সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে ঝুঁকি নেই

সোমালিয়ান জলদস্যুর আক্রমণেও ঝুঁকিতে পড়ছে না সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন। ২০১৫ সালের পর থেকে সোমালিয়ান জলদস্যুদের তৎপরতা কমে আসার পর গত বছর পর্যন্ত আটটি জাহাজ জিম্মি করেছিল এই দস্যুরা। আর ২০২৪ সালে এসে জিম্মি করল বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে ৩৫৮টি জাহাজ আটকের ঘটনা ঘটেছিল। অর্থাৎ বৈশি^ক পরিস্থিতিতে সোমালিয়ান দস্যুদের আগের অবস্থা নেই। তাই সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ দেখছে না আন্তর্জাতিক রুটে জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো।

চট্টগ্রাম বন্দরে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে শীর্ষ শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মেডিটারিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি)। এই কোম্পানির হেড অব অপারেশনস আজমির হোসাইন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারত মহাসাগর হয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে যাওয়ার পথটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত রুট। আর এই রুটে শত শত জাহাজ প্রতিনিয়ত চলাচল করছে। এক বা দুটি বিক্ষিপ্ত ঘটনার কারণে এই রুটে পণ্য পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘লোহিত সাগরে হুতিদের আক্রমণের কারণে সুয়েজ খাল রুট যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন ভারত মহাসাগরের পথটি সচল হয়। ফলে এখন ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য পরিবহনে দুটি রুটই সচল।’

একই মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম। তিনি বলেন, ‘লোহিত সাগরের রুট দিয়ে বাংলাদেশি কনটেইনার বহনকারী শিপিং কোম্পানিগুলো পণ্য নিয়ে ইউরোপ যাচ্ছে। আর হুতিরা শুধু ইসরায়েলগামী জাহাজেই আক্রমণ করে থাকে। সে ক্ষেত্রে আমাদের পণ্যবাহী জাহাজ আক্রমণের বাইরে। এ ছাড়া ভারত মহাসাগরের রুটটিও আন্তর্জাতিক স্বীকৃত রুট। তাই পণ্য পরিবহনে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’

তবে সোমালিয়ান দস্যুরা বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহকে জিম্মি করলেও তাদের এখন আর সেই শক্তিমত্তা নেই বলে জানান বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তারা ভারত মহাসাগরে চলাচলরত ৩৫৮টি জাহাজ ছিনতাই করেছিল। এর মধ্যে শুধু ২০১১ সালেই করেছিল ১৬০টি। পরে ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালে ৮টি জাহাজ জিম্মির পর চলতি বছরে এমভি আবদুল্লাহকে জিম্মি করল সোমালিয়ান জলদস্যুরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমভি আবদুল্লাহকে ছিনতাইয়ের পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এই জাহাজটি দুর্বল গতির, নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল ও সশস্ত্র পাহারা না নেওয়াসহ বিবিধ কারণ। সাগরে এই পথে আরও অসংখ্য জাহাজ আশপাশে থাকলেও সেগুলো ছিনতাইয়ের শিকার হয়নি। এ ছাড়া এই রুটটি স্বীকৃত ঝুঁকিপূর্ণ রুট।’

এদিকে একসময় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল পদে থাকা এক ব্যক্তি জানান, প্রতিটি জাহাজে সিটাডেল (জাহাজের গোপন নিরাপদ কক্ষ) রয়েছে। এমভি আবদুল্লাহর ২১ নাবিক সেই সিটাডেলে আশ্রয় নিলেও ক্যাপ্টেন ও সেকেন্ড অফিসার আশ্রয় না নেওয়ায় সবাইকে সিটাডেল থেকে বের হয়ে আসতে হয়েছিল। জাহাজের ক্যাপ্টেনের অদূরদর্শিতা কিংবা খামখেয়ালিপনায় জিম্মি হয়েছে জাহাজটি।

অন্যদিকে গত শনিবার সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে গত ডিসেম্বরে জিম্মি হওয়া মাল্টার পতাকাবাহী জাহাজ রোয়ানু উদ্ধার করেছে ভারতীয় নৌবাহিনী। এ সময় কয়েকজন সোমালিয়ান জলদস্যুও আটক হয়। অর্থাৎ, এই এলাকায় সমুদ্র পাহারায় ভারতীয় নৌবাহিনীও সক্রিয় রয়েছে।

গত ১২ মার্চ এমভি আবদুল্লাহকে গত মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগর থেকে ছিনতাই করা হয়। এমভি আবদুল্লাহ মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে দুবাই যাচ্ছিল। জাহাজটি ছিনতাইয়ের পর সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের গ্যারাকাদে নোঙর করে। গত শুক্রবার বিকেলে সেই পয়েন্ট থেকে উত্তর দিকে আরও সাড়ে ৭ কিলোমিটার সরিয়ে নেওয়া হয়। এখনো জিম্মিকারীদের সঙ্গে জাহাজের মালিক কেএসআরএম গ্রুপের যোগাযোগ হয়নি। এদিকে জাহাজের নাবিকদের জন্য রাখা খাবার দস্যুরা খেয়ে ফেলছে বলে জমা থাকা খাবার দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিকল্প উপায়ে খাবার পাঠানোর রাস্তাও খুঁজছে মালিকপক্ষ। এর আগে ২০১০ সালে একই শিল্প গ্রুপের মালিকানাধীন এমভি জাহান মনি যখন জিম্মি করার ১০০ দিন পর মুক্তিপণ দিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়েছিল।