প্লাস্টিক কারখানায় আগুন অল্পের জন্য রক্ষা

রাজধানীর পুরান ঢাকার ইসলামবাগ এলাকায় প্লাস্টিক পণ্য তৈরির একটি কারখানায় আগুনের ঘটনা ঘটেছে। চারতলা ভবনটির দোতলায় শুক্রবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে বলে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা ছিল না। প্লাস্টিক দানা ও রাসায়নিক দ্রব্য স্তূপ করে রাখায় দেয়াল ভেঙে আগুন নেভাতে হয়েছে।

ইসলামপুরের টাইগার গলিতে ‘কমিশনার বিল্ডিং’ নামেও ওই ভবনে লৌহজং প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রির এই কারখানা। এতে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল ও গোয়ালঘরের ম্যাট তৈরি হতো।

ভবনের দোতলায় আগুন লেগেছে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ১০টি ইউনিটের প্রায় আট ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনের ভয়াবহতা দেখে যুক্ত হয়েছিল নৌবাহিনীর একটি অগ্নিনির্বাপণ টিমও।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ভবনে ও আশপাশে পানির স্বল্পতা ছিল। এমনকি ঘটনাস্থলে যেতে রাস্তার সমস্যার মুখোমুখিও হতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের। এ ছাড়া ভবনের ভেতরে প্রবেশে করতেও বেগ পেতে হয়েছে। পরে ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ভেতরে পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

ফায়ার সার্ভিস আরও জানিয়েছে, ভবনটির আশপাশে অসংখ্য লাগোয়া ভবন ও বাড়ি ছিল। পাশেই ছিল বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার। যদি এই আগুন ছড়িয়ে পড়ত এবং ট্রান্সমিটারের একটি বিস্ফোরণ ঘটত, তাহলে ভয়ানক অবস্থা তৈরি হতো।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ভবনের ভেতরে স্তূপ করে রাখা ছিল কাটা ছোট প্লাস্টিক। মেশিনে এসব গলিয়েই বানানো হতো বড় শিট। সেসব শিট কেটেই পরে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করা হতো।

গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিনে ভবনের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, চারতলা ভবনটির নিচতলায় গুদাম এবং দোতলাসহ অন্যান্য ফ্লোরে মেশিনপত্র।

ফ্লোর জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা প্লাস্টিকের ছোট দানা। সেখানে কেমিক্যাল দিয়ে এসব প্লাস্টিক গলিয়ে বড় শিট তৈরির বেশ কয়েকটি মেশিনও রয়েছে। ভবন জুড়ে ধোঁয়া ও প্লাস্টিক পোড়া গন্ধ। তবে এর মধ্যেই এসব প্লাস্টিক সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছেন শ্রমিকরা। ভবনটির দ্বিতীয়-তৃতীয়তলার বেশ কয়েক জায়গায় দেয়ালে করা হয়েছে বড় বড় ছিদ্র। আগুন নেভাতে এসব ছিদ্র করেছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

কারখানার ভেতরে কথা হয় আল আমিন নামের এক শ্রমিকের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আসলে তেমন কোনো কিছু পোড়েনি। অল্প জায়গায় আগুন জ¦লেছে। কিন্তু ধোঁয়া বের হয়েছে প্রচুর। এখন যেসব প্লাস্টিক ভালো আছে, সেগুলো বাইরে বের করে নিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকরা। ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি কারখানার মালিকপক্ষ কিংবা ভবনসংশ্লিষ্ট কেউ।

এ সময় কথা হয় কারখানার ব্যবস্থাপক মো. আশিকের সঙ্গেও। তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত চালানোর পর কারখানা বন্ধ ছিল। গতকাল শনিবার সকালে কারখানা খোলার কথা ছিল। পণ্য বিক্রিতে ধীরগতি তৈরি হওয়ায় কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছিল। ৮০ জনের মতো কর্মীর সবাই ছুটিতে ছিলেন। ঠিক কী কারণে আগুনের ঘটনা ঘটেছে তা জানেন না আশিক। তবে তার ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এ ঘটনা ঘটতে পারে। আগুনে এক কোটি টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শী আজাদ মাহমুদ বলেন, আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের টিম দ্রুত আসে। রাত হওয়ায় রাস্তা খালি ছিল, এজন্য তারাও দ্রুত আসতে পেরেছেন। আগুনও দ্রুত নেভানো গেছে।

দ্রুত নেভানো না গেলে হয়তো আগুন আরও ছড়িয়ে যেত। স্থানীয় বাসিন্দা ইয়ামিন বলেন, ফায়ার সার্ভিস যে পানি নিয়ে এসেছে, সেই পানি দিয়ে কিছুই হতো না। আশপাশের বাসাগুলোর ট্যাংকিতে জমানো পানি দেওয়া হয়েছে। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এগিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, এটা একটা প্লাস্টিক-রাবারের কারখানা, এখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে পুরনো জিনিসপত্র এনে রিসাইকেলও করা হয়। স্যান্ডেল ও ম্যাট তৈরিতে পাউডার-জাতীয় বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার হয়। সেগুলোর কারণে হয়তো আগুনটা দ্রুত ছড়িয়েছে।

বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ভবনটিতে ফ্যাক্টরির লোকজনই থাকে, আবাসিক কোনো মানুষ থাকে না। পাশের প্রায় সব ভবনেই কারখানা আছে, আবার আবাসিকও। তারা জানান, পুরো ইসলামবাগেই আবাসিক ভবনে কারখানার ছড়াছড়ি। নিম্ন-মধ্যবিত্তদেরই বসবাস বেশি এখানে।

ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে দিয়েই গেছে বৈদ্যুতিক তার। দুই পাশে অন্তত চারটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিটার আছে। চারদিকে এমন জঞ্জালপূর্ণ অবস্থার মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়লে পরিণতি ভয়াবহ হতো বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।

লালবাগ ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশনমাস্টার মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এখানকার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক ও অন্যান্য দ্রব্য স্তূপ করে রাখা হয়। যে কারণে আগুনের ঝুঁকিও বেশি।

গুলশানের এডব্লিউআর টাওয়ারের আগুন : গতকাল বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে গুলশান-১ নম্বরে এডব্লিউআর টাওয়ারের দশমতলায় লাগা আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিটের চেষ্টায় ৪টা ৪০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার রাফে আল ফারুক। তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে। এডব্লিউআর টাওয়ারের ১৭-তলা ভবনের ১০-তলায় আগুনের সূত্রপাত ঘটে। এতে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আগুন লাগার কারণ সম্পর্কেও তিনি তাৎক্ষণিক জানাতে পারেননি।