রোজার ফজিলত অনেক। ‘ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রোজা রাখলে ব্যক্তির পূর্বের গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ -(সহিহ বুখারি ৩৮) পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে আত্মরক্ষার জন্য রোজা হবে ‘ঢালস্বরূপ হাতিয়ার’। রোজা আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে বলবে, ‘হে রব, আমি তাকে পানাহার ও যৌনসম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি...। তাই আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। তখন তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ ৬৬২৬) আর আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘রোজা কেবল আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব। বান্দা একমাত্র আমার জন্যই প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং আমার জন্যই পানাহার বর্জন করেছে।’ -(সহিহ মুসলিম ১১১৫) সে প্রতিদান কী হতে পারে? অপর একটি হাদিসে সে কথাও স্পষ্ট বলা আছে। ‘জান্নাতে রাইয়ান নামক বিশেষ একটি দরজা আছে, যা দিয়ে কেবল রোজাদাররাই প্রবেশ করবে।’ -(সহিহ বুখারি ১৮৯৬)
রোজার কারণে এ মাসের মর্যাদাও মহান আল্লাহর কাছে বেড়ে গেছে। এ মাসের নফল ইবাদত হয়ে গেছে ফরজের সমান। আর একটি ফরজ হয়ে গেছে সত্তরটি ফরজের সমান। জান্নাতের দরজাগুলো সারাক্ষণ খোলা আর জাহান্নামের দরজাগুলো সারা মাসের জন্য বন্ধ। প্রতিনিয়ত আল্লাহর রহমতের ধারা বর্ষিত হচ্ছে জমিনের ওপর। অকাতরে মুক্তি মিলছে পাপীদের। শেষ দশকে রয়েছে মহিমান্বিত কদরের রাত। যে রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এ মাস পেয়েও যারা নিজেদের পাপ মোচন করাতে ব্যর্থ হবে তারা হবে প্রকৃতপক্ষেই কপাল পোড়া!
সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনেকেই পানাহার থেকে বিরত থাকেন সত্য; এটাকে উপবাস বলে তাও সত্য; কিন্তু এটাকে সর্বক্ষেত্রে সিয়াম বা রোজা বলে না। রোজাদার গালিবাজ হয় না। রোজাদার ফাঁকিবাজ হয় না। রোজাদার কালোবাজারি, চোরাকারবারি, অবৈধ মজুদদার হয় না। সারা দিন চাঁদাবাজি করে সন্ধ্যার ইফতারে খাঁটি ইমানদারির কোনো অর্থ হয় না। অফিসে দুর্নীতি করে মসজিদে এসে যতই নীতিবান হোন সিয়াম-কিয়াম দুটোই গোল্লায় যাবে। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘রোজা ফরজ করা হয়েছে যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। মানে আমার ভয়ে অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে পারো।’ -সুরা বাকারা ১৮৩
মহান আল্লাহর ভয় অন্তরে থাকলে ওজনে কম দেওয়া যায় না। পণ্যে ভেজাল মেশানো যায় না। দুধে পানি দেওয়া যায় না। নকল জিনিস আসল বলে বিক্রি যায় না। এসবই তাকওয়ার পরিপন্থী কাজ। দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য রোজা আছে। রোজা রেখে মিথ্যা বলা কিংবা গিবত করা কেবলই উপবাস থাকার নামান্তর। চোখ-কানের হেফাজত একান্তই জরুরি। অন্যথায় রোজার পুণ্য মেলবে না। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা, সে অনুসারে কাজ করা এবং মূর্খতা (অজ্ঞানের মতো আচরণ করা) পরিহার না করে, আল্লাহর কাছে তার পানাহার বর্জনের কোনো মূল্য নেই।’ -সহিহ বুখারি ৬০৫৭
রমজান সংযমের মাস, সহমর্মিতার মাস এবং পাপ ছেড়ে কল্যাণে ব্রতী হওয়ার মাস। কিন্তু এ মাসকে যদি অর্থ উপার্জনের মোক্ষম সময় মনে করে মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া হয়, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সংযম হয় কী করে! কারও থেকে দুই টাকা কম না রেখে দশ টাকা হাতিয়ে নিলে সহমর্মিতা হয় কীভাবে! অবৈধ উপার্জন করে দেদার দান করলে লাভটা কী! ঈদ উপলক্ষে মানুষ বেশি কেনাকাটা করে। নতুন জামা-কাপড় ছাড়া রাস্তার ভিক্ষুকও ঈদ করে না। পায়েস-পোলাও সামান্য হলেও খায়। সবার ঘরে কিছু না কিছু বাজার-সওদা যায়। সে সব হিসাব-নিকাশ করে লাভটা একটু কম করে রোজাদারদের স্বস্তি দেওয়া যায়। কিন্তু দেশের বাজার চলছে উল্টো দিকে। ব্যবসায়ী সমাজ যেন লাগামছাড়া ঘোড়া। দোকান থেকে সন্তুষ্ট হয়ে ফিরতে পারছে না কেউ। দোকানি হয়তো আচরণ খারাপ করেছে অথবা দাম খুব বেশি রেখেছে কিংবা নকল জিনিস দিয়েছে। এসব রোজাদারের কাজ নয়! ‘যারা মানুষের সঙ্গে ধোঁকাবাজির ব্যবসা করে তারা ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উম্মত হিসেবেই স্বীকৃতি দেননি।’ -(সহিহ মুসলিম)
একজন প্রকৃত রোজাদার হবে পরহেজগার, সৎ ও ন্যায়-নিষ্ঠায় উপমাতুল্য। তার থেকে নিরাপদ থাকবে সহকারী, সহযোগী, অধীনস্ত, প্রতিবেশীসহ সব মানুষ। রোজাদার কথা, কাজ কিংবা আচরণে কাউকে কষ্ট দেবে না। কারও প্রতি কোনো প্রকারের জুলুম করবে না। তবেই তার রোজা হবে সঠিক। এতে রোজাদার হবে সার্থক। এমন রোজাই পরকালে উপকারে আসবে। আর সেই রোজাদারই কোরআন-হাদিসে বর্ণিত পুরস্কারের যোগ্য হবে। আল্লাহতায়ালা আমাদের সেভাবে রোজা রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।