বোমারু বিমানের ফাঁকে গাজার আকাশে রমজানের চাঁদ

ভূমধ্যসাগরের সুনীল জলরাশি থেকে ঢেউয়ের তালে তালে ভেসে আসা বাতাসের মৃদুমন্দ পরশে জগতের কল্যাণ কামনায় যখন যে কোনো সাধারণ মুসলিম নারী-পুরুষের হৃদয়ের প্রতিটি দোলাচল সমর্পণ করার কথা মহান আল্লাহর কাছে, তখন কূলকিনারাহীন ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরার চেয়েও ভয়ানক এক ভীতিতে রমজানকে স্বাগত জানিয়েছে গাজাবাসী। যখন ইবাদত ও মানবতার ফুলে সাদা হয়ে যাওয়ার কথা কোনো তরুণী-মাতার পুরো অস্তিত্ব, তখন গাজায় জাতিগত নিধনের উদ্দেশ্যে অ্যাপার্থাইড রাষ্ট্র ইসরায়েলের বোমা নেমে এসে রক্তে লাল করে দিচ্ছে তাকে। কোড অব হাম্মুরাবি ও টেন কমান্ডমেন্টস থেকে শুরু করে পৃথিবীর সমস্ত আইনের বইয়ের পরিশেষ পাতা, সমস্ত ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থের ন্যূনতম নৈতিকতা, মানব-অভিজ্ঞতার সমস্ত সুকুমারবৃত্তির মৌলিক ধারাবিবরণী নস্যাৎ হয়ে চলেছে সেখানে।

গাজা এখন আর সহনশীল উন্মুক্ত কারাগার নয়; বরং গত পাঁচ মাস ধরে নিজেদের ভূখণ্ডের পুরোটাই উন্মুক্ত গুয়ান্তানামো বে হয়ে উঠেছে উপত্যকার প্রতিটি প্রাণের জন্য। চতুর্মুখী ও নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদের ক্ষণকালে পবিত্র মাহে রমজানকে স্বাগত জানাতে এবারও হয়তো সেখানকার  দু’চারটি শিশু কিনে এনেছে আতশবাজি আর ফানুস। হয়তো আনন্দে নয়, নিজেদের স্বাধীন ভূখণ্ডে পরিবার ও সমাজের সবার সঙ্গে স্বর্গীয় উল্লাসের মাধ্যমে স্বাগত জানানো বিগত রমজানসমূহের স্মরণে, কিংবা নিছকই অস্তিত্বের ঘোষণা জারি রাখতে। গাজাবাসীর শুধু সামান্য সুখস্মৃতি আছে, আর কিছু নেই। হয়তো আশাও নেই। তিনদিকে ইসরায়েলি সন্ত্রাস বাহিনীর বন্দুকের নল, যে কোনো সময়, যে কোনো দিক থেকে বুলেট বেরিয়ে বুক ঝাঁজরা করে ফেলতে পারে। যখন তখন আকাশ থেকে বোমারু বিমান ফেলে যেতে পারে বোমা। যে আকাশ মহানুভবতার সবচেয়ে বড় উপমা, যে আকাশে জগতের সবার জন্য আনন্দ, নিবেদন ও ঐশী সংযুক্তির মাস রমজানের বাঁকা চাঁদ উঁকি দেয়, গাজার সে আকাশ থেকে ইসরায়েলি বাহিনী ড্রোন হামলার মাধ্যমে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে মানবতা। কে জানে হয়তো বোমারু বিমানের খোঁজে আকাশে নজরদারি চালাতে চালাতেই গাজার শিশুদের চোখে ধরা পড়েছিল রমজানের চাঁদ!

চোখের শুকিয়ে যাওয়া পানিতে গোসল, বুলেট বোমা রাসায়নিকের তীব্রতায় বিষিয়ে যাওয়া বাতাসে নিঃশ্বাস, নিজেদের স্বজন হারানোর বেদনায় পুড়তে থাকা বেদনার কাবাব দিয়ে সাহরি আর দিনের পর দিন সবরকম মানবতা, নৈতিকতার পরাজয়ে বিশ্বসভ্যতার লজ্জা থেকে নিঃসরিত রক্তলাল শরবত দিয়ে ইফতার করছে গাজার মানুষ।

