ঈদযাত্রার টিকিট বিক্রির শেষ দিনে গতকাল শনিবার টিকিটের ব্যাপক চাহিদা দেখা গেছে। এদিন সকাল ৮টা থেকে ৯ এপ্রিল ভ্রমণের জন্য পশ্চিমাঞ্চলগামী (খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর) ট্রেনের টিকিট বিক্রি হয়। বিক্রির শুরুর প্রথম আধঘণ্টায় টিকিট কাটতে অনলাইনে ১ কোটি ২৩ লাখবার চেষ্টা (হিট) করেছে মানুষ।
ওই অঞ্চলের জন্য ওইদিন রেলের নির্ধারিত ১৪ হাজার ৭৭০টি টিকিটের মধ্যে সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ অন্তত ১৪ হাজার টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এর মধ্যে কোনো কোনো ট্রেনের প্রায় সব টিকিট শেষ হয়ে যায় মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে। ওয়েবসাইটে অনেক ট্রেনে টিকিট আছে এমন দেখানোর পরও কাটতে গেলে তা বিক্রি দেখিয়েছে বলে একাধিক যাত্রীর অভিযোগ।
সকালে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে বেশিরভাগ টিকিট বিক্রি হয়ে গেলেও বিকেল সোয়া ৪টার দিকে কালোবাজারে ট্রেনের একাধিক টিকিট থাকার সত্যতা পাওয়া যায়।
দিনাজপুরের ফুলবাড়িয়ার রাজু নামের এক টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে গতকাল ফোনে যোগাযোগ করা হয় টিকিটের জন্য। তার কাছে পঞ্চগড় এবং চুয়াডাঙ্গার ছয়টি টিকিট চাইলে তিনি বলেন একটু অপেক্ষা করেন, ‘খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি। পাঁচ মিনিট পর তিনি জানালেন, দিনাজপুরের বিরামপুর পর্যন্ত টিকিট হবে। ওই পর্যন্ত টিকিট থাকলেই বাকি পথ যেতে কোনো সমস্যা হবে না।
চারটি টিকিটের দাম পড়বে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। অথচ ঢাকা থেকে বিরামপুর পর্যন্ত রেলওয়ের শোভন চেয়ারে নির্ধারিত ভাড়া ১ হাজার ৬৬০ টাকা।’
তার কাছে চুয়াডাঙ্গাগামী ট্রেনের দুটি টিকিট চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই রুটেও দেওয়া যাবে। আগে বিরামপুরেরটা চূড়ান্ত করেন। তারপরও চুয়াডাঙ্গার টিকিট পাবেন।’
গত শুক্রবার দিনাজপুরগামী ট্রেনে সকাল ৮টা থেকে ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরুর পর সর্বোচ্চ ৫ সেকেন্ডের মধ্যে একাধিক ফোন থেকে চেষ্টা করেও টিকিট না পেয়ে ওই রাজুর কাছ থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে দুটি টিকিট সংগ্রহ করেন বাবু নামের এক যাত্রী। দুটি টিকিটের দাম ১ হাজার ৬০০ টাকা হলেও কালোবাজারে এর দাম দিতে হয়েছে ৩ হাজার টাকা। বাবু ৬ এপ্রিলের টিকিট সংগ্রহ করেছেন গত শুক্রবার। নিয়ম অনুযায়ী এটি বিক্রি শেষ হয়েছে গত বুধবার।
যাত্রী পরিচয় দিয়ে শুক্রবার কালোবাজারি রাজুর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে ঢাকা থেকে দিনাজপুরের ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত ৭ এপ্রিলের চারটি ও ৮ এপ্রিলের তিনটি ট্রেনের টিকিট চাইলে তিনি বলেন, ‘একটু অপেক্ষা করেন, খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি।’ ১৫ মিনিটের মধ্যে রাজু ফোন করে আশ্বস্ত করলেন যে দেওয়া যাবে।
ঢাকা থেকে ফুলবাড়ী পর্যন্ত আন্তঃনগর ট্রেনের শোভন চেয়ারে প্রকৃত ভাড়া ৪২৫ টাকা হিসাবে ৭টি টিকিটের ভাড়া ২ হাজার ৯৭৫ টাকা। কিন্তু রাজু চাইলে ৭ হাজার টাকা।
অথচ রেলওয়ের সময়সূচি অনুযায়ী, ৭ এপ্রিলের টিকিট বিক্রি শেষ হয়েছে গত বৃহস্পতিবার আর ৮ এপ্রিলের টিকিট বিক্রি হয়েছে শুক্রবার সকালে।
জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পশ্চিম) অসীম কুমার তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিকিট বিক্রি শেষ হওয়ার পরও তা আরেকজনের নামে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে অন্য কারও নামে আগে থেকে কেটে রাখা টিকিট বিক্রি করতে পারে।
