যোগাযোগও করেছে।
গভীর ও অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য গত রবিবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে পেট্রোবাংলা। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়ার শেষ দিনে দরপত্র উন্মুক্ত করা হবে। আর সব প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী বছর সাগরে অনুসন্ধানকাজ শুরু হবে বলে আশা করছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ উপলক্ষে গতকাল সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পেট্রোবাংলা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম বলেন, ‘এবারের বিডিংয়ে বেশ কিছু নতুনত্ব আছে। এ কারণে আমরা আশা করছি, আগ্রহী কোম্পানিগুলোর ব্যাপক সাড়া পাব। এর একটি যেমন ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে প্রাইসিং করা হয়েছে। আগে এটা ছিল ফার্নেস অয়েলের সঙ্গে। এতে আস্থার সংকট ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্টের দাম বাড়লে প্রাপ্ত গ্যাসের দাম বাড়বে। আবার কমলে কমবে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করাটা আমাদের জন্য ইতিবাচক।’
সংশোধিত পিএসসিতে বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করে এটিকে আকর্ষণীয় করা হয়েছে উল্লেখ করে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘কস্ট রিকভারি, প্রফিট শেয়ারিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে পিএসসিতে পরিবর্তন এসেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ট্যাক্স থেকে বিনিয়োগকারীদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এখানে দেশের স্বার্থও অক্ষুন্ন রয়েছে। সমালোচনা যারা করেন, তাদের মুখে ছাই দিয়ে আমরা আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর একটি ইতিবাচক জায়গা দেখাতে পেরেছি। এই যাত্রা যেন সাফল্যমণ্ডিত হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘বহু প্রতীক্ষার পর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রাথমিক কাজ শুরু হলো। ২৪টি ব্লকে আমরা বিডিং শুরু করছি। আমরা চাচ্ছি সারা বিশে^র বিখ্যাত কোম্পানি এবং যাদের গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানকাজে সফলতা রয়েছে, তারা যেন এই উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নেয়। ২০১৬ সালে এই কাজ শুরু করেছিলাম। মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে করতে আমাদের তিন বছর চলে গেছে। পরে করোনা মহামারীর কারণেও দুই বছর চলে গেছে। প্রায় ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটারের ডেটা এখন আমাদের হাতে। যুক্তরাষ্ট্রসহ এশিয়া, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার বেশ কিছু দেশের একাধিক কোম্পানি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতিযোগিতামূলকভাবে এই বিডিং অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করছি। রমজানের পর প্রি-বিড মিটিং হবে। সেখানে আগ্রহী কোম্পানিগুলো অংশ নেবে।’
পেট্রোবাংলা বলছে, সাগরে তেল-গ্যাস পেলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাদের অংশের তেল বা গ্যাস প্রথমে পেট্রোবাংলা এবং পরে দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে হবে। দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান কিনতে রাজি না হলে তখন তা বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে।
এদিকে সাগরে তেল-গ্যাস ও অন্যান্য হাইড্রোকার্বনের সম্ভাব্য মজুদের পরিমাণ জানতে দ্বিমাত্রিক জরিপ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে শেষ হয়েছে বহুমাত্রিক জরিপও। এসব জরিপের তথ্য কিনতে পারবে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে এ জন্য গুনতে হবে ১০ হাজার মার্কিন ডলার। এর সঙ্গে দরপত্রে অংশ নিতে এর বিড ডকুমেন্ট কিনতে আরও ৩০০ ডলার লাগবে।
এ প্রসঙ্গে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. নুরুল আলম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আগ্রহীদের যদি আলাদা কোনো ডেটা প্রয়োজন হয়, সেটি তাদের আমরা সরবরাহ করব। সবগুলো দূতাবাসে যোগাযোগ করা হয়েছে। আমরা ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার পাশাপাশি ওয়েবসাইটে তথ্য হালনাগাদ ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের কোম্পানিকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সম্পদ আহরণে উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু অফশোর না, অনশোরেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করতে হবে। সে জন্য আমরা অনশোর পিএসসিকেও আপডেট করার চেষ্টা করব শিগগির। যাতে অনশোরেও বিদেশি বিনিয়োগকারী আগ্রহী হয়।’
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, ‘আমরা ৫৫টি আইওসিকে (আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি) আহ্বান জানিয়েছি। পেট্রোবাংলার উদ্যোগে দুটি ডেটা সেন্টার করা হবে। এখানে ৮টি প্যাকেজে ডেটা প্রস্তুত করা হয়েছে। আগ্রহীরা এই ডেটা কিনতে পারবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে কোনো রয়্যালিটি দিতে হবে না। তেল-গ্যাস পেলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দাম নির্ধারণ করা হবে। তেল পেলে ২০ এবং গ্যাসের জন্য ২৫ বছর ধরা হয়েছে। ঠিকাদারের ব্যাংক গ্যারান্টি একেবারে মিনিমাম (সর্বনিম্ন) রাখা হবে। সবচেয়ে আকর্ষণীয়, কস্ট রিকভারি ৭৫ ভাগ প্রতি বছর। গাফিলতির জন্য কোনো রকম দুর্ঘটনা বা বাংলাদেশের ক্ষতি হলে তার দায়ভার ঠিকাদারকে বহন করতে হবে।’
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অংশে গভীর সমুদ্রে ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লকসহ ২৬টি ব্লক বা এলাকা রয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ সালে গভীর সমুদ্রে দুটি ব্লকে কাজ নেয় কনোকোফিলিপস। তারা দ্বিমাত্রিক জরিপ চালালেও পরে গ্যাসের দাম বাড়ানোর দাবি পূরণ না হওয়ায় কাজ ছেড়ে চলে যায়। এ ছাড়া একইভাবে চুক্তির পর কাজ ছেড়ে চলে যায় অস্ট্রেলিয়ার সান্তোস ও দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো দাইয়ু। এখন একমাত্র কোম্পানি হিসেবে অগভীর সমুদ্রের দুটি ব্লকে অনুসন্ধান চালাচ্ছে ভারতের কোম্পানি ওএনজিসি। এই দুটি বাদ দিয়ে বাকি ২৪টি ব্লকে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ জানায়, বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস ও অন্যান্য হাইড্রোকার্বনের বিশাল মজুদের সম্ভাবনার পরও অনুসন্ধান ও উৎপাদন অলাভজনক দাবি করে একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ শুরুর পর চলে যাওয়ায় ২০২০ সালের নভেম্বরে মডেল পিএসসি হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত বছরের ২৬ জুলাই মডেল পিএসসি-২০২৩ চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।