সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবল থেকে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ ও ২৩ নাবিককে উদ্ধারে চলছে দরকষাকষি। আর এই দরকষাকষি যেকোনো সময় চূড়ান্ত রূপ নিতে পারে। এরই আভাস পাচ্ছেন নাবিকরা। জিম্মি করার পর থেকে সবাইকে ব্রিজে (জাহাজ পরিচালনা কক্ষ) রাখলেও এখন তারা কেবিনে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে দস্যুরা বাইরে থেকে আনা খাবার খাচ্ছেন এবং নাবিকরা জাহাজে থাকা খাবার খাচ্ছেন। ভালো আচরণও করা হচ্ছে নাবিকদের সঙ্গে।
শুধু এটাই নয়, যদি আলোচনা চূড়ান্ত হয়ে যায় তাহলে জিম্মি নাবিকদের পক্ষে জাহাজ চালিয়ে দুবাই নিয়ে যাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে পাশর্^বর্তী কোনো বন্দরে জাহাজ নোঙর করে সেখান সবাইকে নামিয়ে দেশে ফেরত নিয়ে আসা হবে। আর দেশ থেকে বিকল্প একদল নাবিক গিয়ে সেই জাহাজ দুবাই নিয়ে যাবে। এমন একটি পরিকল্পনাও মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। যদিও গণমাধ্যমের সামনে কেউ সরাসরি এ বিষয়ে কথা বলছেন না। তবে সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।
এ বিষয়ে এমভি আবদুল্লাহর মালিক কেএসআরএম গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি ঈদের আগে নাবিকদের তাদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে। সে লক্ষ্যে যা যা করা দরকার আমাদের পক্ষ থেকে তা চলমান রয়েছে।’
তবে দস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আলোচনা না হলে অগ্রগতি কীভাবে হবে?’
জাহাজে নাবিকদের সঙ্গে তাদের পরিবারবর্গ ওয়্যারলেস সিস্টেমের মাধ্যমে কথা বলছেন। সর্বশেষ গত ২৫ মার্চ নাবিক মোহাম্মদ নূর উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলেছেন তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেদিন আমাকে বলেছিল সে ভালো আছে। দস্যুরা কোনো ধরনের নির্যাতন করছে না। তবে কেবিনে থাকার বিষয়টি আমাকে বলেনি। যদি কেবিনে থাকার সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে তাহলে হয়তো ২৫ মার্চের পরে হয়েছে।’
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবারও মালিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন জাহাজের চিফ কুক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের বড় ভাই দিদারুল আলম। বিকেলে দিদারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নাবিকদের মুক্তির প্রক্রিয়া চলছে বলে মালিকপক্ষ থেকে আজও আমাকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এটাও বলেছে যে জাহাজে সবাই ভালো আছেন।’
২০১০ সালে একই মালিকের জিম্মি হওয়া জাহাজ এমভি জাহান মনি উদ্ধারে সময় লেগেছিল ১০০ দিন। তাই এবার এমভি আবদুল্লাহ উদ্ধারে তুলনামূলকভাবে কম সময় লাগতে পারে বলে জানান বাংলাদেশ মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাহাজ মালিক কর্তৃপক্ষ জিম্মিদের উদ্ধারে খুবই অগ্রগামী। তাই হয়তো তারা দ্রুত নাবিকদের ফিরিয়ে আনতে পারবেন।’
উদ্ধার হওয়ার পর ওই নাবিক কি জাহাজ চালিয়ে নিয়ে আসবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু নাবিকরা একটা ট্রমায় থাকবেন তাই তাদের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। তবে তারা সেখান থেকে জাহাজটি চালিয়ে পার্শ্ববর্তী কোনো বন্দরে নিয়ে যেতে পারেন। সেই বন্দরে বিকল্প নাবিকরা যোগ দিলে তাদের কাছে জাহাজ হস্তান্তর করে নাবিকরা দেশে চলে আসতে পারেন। তবে জাহাজটি মুক্তি পাওয়ার পর সবার আগে দুবাই যাবে। জাহাজে থাকা ৫৫ হাজার টন কয়লা সেখানেই খালাস করা হবে।’
এদিকে সোমালিয়ান জলদস্যুদের স্থলভাগে সে দেশের পুলিশ ও জলভাগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ব্রিটিশ নেভাল টিম নজরদারিতে রেখেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এজন্য দস্যুরা চাপে থাকতে পারে। তবে গত ১২ মার্চ জাহাজটি জিম্মির করার পর ১৯ মার্চ সর্বপ্রথম দস্যুরা যোগাযোগ করে মালিক পক্ষের সঙ্গে। জলদস্যুদের পক্ষ থেকে যোগাযোগের পর মূলত তাদের সঙ্গে মালিক পক্ষের যোগাযোগ শুরু হয়। এরমধ্যে গত ২২ মার্চ জলদস্যুদের হাতে জিম্মি নাবিকদের স্বজনদের সঙ্গে ইফতার করেছে জাহাজের মালিক পক্ষ। এ সময় দ্রুত নাবিকদের ফিরিয়ে আনা হবে বলে আশ্বস্ত করা হয় স্বজনদের।
উল্লেখ্য, সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগরে এমভি আবদুল্লাহ জলদস্যুদের কবলে পড়ে। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাই যাচ্ছিল। জাহাজটি ছিনতাইয়ের পর সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের গ্যরাকাদে নোঙর করে। এরপর কয়েকবার অবস্থান পরিবর্তন করে জাহাজটিকে উপকূলের আরও কাছাকাছি নিয়ে যায় জলদস্যুরা।