চট্টগ্রাম নগরে চার বছর আগে অভিযোগ পেয়ে অনুপ বিশ্বাস নামে এক মাদক কারবারি ও তার স্ত্রী রমা বিশ্বাসের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যার ধারাবাহিকতায় ২০২২-২৩ করবর্ষের আয়কর নথিতে এ দম্পতির প্রায় ১৩ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য পান অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২-এর সাবেক সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম। তবে অনুসন্ধান শেষে অনুপ-রমা দম্পতির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে ‘ক্লিন সার্টিফিকেট’ দিয়ে দেন তিনি।
গত বছর ২৭ সেপ্টেম্বর দুদকের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালকের কাছে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেন নুরুল ইসলাম। কিন্তু তার ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদন গ্রহণ করেননি কমিশনের ঊর্ধ্বতনরা।
চট্টগ্রাম নগরের প্রভাবশালী মাদক কারবারি অনুপ ও তার ব্যবসায়ী স্ত্রীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনায় তদন্ত কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের ভূমিকাকে রহস্যময় মন্তব্য করে এক বিশ্লেষণে অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও নানা অসম্পূর্ণতা তুলে ধরেন দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত শাখার পরিচালক মো. ইউছুপ এবং কমিশনার (তদন্ত) আছিয়া খাতুন ও মো. জহুরুল হক। প্রতিবেদনের ত্রুটি তুলে ধরে দুদকের ঊর্ধ্বতন এসব কর্মকর্তা বলেছেন মাদক কারবারি অনুপ বিশ্বাস দম্পতির ১৩ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদের মধ্যে ৮ কোটিই কালো টাকা। কিন্তু অনুসন্ধান কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম তার প্রতিবেদনে পুরো ১৩ কোটি টাকাই ওই দম্পতির গ্রহণযোগ্য আয় বলে মেনে নিয়েছেন। অথচ তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরুর পর (২০২১-২২ করবর্ষে) কালো টাকা সাদা করার চেষ্টা করেন এ দম্পতি, যা বিধিমতে গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদক, চট্টগ্রাম কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, অনুপ দম্পতির সম্পদের অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে পুনঃপ্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নতুন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর সহকারী পরিচালক আবদুল মালেক।
অনুপ বিশ্বাস নগরের কোতোয়ালি থানার ইকবাল রোডের মৃত শচীন্দ্রলাল বিশ্বাসের ছেলে। নগরের ফিরিঙ্গিবাজারে ‘কান্ট্রি স্পিরিট শপ’ নামে অনুপের একটি মদের দোকান (লাইসেন্সপ্রাপ্ত) আছে। এ ছাড়া তার এবং স্ত্রীর নামে আরও একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশি মদের লাইসেন্স নিয়ে অনুপ বিক্রি করেন বিদেশি মদ। লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে দিন-রাত খোলা রাখেন মদের দোকান। ক্রেতার তালিকা থেকে বাদ যায় না স্কুল-কলেজপড়ুয়ারাও।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উদ্ধার করা মাদকের সিংহভাগ গোপনে বিক্রি করেন অনুপ। পরে ভেজাল করে সেই মাদক বিক্রি করেন মাদকসেবীদের কাছে। নগরের থানা পুলিশের উদ্ধার করা ইয়াবার সিংহভাগই অনুপের কাছেই বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে অনুপ সম্পর্কে এসব অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন দুদক কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী অনুপ বিশ্বাসের ফিশারিঘাটে ‘কান্ট্রি স্পিরিট শপ’-এ শুধু মদপানের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছেই মদ বিক্রি করার কথা। কিন্তু এ শর্ত ভেঙে তার বিরুদ্ধে নগর জুড়ে চোলাই মদের পাশাপাশি বিদেশি মদ ও ইয়াবা কারবারের অভিযোগ আছে।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনের বিভিন্ন ত্রুটি উল্লেখ করে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত শাখার একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনুপ বিশ^াস অপ্রদর্শিত ৩ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার ১৪৯ টাকা কর দিয়ে বৈধ করেছেন। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম এটিকে গ্রহণযোগ্য আয় বলে মেনে নিয়েছেন। অনুপের ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দুদক অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু বিপুল উৎসবিহীন আয় বৈধ করার জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন অনুপ। তার (অনুপ) অদৃশ্য আয়ের উৎস দুদকের অনুসন্ধানাধীন থাকায় অপ্রদর্শিত আয় গ্রহণযোগ্য হবে না।