জার্মানির সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব পেলেন জাকারিয়া

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর জার্মান সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বীকৃতি ফেডারেল ক্রস অব মেরিট অর্জন করেছেন বাংলাদেশি চিকিৎসা পদার্থবিদ অধ্যাপক ড. গোলাম আবু জাকারিয়া। স্থানীয় সময় গত শুক্রবার সন্ধ্যায় জার্মানির ভিল শহরে বুর্গহাউজ বিয়েলস্টাইন ভবনে অধ্যাপক ড. গোলাম আবু জাকারিয়ার হাতে সম্মাননা সনদ তুলে দেন ভিলের লান্ডার্ট (জেলা প্রশাসক) ইয়োখেন হাগট। জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ারের পক্ষ থেকে ‘ফেডারেল ক্রস অব মেরিট’ স্মারকটিও অধ্যাপক জাকারিয়াকে পরিয়ে দেন তিনি।

জার্মানির সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাবজয়ী এই চিকিৎসা পদার্থবিদ কথা বলেছেন জার্মানির আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের সঙ্গে। গোলাম মো. জাকারিয়া বলেন, পেশাগত জীবনে অনেক কাজ করেছি জার্মানিতে এবং বাংলাদেশে। এই সম্মাননা যে পাব, সেটা আমি কোনো দিন চিন্তা করিনি। এই সম্মাননা পেয়ে মনের ভেতর কেমন যেন একটা অনুভূতি হচ্ছে।

প্রথম কোনো বাংলাদেশি এবং বাঙালি হিসেবে এমন বিরল সম্মাননাজয়ী এই শিক্ষাবিদ বলেন, এটা আমার কাছে অদ্ভুত ব্যাপার লাগে।

৭০ বছর বয়সী ড. জাকারিয়ার জন্ম বাংলাদেশের নওগাঁর ইকরকুড়ি গ্রামে। ইন্টারমিডিয়েটের পর ভর্তি হয়েছিলেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পরের বছর বৃত্তিধারী শিক্ষার্থীদের একজন হয়ে প্রথম ব্যাচেই জার্মানিতে পা রাখেন তিনি। শুরুতে জার্মান ভাষা রপ্ত করার দিকে মনোযোগী হয়েছিলেন তিনি। ভাষাটা শেখার পর প্রকৌশল বিদ্যার কথা ভুলে মেডিকেল ফিজিকস বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সফল এই মানুষটি পরে দেশটির আনহাল্ট ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সের ক্লিনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপনা করেছেন। এ ছাড়া কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যুমারসবাখ টিচিং হাসপাতালের মেডিকেল ফিজিকস বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

সংবাদমাধ্যমটি বলছে, মরণব্যাধি ক্যানসার চিকিৎসায় মেডিকেল ফিজিসিস্টের গুরুত্বটা আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ড. জাকারিয়া। তিনি বলেন, যেখানে মেডিসিন আছে, সেখানেই আমরা এই সায়েন্সকে ব্যবহার করতে পারি। মূলত রেডিয়েশন যেখানে ব্যবহার করা হয়, আজকের জগতে সেখানেই এটির ব্যবহার রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মনে করেন, একজন ডাক্তার ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা করবেন। তার জন্য তিনটি মোডালিটি আছে : সার্জারি, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি। যখন রেডিওথেরাপি করবে, সেটি রেডিয়েশন দিয়ে। কিন্তু রেডিয়েশন তো দেখা যায় না, শোনা যায় না, এর স্বাদ নেই। কিন্তু সেটা আমরা শরীরে ব্যবহার করছি। শরীরে যেখানে ক্যানসার, সেখানে যদি এটি দিতে পারি, তাহলে ক্যানসার আরোগ্য হবে। কিন্তু যেখানে ক্যানসার নেই, সেখানে যদি এটা পড়ে, তাহলে কিন্তু আবার ক্যানসার হবে। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার না? সেজন্য আমাদের এমনভাবে দিতে হবে, যেখানে ক্যানসার সেখানেই এবং আশপাশের কোষগুলোকে বাঁচাতে হবে।

আর এ কাজটি মেডিকেল ফিজিসিস্টরাই করতে পারেন বলে জানালেন তিনি। তিনি বলেন, ‘কারণ চিকিৎসকরা জানাবেন, এই স্থানে ক্যানসার, আমি সেখানে রেডিয়েশন দিতে চাই। তুমি এখন দেখো, কীভাবে কী করা যায়। রেডিয়েশন শরীর ভেদ করে যাচ্ছে, কিন্তু যেখানে ক্যানসার আক্রান্ত অংশ রয়েছে, শুধু সেখানেই সেটি কার্যকর হবে। এজন্য প্রচুর অ্যালগরিদম রয়েছে। বিজ্ঞানের অনেক ব্যবহার আছে। কম্পিউটারের সাহায্যে আমরা কাক্সিক্ষত স্থানে রেডিয়েশন পৌঁছাতে পারি।’

আর এটাকেই চিকিৎসা পদার্থবিদ্যার অন্যতম বিশেষত্ব হিসেবে মনে করেন তিনি। হাজার পঞ্চাশেক মানুষকে সুস্থ করে তুলেছেন এই মানুষটি। আর সেটাকেই জীবনের বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন প্রবাসী এই বাংলাদেশি।

অধ্যাপক জাকারিয়া বলেন, ‘জার্মানিতে আমার তো মনে হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ আমার অধীনে এই চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের ব্যথা আমি কমাতে পেরেছি। বিজ্ঞানের একজন মানুষ হয়ে এত রোগীকে সুস্থ করা ও তাদের ব্যথা কমানো এটা আমার জন্য বিরাট ব্যাপার।’

জার্মানির উন্নত জীবনযাপনে তিনি নিজেকে আটকে রাখেননি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অংশটিকে তিনি বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠা করার পেছনে রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। জার্মানি ও বাংলাদেশের সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং জার্মান সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশে মেডিকেল ফিজিকসের বিকাশে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে মাস্টার্স পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করেছি। এ পর্যন্ত ব্যাচেলর ও মাস্টার্স মিলিয়ে প্রায় দুইশোর মতো ছাত্র আমি তৈরি করেছি।’

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মেডিকেল ফিজিকস নিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মাস্টার্সে অধ্যয়নের সুযোগ তৈরি করেন তিনি। পরে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি নেওয়ারও সুযোগ তৈরি করেন আবু জাকারিয়া। বাংলাদেশে যে হাসপাতালগুলোতে ক্যানসার রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়, সবখানেই তার হাতে গড়া শিক্ষার্থীরা রয়েছেন বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘এটি আমার জন্য একটি সত্যিই সৌভাগ্য। জার্মানিতে বাস করে জার্মানিতে শিক্ষকতা করা, আবার বাংলাদেশেও করতে পারলাম। এটা অদ্ভুত ব্যাপার।

ক্যানসার চিকিৎসায় অসামান্য অবদানের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ড. জাকারিয়া অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।