বিএসএমএমইউ

সিন্ডিকেট সভা হবে না, রুটিন কাজ করবেন উপাচার্য

উপাচার্যের শেষ সময়ে আর কোনো সিন্ডিকেট সভা করবে না বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) প্রশাসন। গতকাল রবিবারও সিন্ডিকেট সভা হয়নি। এমনকি নতুন উপাচার্য আসার আগপর্যন্ত আজ ও আগামীকাল শুধু রুটিন কাজ করবেন বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। এ সময় প্রশাসনিক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন সিদ্ধান্তে সিন্ডিকেট সভা কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহ ধরে চলে আসা উত্তেজনার আপাতত অবসান হলো।

আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) বিশ্ববিদ্যালয় শাখার চিকিৎসকদের অভিযোগ, বর্তমান উপাচার্যের সময়ে অ্যাডহক ভিত্তিতে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া কিছু চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা- কর্মচারীদের শেষ মুহূর্তে চাকুরি স্থায়ী, পদোন্নতি এবং দুই হাসপাতালে কিছু নতুন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিতে চান উপাচার্য। এজন্য তিনি সিন্ডিকেট সভা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কিন্তু সেই নিয়োগ ও পদোন্নতি ঠেকাতে সিন্ডিকেট সভা করতে দিতে নারাজ স্বাচিপ। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। উপাচার্য সমর্থকদের সঙ্গে স্বাচিপের চিকিৎসকদের দুই দফায় মারামারির ঘটনাও ঘটে।

সর্বশেষ গত শনিবার উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারীসহ চার চিকিৎসক কর্মকর্তাকে স্বাচিপের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মারধর করার অভিযোগ ওঠে। এমনকি গত শনি ও গতকাল রবিবার যাতে কোনোভাবেই সিন্ডিকেট সভা হতে না পারে, সেজন্য মিল্টন হলের সামনে অবস্থান নেন স্বাচিপের চিকিৎসকরা। উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়াতে গত শনিবার রাত থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সিন্ডিকেট সভা না করার ঘোষণা দেন উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

শনিবারের ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলাল গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো সিন্ডিকেট সভা হয়নি এবং হবে না। নতুন উপাচার্য আসার আগপর্যন্ত বর্তমান উপাচার্য রুটিন ওয়ার্ক করছেন ও করবেন। উনি শান্তভাবে বিদায় নেবেন, আমরাও শান্তভাবে বিদায় জানাব। নতুন উপাচার্যকে স্বাগত জানাব।’

তিনি জানান, গত শনিবারের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান খান ও তাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে মোতায়েন করা পুলিশ ২৮ মার্চ, অর্থাৎ নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের দিন পর্যন্ত থাকবে বলে জানান প্রক্টর।

উপাচার্যের শেষ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চিকিৎসকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ও চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে জানান, বর্তমান উপাচার্য নিয়মের বাইরে অনেক লোকজন নিয়োগ দিয়েছেন। এসব নিয়োগে তার কাছের লোকজনের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কিছু নিয়োগের জন্য আর্থিক লেনদেন হলেও সেসব নিয়োগ এতদিন দিতে পারেননি। শেষমুহূর্তে এখন তারা চাপ দিচ্ছেন। সেজন্যই উপাচার্য সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে এসব নিয়োগ ও কিছু পদোন্নতি চূড়ান্ত করতে চাইছিলেন। কিন্তু এতদিন চুপ থাকলেও স্বাচিপের লোকজন এখন এসব নিয়োগ বন্ধে তৎপর হয়েছেন। তারা কিছুতেই এসব নিয়োগ হতে দেবেন না। কিন্তু উপাচার্যের লোকজন এসব নিয়োগ দিতে তার ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছেন। এ নিয়ে দুপক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। কিন্তু এটা সত্য যে, উপাচার্য শেষ মুহূর্তে কিছু নিয়োগ দিয়ে যেতে চাইছেন। দিতে পারছেন না কারণ সিন্ডিকেট সভা করতে পারছেন না। এজন্য উপাচার্য অস্থির হয়ে উঠেছেন। আবার স্বাচিপ ও কিছু শিক্ষক চিকিৎসক তারা চান না এভাবে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ হোক।

অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়াদকালীন সময়ে উপাচার্য ৫০০ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের উপাচার্য দিয়েছেন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজারের মতো। বিশেষ করে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়োগ দিতে উপাচার্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। উনিই তো অস্থিরতা তৈরি করলেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ নিয়োগ দেবেনই। কিন্তু স্বাচিপ দিতে দেবে না। তারা অনুরোধ করেছে না দিতে। কিন্তু উপাচার্য শুনছিলেন না। শেষ মুহূর্তে দুপক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিল।’

এ কর্মকর্তা জানান, নার্সদের দুই পদে ও কর্মকর্তাদের পাঁচ পদে পদোন্নতি দিতে চান উপাচার্য। ৩২ জনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য তৈরি করেছেন। ৪০০-৫০০ জন নিয়োগ দিয়েছেন সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে। কিছু দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োগ। কিছু আছে নিয়োগ দিতে পারেননি। এখন দিতে চান।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা তৈরি করা কারও পক্ষেই কাম্য নয়। মেয়াদের শেষ সময়ে এসে নীতিগত কোনো জিনিস তোলা উচিত নয়। এ সময় রুটিন কাজ করা উচিত। তাহলে মানুষের মনে কোনো প্রশ্ন আসে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা বাংলাদেশে একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠান, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এটা নিয়ে যেন কারও মনে কোনো বাজে ধারণা তৈরি না হয়, সেজন্য সবারই একটা চেষ্টা থাকা উচিত।’