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ৯ নম্বর পৃষ্ঠায় অনুপের ঋণ দায় দেখানো হয়েছে ৮ কোটি ১১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৬৪ টাকা। একই পৃষ্ঠায় ব্যয় পর্যালোচনায় উল্লিখিত তথ্য পরস্পরবিরোধী। অনুপের মোট সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৩ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার ১৪৯ টাকাই অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা। আয়কর উৎস প্রকাশ না করার সুবিধা দিয়ে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে গ্রহণযোগ্য আয় বলে গণ্য করা হয়েছে, যা বিধিসম্মত হয়নি। জামালখান এলাকায় ৩ কোটি টাকায় কেনা চারতলা ভবনের নিবন্ধন খরচ কত ছিল তা উল্লেখ নেই প্রতিবেদনে। পাথরঘাটা এলাকায় বিএস-২১৫৯ দাগে বিদ্যমান পাঁচতলা ভবন ক্রয়কালে মৌজা দর বিশ্লেষণ করা হয়নি। এ ছাড়া লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেড ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনুপ বিশ্বাস দুটি গাড়ি কেনার কথা উল্লেখ করলেও ডাউন পেমেন্ট কত ছিল তা পরিষ্কার করেননি দুদক কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম।
২০১৯ সালের ৩১ মার্চ জামালখান এলাকায় আড়াই কোটি টাকায় তার স্ত্রী রমা বিশ্বাসের কেনা ছয়তলা ভবনের নিবন্ধন খরচ সম্পর্কে তথ্য নেই প্রতিবেদনে। একইভাবে সুজা কাটগড় এলাকায় ২১৭৫ ও ২১৭৬ দাগের জমিতে ৩ কোটি টাকায় ছয়তলা ভবন কেনার সক্ষমতা ও ব্যাংক স্থিতি অনুপের স্ত্রীর আছে কি না, সে বিষয়টির বিশ্লেষণ নেই। এ ছাড়া ফিরিঙ্গিবাজার এলাকায় বিএস ৭৯৪ নম্বর দাগে একটি ভবন ৩ কোটি টাকায় কিনলেও সেটি ক্রয়ের সক্ষমতা নিরূপণ করা হয়নি। রমা বিশ্বাস ২২-২৩ করবর্ষে তার ব্যবসার মূলধন উল্লেখ করেছেন ৫৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু এ টাকার বৈধ উৎস নেই।
স্বামীর মতো রমা বিশ্বাসও তার বিপুল উৎসবিহীন আয় বৈধ করার জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন তখনই যখন তার এবং স্বামীর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছিল। ২০২০-২১ করবর্ষে রমা বিশ্বাসের অপ্রদর্শিত আয়ের পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লাখ ২৯ হাজার ৬৩৩ টাকা। এ ছাড়া প্রতিবেদনের ১৫ পাতায় রমা বিশ্বাসের দায়-দেনা ও ব্যয় পর্যালোচনায় পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে। রমার মোট সম্পদের পরিমাণ ৮ কোটি ২৫ লাখ ৯৮ হাজার ৫২৬ টাকা। এর মধ্যে ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৫৮ হাজার ৫৩১ টাকার সম্পদ অর্জনের উৎস উল্লেখ করেননি দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা; বরং অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরুর পর কালো টাকা সাদাকরণের চেষ্টা হয়েছে।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ তথ্য অনুযায়ী, অনুপ গত ১০ বছরে দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানি থেকে ১২ লাখ ৯০ হাজার ৮৪৩ লিটার দেশি মদ কিনেছেন। যার মূল্য ১৬ কোটি ৬১ লাখ ১৬ হাজার। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রমা বিশ্বাস ২০০৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যবসা, গৃহসম্পত্তি, ক্ষতিপূরণ উৎস থেকে আয় করেছেন ৮ কোটি ২৫ লাখ ৯৮ হাজার ৫২৬ টাকা। তার স্থাবর সম্পদ আছে প্রায় ৯ কোটি টাকার। অস্থাবর সম্পদ আছে ৭৩ লাখ টাকার। অনুপ বিশ্বাস দুদককে জানায়, নিজের এবং তার স্ত্রীর চারটি করে আটটি বাড়ি আছে। মদের ব্যবসা শুরু করেছেন ২০০৫ সালে। তার দুই ছেলে। বড় ছেলে অনুভব বিশ্বাস হোটেল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করছেন দার্জিলিংয়ে।
নগরের ৩৩ নম্বর পাথরঘাটায় ৮ শতক জমির ওপর আছে ছয়তলা, ২১ নম্বর জামালখান এলাকায় প্রায় ৫ শতক জমির ওপর ছয়তলা ভবন, ফিরিঙ্গিবাজার বিএস ৭৯৪ দাগের জমি করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে ছয়তলা ভবন। পাথরঘাটায় বিএস ২১৬০ দাগে ৩৩৩ বর্গফুট জায়গায় আছে একতলা দোকান, বিএস ২১৫৯ দাগে পাঁচতলা ভবন, ফিরিঙ্গিবাজার বিএস ৭৭ দাগে ২ শতক জমির ওপর পাঁচতলা ভবন, বিএস ২১৯০ দাগে ১ শতক জমির ওপর পাঁচতলা ভবন এবং নগরের রহমতগঞ্জ এলাকায় বিএস ১৫৬৯ দাগে ১ শতক জায়গার ওপর আছে চারতলা বাড়ি।
অনুপ বিশ্বাসের স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ২৩ লাখ ৮৬ হাজার ৬৬২ টাকা। এদিকে লংকাবাংলা ফিন্যান্স লিমিটেড ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে একটি বিলাসবহুল জিপ ও একটি প্রাডো ব্র্যান্ডের গাড়ি কেনার কথা দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উঠে এলেও তার কাছে বিএমডব্লিউ কার থাকার কথা এবং সম্প্রতি সাতকানিয়ায় ১০ একর জমি কেনার তথ্য উঠে আসেনি দুদকের তদন্তে। এ ছাড়া অনুপ দম্পতি তাদের আয়কর (২০২২-২৩) নথিতে যেসব সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন, এর চেয়ে আরও কয়েকগুণ সম্পদ আছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।