মানুষ সামাজিক জীব বলেই সে সমাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়। সমাজের রীতি-নীতি তার ব্যক্তিত্ব গড়তে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ব্যক্তি মানুষের কোনো কোনো আচরণ, কাজ, সফলতা বা সংকটও ভূমিকা রাখে সমাজের ওপর। মানুষের অভ্যাস বা সমস্যা ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে সমাজনীতিকে। সম্প্রতি জার্মান পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে সেই বিষয়টি। এক্সট্রিম আইনজাম বা চরম একাকিত্ব শিরোনামের ওই গবেষণায় দেখা গেছে, একাকিত্ব গণতন্ত্রকে ভঙ্গুর করে তোলে।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে বলছে, সামাজিক দূরত্ব বা সোশাল আইসলেশন থেকে এই একাকিত্বকে অনেকটা আলাদাভাবে দেখেন মনোরোগবিদরা। তাদের মতে, একাকিত্ব আসলে বাস্তবিক সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে আকাক্সক্ষীত সম্পর্কের মধ্যের ফারাককে বোঝায়। গবেষকরা বলছেন, জনতোষ আখ্যান, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রতি বাড়তে থাকা ঝোঁক ও অন্যদিকে, সহিংসতা ও আইনবিরোধী কার্যকলাপের বাড়বাড়ন্ত মানুষকে একা করে তুলছে।
এই গবেষণার লেখকদের মধ্যে একজন সমাজবিজ্ঞানী ক্লাউদিয়া বলেন, এগুলো নিছক মিল নয়, এর মধ্যে সংযোগ রয়েছে। ক্লাউদিয়ার মতে, যেসব মানুষ দীর্ঘ দিন ধরে একাকিত্বে ভোগেন, তারা দুনিয়াটাকে নেতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করেন। তারা ভাবেন চারপাশ আরও অন্ধকার, আরও ভয়ানক। ফলে তারা মানুষকে কম বিশ্বাস করেন, আশপাশের পরিবেশ বা প্রতিষ্ঠানকেও তাই মনে করেন তিনি। ক্লাউদিয়া বলেন, গণতন্ত্রের জন্য এটা সমস্যা, কারণ এই ব্যবস্থাটি অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। সেক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকেও নিজেকে সমাজের অংশ হিসাবে ভাবতে শিখতে হয়। কিন্তু পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান সবাই, এমনটা নয়। ক্লাউদিয়ার ভাষ্য, সমাজ বা কোনো গোষ্ঠীর অংশ হতে মানুষ এখনো চায়, কারণ এটা আমাদের গভীরে প্রোথিত যে একে অপরকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।
ডয়েচে ভেলে বলছে, জার্মান তরুণদের মধ্যে বাড়ছে একাকিত্ব। সরকারি পরিসংখ্যান মতে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি জার্মানদের প্রায় এক চতুর্থাংশই একাকিত্বে ভোগেন। এর প্রভাব পড়ছে তাদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক মনোভাবেও।
জার্মানির পরিবারবিষয়ক মন্ত্রী লিজা পাউজ একাকিত্বকে দেখেন বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুতর সমস্যা হিসাবে। তার মতে, একাকিত্ব থেকে বাড়তে পারে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডিমেনশিয়া বা অবসাদের মতো রোগের ঝুঁকি। যা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে সমাজ থেকে। ২৫ বছর বয়সি গাব্রিয়েলা গ্রোবারচিকোভা ১৫ বছর বয়স থেকেই একা বোধ করতে শুরু করে। তার মতে, তার বাবা-মায়ের বামঘেঁষা রাজনীতির ফলে পুরোপুরি গণতন্ত্রবিরোধী বা চরমপন্থি ধারণায় সে বিশ্বাস করে না। ফলে তিনি অন্যদের থেকে দূরত্ব বোধ করেন এবং একটা সত্যিকারের সম্পর্ক খুঁজে পাননি।
গবেষণাটি জানায়, গণতন্ত্রের প্রতি সন্দেহপূর্ণ মনোভাব তরুণদের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ১৬ থেকে ২৩ বছর বয়সি এক হাজার আটজন জার্মানদের মধ্যে ৪৮ শতাংশের মতে জার্মান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভালোভাবে কাজ করছে। ৪০ শতাংশের মতে ভবিষ্যতদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাজনীতিকরা।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের তুলনায় আগের প্রজন্মে গণতন্ত্র-প্রেম বেশি ছিল। জার্মান ইউথ ইনস্টিটিউটের সমাজবিজ্ঞানী বিয়র্ন মিলব্রান্ডট বলেন, তরুণদের মধ্যে ডানপন্থার দিকে ঝোঁকার হার বিষয়ে সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে ঊর্ধ্বগামী একাকিত্ব মোকাবিলায় নানামুখী সমাধানের পথ বেছে নিতে হবে। স্কুলে রাজনৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার পাশাপাশি জার্মানির নাৎসি অতীত, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের গুরুত্ব, সবকিছুই পড়ানো, শেখানো উচিত। তার ভাষ্য, রাজনীতিক ও সুশীল সমাজের দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের জন্য এমন শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করে তোলা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাদের আরও আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।