মস্কোয় যুক্তরাষ্ট্রের ‘আফগান কৌশল’

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর আদালতে সর্বশেষ আলিশের কাসিমভ নামের কিরগিজস্তানের এক ব্যক্তিকে গতকাল মঙ্গলবার হেফাজতে নিয়েছে। তিনি গত শুক্রবার মস্কোর ক্রকাস সিটি হলে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় আটক হওয়া অষ্টম ব্যক্তি। আগের দিন সোমবার রাতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এক বৈঠকে ঘটনার সঙ্গে উগ্র ইসলামপন্থিদের সংশ্লিষ্টতার কথা তুলে ধরেন। তবে তিনি গুরুতর প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘হামলা চালিয়েছে ইসলামি মৌলবাদীরা, কিন্তু তাদের নির্দেশটা দিল কে?’ সংবাদমাধ্যম বলছে, পুতিন সম্ভবত  নির্দেশদাতা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে পশ্চিমা যোগসাজশ দেখেন।   

ঘটনার দায় স্বীকার করে নিয়েছে সিরিয়া, ইরাকের মাটি থেকে বেড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের খোরাসান শাখা যারা আইএস-কে নামে পরিচিত। মধ্য এশিয়াসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মুসলিমরাই এই সংগঠনের ভিত্তি। এদের কেন্দ্র আফগানিস্তান। ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা আইএসের সঙ্গে আইএস- কে’র যোগাযোগ কেমন, তা স্পষ্ট নয়।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে হঠাৎ করে হামলা পরিচালনায় আইএস-কের কী যুক্তি, আদর্শিক অবস্থান বা ক্ষোভ থাকতে পারে, তা-ও স্পষ্ট নয়। তবে গণমাধ্যমগুলো বিশ্লেষকদের নানা মত তুলে ধরছে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগবিষয়ক বিশ্লেষক জন মিলার মনে করেন, চেচেন যুদ্ধে মুসলিমদের ওপর রাশিয়ার নিপীড়ন ছাড়াও ককেশাস অঞ্চলে রুশ প্রশাসনের গৃহীত পোড়ামাটি নীতির কারণে পূর্ব ইউরোপীয় ও ইউরেশীয় মুসলিমদের ওপর সৃষ্ট প্রভাব নিয়ে আইএস ক্ষুব্ধ। উল্লেখ্য, পোড়ামাটির নীতি হচ্ছে, দীর্ঘকাল ধরে প্রতিপক্ষের যুদ্ধ করার সব শক্তিকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করা এবং মানুষের খাদ্য, পানির মতো জিনিসের সংকট তৈরি করা।

রুশ গণমাধ্যমগুলো বলছে, গত কয়েক মাসে আইএস-সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি হামলা নস্যাৎ করে দিয়েছে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০২১ সালের মে মাসে আফগানিস্তানের একটি উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ৮৫ জনকে হত্যা করার দায়ও নেয় তারা। ২০১৮ সালে পাকিস্তানের মাসতুংয়ে নির্বাচনী জনসভায় আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে ১২৮ জনকে হত্যা করে তারা। এ ছাড়া আরও অনেক ঘটনার সঙ্গে তাদের নাম জড়িয়ে রয়েছে। এখন পুতিনের দিক থেকে তোলা প্রশ্নটি গুরুতর। কারণ তিনি ঘটনার পর দাবি করেছিলেন, এতে জড়িতরা ইউক্রেনের দিকে পালিয়ে যেতে ধরেছিল এবং ওই সময়ই তাদের পাকড়াও করা হয়। রুশ কর্মকর্তারা বলছিলেন, এতে অর্থায়ন করে থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাস্তবায়নে কাজ করেছে ইউক্রেন।

১৩৯ জনের প্রাণসংহারী মস্কো হামলা সম্পর্কে পুতিনের নতুন বয়ান এরকম, ‘আমরা জানি, এই ঘটনা ঘটিয়েছে ইসলামি মৌলবাদীরা। কিন্তু তাদের কারা নির্দেশ দিলো?’ তিনি আরও মনে করেন, ইউক্রেনের সঙ্গে তাদের যে যুদ্ধটি চলছে, তার একটি রূপ হচ্ছে মস্কোর কনসার্টে হামলা। 

পুতিন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওই বৈঠকে আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বোঝাতে চাইছে, এতে কিয়েভের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু আক্রমণকারীরা ইউক্রেনের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেখানে তাদের জন্য কারা অপেক্ষা করেছিল?’

পুতিনের বক্তব্যে জড়িতদের খোঁজার যে ধরন তার সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনামলের শেষ দিকের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে। ১৯৭৯-৮৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারির বিরুদ্ধে তালেবান যোদ্ধাদের সহযোগিতা দিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। পরবর্তী সময়ে তালেবান হয়ে ওঠে মার্কিন সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। মোদ্দাকথা হচ্ছে, মস্কো হামলায় পুতিন মার্কিন আফগান কৌশলের ছায়াই দেখতে পারেন।