নিজেদের কলিজার কাবাব দিয়ে সাহরি এবং এসবের পর বিশ্বমানবতার প্রতি লজ্জা থেকে নিঃসরিত রক্ত দিয়ে ইফতার করছে গাজার মানুষ। গাজাবাসীর ওপর ইসরায়েলের চলমান এ বর্বরতা কোনো দৃষ্টিতেই শুধু একটি সুনির্দিষ্ট জাতিসত্তা, একটি উপত্যকা বা একটি মতাদর্শের ওপর নয়; বরং যে কোনো বিচারে তা গোটা মানবজাতি ও মানবতার টুঁটি চেপে ধরার শামিল।

একজন মাত্র নিরপরাধ ও নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যা করার মতোই। নিজেদের বনি ইসরাইল দাবি করা এবং দখলকৃত ভূখণ্ডের ‘ইসরায়েল’ নাম রাখা চরমপন্থি জাতীয়তাবাদী ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থেই এ ঘোষণা প্রথম এসেছে যে, একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যার অন্তর্ভুক্ত। কোরআনও এর সত্যায়ন করেছে (সুরা আল-মায়েদা: ৩২)। কারণ, মৌলিকত্বের বিবেচনায় গোটা মানবজাতি একক মানব মাত্র। যেমন নাকি এক সমুদ্র পানি আর একবিন্দু পানি উভয়ের মৌলিকত্বই হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন।

ইসরায়েল গত পাঁচ মাসে প্রায় বত্রিশ হাজার নিরপরাধ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে। আহত করেছে তিয়াত্তর হাজার নিরপরাধ মানুষকে। হাজারখানেক মসজিদ ও প্রয়োজনীয় সব হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দিয়েছে। অবস্থা এমন যে, নিজেদের বিবেক, ধর্মগ্রন্থের নির্দেশনা, মানবতার বৈশ্বিক ঘোষণা, জেনেভা কনভেনশন সবকিছুকে অস্বীকার করেছে তারা। 

রমজান শুরু হওয়ার আগের চব্বিশ ঘণ্টায় নিহত হয়েছেন ৮৫ জন ফিলিস্তিনি। তাদের মধ্যে দুই শিশু জেইনা ও ওমরেরও ছিন্নভিন্ন লাশ পাওয়া যায়। জাতিগত নিধনের উদ্দেশ্য সহজে সমাধা করার জন্য গাজার সাধারণ মানুষদের দক্ষিণাঞ্চলে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় ইসরায়েল। প্রাণ বাঁচাতে গাজাবাসী দক্ষিণাঞ্চলে এসে তাঁবু গেড়ে জড়ো হলে সেখানে নির্বিচারে হামলা চালানো হচ্ছে।

শঙ্কা হয়, সুয়েজ খাল অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে গাজা উপত্যকার ওপর দিয়ে খাল কেটে লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকে সংযুক্ত করার বাসনা হয়তো এ শতাব্দীতেই বাস্তব করে তুলবে ইসরায়েল। কিন্তু তা হবে নিরপরাধ গাজাবাসীর গড়িয়ে যাওয়া রক্ত এবং বিশ্বমানবতার হৃদয়ের রক্তক্ষরণের ওপর দিয়ে। ছোটবেলা মা আমাদের বিভিন্নভাবে ভয় দেখাতেন। বিশেষ করে, বাইরে যাওয়া থেকে আটকাতে না পারলে বলতেন, নদীতে ব্রিজ বানাতে হলে আগে নদীর দানবকে মানুষের মাথা কেটে দিতে হয়। তবেই দানব ব্রিজ বানাতে দেয়। আর মাথা সংগ্রহ করার জন্য লোকেরা শিশুদের ধরে নিয়ে গিয়ে কোরবানি করে দেয়। দানব ইসরায়েলের বাসনা মেটাতেও ১৯৪৯ সাল থেকেই রক্ত ও জীবন দিয়ে আসছে নিরপরাধ ফিলিস্তিনিরা। বর্তমানে তাদের বাসনা ও উন্মত্ততা এতটাই সীমা ছাড়িয়েছে যে, গোটা মানবতা তাদের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এ দানবের আগ্রাসী বাসনাকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য কোনো পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। গাজাবাসী নারী ও শিশুদের রক্তের বন্যায় পৃথিবীর সব কল্যাণ তথা মানবজাতির চিরন্তন মূল্যবোধ ন্যায় ও সততা ভেসে যাওয়ার আগেই যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটতে হবে বিশ্বকে। নইলে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন হয়ে মানবতার ওজোন (স্তর) হাজারো ছিদ্র করে বিশ্বকে বসবাসের অনুপযুক্ত করে তুলবে ইসরায়েল।

লেখক : অনুবাদক ও কলাম লেখক

dularehe@gmail.com