স্বপ্ন পুড়ে শেষ, ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আহাজারি

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গত শনিবার রাতে ঝড়ো বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল রবিবার বিকেলেও বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে গতকালের তাপমাত্রা ছিল কম। এমন আবহাওয়ার মধ্যেও শনিবার রাত থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের তিন জায়গায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত শত পরিবার।

এর মধ্যে গতকাল বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠের পাশে গোডাউন বস্তিতে আগুন লাগে। আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় বিকেল ৫টা ৩৩ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট কাজ করে এই আগুন নিয়ন্ত্রণে। তবে তার আগেই বস্তির বহু ঘর পুড়ে যায়। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারেননি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা।

এর আগে দুপুরে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার একটি সুপারবোর্ড কারখানায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট ওই আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।

এর আগে শনিবার রাত পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে গাউছিয়া কাঁচাবাজারে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিটের চেষ্টায় তিন ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে বাজারের শতাধিক দোকানসহ মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

রাজধানী মহাখালীর গোডাউন বস্তিতে লাগা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দুই শতাধিক কাঁচাঘর। সর্বস্ব হারিয়ে আহাজারি করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে ওই বস্তিতে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। পরে ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিটের চেষ্টায় ৫টা ৩৩ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

সরেজমিনে গতকাল বিকেলে দেখা যায়, আগুনে বস্তির দুই শতাধিক ঘর ও ঘরে থাকা আসবাবসহ বস্তিবাসীর ব্যবহৃত সব জিনিস পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। সেখান থেকে তখনো ধোঁয়া উঠছিল। আগুনে সর্বস্ব হারিয়ে অনেকেই আহাজারি করছেন। কেউ কেউ ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কিছু অক্ষত আছে কি না, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বস্তির বাসিন্দা আফরোজা বলেন, ‘প্রথম যখন একটি দোকানে আগুন লাগে, তখন দৌড়ে ঘর থেকে বের হই। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো বস্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। ভেতর থেকে কিছুই আনতে পারিনি। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?’

আগুনে সব হারানো শামছুন্নার বলেন, ‘আমাগো আর কিছু রইল না। কী নিয়া বাঁইচা থাকমু? পোলাডা মাদ্রাসায় পড়ে। ওর বই-খাতা পুড়ে ছাই। নিজেগো কিচ্ছু নাই। রাইতে থাকনের জায়গাটুকুও শ্যাষ হয়ে গেল! এহন এক কাপড়ে দাঁড়ায়ে আছি, ক্যামনে বাঁচমু?’

রূপগঞ্জে শতাধিক ব্যবসায়ীর স্বপ্ন পুড়ে ছাই : ঈদ সামনে রেখে বেচাকেনা দোকানে বেশি হবে সেই আশায় রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল  এলাকার গাউছিয়া কাঁচাবাজারের মুদিমনোহারি ব্যবসায়ী মো. হাসান ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দোকানে বেশি করে মালামাল উঠিয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল ঈদের বেচাকেনা করে ব্যাংকের ঋণ শোধ করবেন এবং বাকি টাকায় এক টুকরো জমি কিনবেন। সেই স্বপ্ন যেন স্বপ্ন রয়ে গেল। গাউছিয়া কাঁচাবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে হাসানসহ শতাধিক ব্যবসায়ীর স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানান, গাউছিয়া কাঁচাবাজারে শতাধিক দোকান রয়েছে। এসব দোকানে মুদিমনোহারি, সবজি, বিভিন্ন যানবাহনের পার্টস, কনফেকশনারি, মাংস, দই-মিষ্টি, বিভিন্ন ফলসহ নানা ধরনের মালামাল বিক্রি হতো। প্রতিদিনের মতো গত শনিবার রাতেও সারা দিন বেচাকেনার পর রাতে দোকানপাট বন্ধ করে ব্যবসায়ীরা বাড়ি চলে যান। ভোরে তারা জানতে পারেন বাজারে আগুন লেগেছে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। রাতে বিকট শব্দে বজ্রপাত ও ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। বজ্রপাত ও বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা।

গজারিয়ায় সুপার বোর্ড কারখানায় আগুন : মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় সুপার বোর্ড নামে টিকে গ্রুপের মালিকানাধীন একটি বোর্ড তৈরির কারখানা আগুনে পুড়েছে। এ সময় পাশেই নদীতে নোঙর করা তিনটি ইঞ্জিনচালিত মালবাহী ট্রলার পুড়ে যায়। গতকাল বেলা ১টার দিকে হোসেন্দী ইউনিয়নের সিকেরগাঁও এলাকার ওই কারখানায় আগুন লাগে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল থেকে ওই কারখানায় কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। বেলা ১টার দিকে কারখানায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। কারখানার শ্রমিক ও স্থানীয়রা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। তবে আগুনের ভয়াবহতা তীব্র হওয়ায় ব্যর্থ হন তারা। কারখানার পাশেই নদীতে পাটখড়িবোঝাই তিনটি ট্রলার অবস্থান করছিল। একপর্যায়ে কারখানার আগুনের ফুলকি বাতাসের মাধ্যমে ওই ট্রলারগুলোতে পড়লে মালামালসহ ট্রলারগুলো আগুনে পুড়ে যায়। পড়ে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছিলেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।