‘আমি নিজেও আমার পরিবারের জন্য আজ (গতকাল শনিবার) সকালে টিকিট কাটতে গিয়ে পারিনি। আসলে দু-তিন মিনিটের মধ্যেই বেশিরভাগ টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। আমার মোবাইল দিয়ে ওয়েবসাইটে ঢুকতে গেলে ধীরগতির ইন্টারনেটের কারণে সময় লাগে। কিন্তু কালোবাজারিরা দ্রুত গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার করে একাধিক আইডি দিয়ে বিভিন্নভাবে কিছু টিকিট বিভিন্ন নামে কেটে রাখে। সেগুলোই পরে বিক্রি করে। তবে যিনি এভাবে টিকিট নেবেন তিনি ভ্রমণের সময় ঝামেলায় পড়তে পারেন। কারণ একজনের নামের টিকিট দিয়ে আরেকজনের ভ্রমণ করার সুযোগ নেই।’
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার কারণে এবার টিকিট নিয়ে কালোবাজারি অনেক কমেছে। কিন্তু তারপরও নানা কৌশলে টিকিট নিয়ে কারসাজি করছে।
এদিকে দুপুর ২টা থেকে রেলের পূর্বাঞ্চলের (ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) টিকিট বিক্রি শুরু হয়। এ অঞ্চলের জন্য ১৬ হাজার ৬৯৬টি টিকিট বিক্রির জন্য বরাদ্দ ছিল। এর মধ্য দিয়ে ঈদযাত্রায় ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি শেষ হয়েছে। আগামী ৩ এপ্রিল থেকে ঈদের ফিরতি যাত্রার টিকিট ইস্যু করা হবে, যা চলবে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। যাত্রীদের অনলাইনে এই টিকিট কিনতে হচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে সারা দেশের বিভিন্ন রুটে আট জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হবে বলে রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
কালোবাজারি বন্ধে গত বছর ১ মার্চ থেকে অনলাইনে ও অফলাইনে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষে এবারই প্রথম মোবাইলে ওটিপি (ওয়ানটাইম পাসওয়ার্ড) সিস্টেম চালু করা হয়েছে। এর ফলে একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে সর্বোচ্চ চারটি টিকিট সংগ্রহ করা যাবে।
অনলাইনে রেলের টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজ ডট কম ও রেলওয়ের অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
এবার ঈদযাত্রার টিকিট বিক্রি শুরুর আগে রেলওয়ের কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন ওটিপি পাঠানোর এ পদ্ধতি নতুন চালু হওয়ায় টিকিট নিয়ে কারসাজি অনেকটা কমবে। কিন্তু বাস্তবে তা কমেনি।
যাত্রীদের অভিযোগ, টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পর মুহূর্তেই টিকিট শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার অনলাইনে আসন ফাঁকা দেখালেও টিকিট কিনতে গেলে সেটি বিক্রি দেখাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সহজডটকমের প্রযুক্তিগত জালিয়াতির পাশাপাশি নানা কৌশলে কালোবাজারি চক্র বিভিন্ন রুটের টিকিট আগে থেকেই সংগ্রহ করে রাখছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
ঈদযাত্রার টিকিট বিক্রি শুরুর আগে রেলপথমন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন ‘টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যাদের সঙ্গে সহজের এবং রেলের লোক জড়িত। ইতিমধ্যে আমরা একাধিক সিন্ডিকেটকে ধরে আইনের আওতায় এনেছি। ঠিকমতো টিকেটিং ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য সহজকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ’
দেশব্যাপী ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে সম্প্রতি সহজডটকমের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সহজডটকম এবং রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিন পর ছাড়া পেয়ে এদের অনেকেই আবার টিকিট কারসাজিতে জড়িয়ে পড়েন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
টিকিট কালোবাজারির পাশাপাশি জাল টিকিট বিক্রিরও প্রমাণ মিলছে সাম্প্রতিক সময়ে। কম্পিউটারের দোকান থেকে অনলাইনে টিকিট কাটার পর পিডিএফ কপি রেখে দেওয়া হয়। এ কপি এডিট (সম্পাদনা) করে নতুন আসন বসানো হয়। এমনকি কাউন্টার থেকে কাটা টিকিট স্ক্যান করে সম্পাদনার মাধ্যমে ইচ্ছেমতো আসনও বসানো হয়। এভাবেই ট্রেনের জাল টিকিট বিক্রির ডিজিটাল অপরাধী চক্র এখন সক্রিয়। এতে সাধারণ যাত্রীরা প্রতারণার শিকার হওয়ার পাশাপাশি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের আর্থিক জরিমানা ও কারাদণ্ডের মুখোমুখি হন।