দেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রুমা উপজেলায় মঙ্গলবার রাতে সোনালী ব্যাংকে ডাকাতির পর থানচি উপজেলায় দুটি ব্যাংকে হানা দিয়ে টাকা ও অস্ত্র লুট করেছে সশস্ত্র ব্যক্তিরা। সেই সঙ্গে অপহরণ করা হয়েছিল রুমা উপজেলা সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজারকে।
ঘটনার পর সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান থানচির দুটি ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে (কেএনএফ) দায়ী করেন। তবে এখন পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন কারও নাম না নিয়ে বেশ কৌশলী শব্দ চয়ন করছে। সোনালী ব্যাংকে ডাকাতির সময় পুলিশ ও আনসার বাহিনীর ১৪টি অস্ত্র লুট করেছে হামলাকারীরা। তিনটি ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে মাত্র ১৬ ঘণ্টার ব্যবধানে। সার্বিক পরিস্থিতি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসী ও বাঙালি জনগোষ্ঠী, উভয়ের মধ্যে আতঙ্ক ও ভয় বিরাজ করছে। পর্যটন ব্যবসায় এক ধরনের ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে বান্দরবান পর্যটক পাবে না বলে আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই নিরাপত্তা ইস্যু সাময়িক বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভারতের মণিপুরের পরিস্থিতি ও মিয়ানমারের আরাকানের পরিস্থিতি সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফলে সার্বিকভাবে সংকটের চটজলদি সমাধানও আশাতীত। পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমার অংশের সীমান্তে ঘন জঙ্গল অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। ফলে কেএনএফকে নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকটি অভিযানে নির্মূল করা যাবে, ব্যাপারটা তাও না।
কুকি-চিন বা কেএনএফ আসলে কারা!
বাংলাদেশ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হিসেবে মনে করে। তবে কেএনএফ তাদের অনলাইন প্ল্যাটফরমে দাবি করেছে, তারা বাংলাদেশের কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন নয়। তারা বলছে, তারা ‘সুবিধা বঞ্চিত কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর জন্য সশাসিত বা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতাসহ একটি ছোট রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি করছে, স্বাধীনতার ঘোষণা তারা দেয়নি।’
ইতিমধ্যে কেএনএফ তাদের তিনটি দাবির কথা জোরালোভাবে বলছে। রুমা, থানচি, রোয়াংছড়িসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়টি উপজেলা নিয়ে ‘স্বায়ত্তশাসিত’ অঞ্চল গঠন। ওই এলাকায় কুকি-চিনের নেতৃত্বে পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল এবং ভারত ও মিয়ানমারে চলে যাওয়া কুকি-চিন জনগোষ্ঠীকে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা। এসব দাবি উঠার সঙ্গে সঙ্গে কেএনএফকে নির্মূল করার জন্য দেশের নিরাপত্তা বাহিনী জোরালো অভিযান শুরু করে। পরবর্তী সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ও স্থানীয়দের নিয়ে একটি শান্তি কমিটি করা হয়। সে শান্তি কমিটির মাধ্যমে কেএনএফের শান্তি আলোচনা চলমান রয়েছে। এমনকি শান্তি কমিটির সঙ্গে কেএনএফের পরবর্তী বৈঠক ২২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে পরপর ব্যাংকে ডাকাতি, অপহরণ, বাজারে গোলাগুলি নানা প্রশ্ন তৈরি করছে। প্রশ্ন উঠছে, কেএনএফ কি ফান্ড সংকট কাটানোর জন্য ব্যাংক ডাকাতির পথ বেছে নিল! এটা একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু এমন না যে, তাদের ফান্ড সংগ্রহের অন্য কোনো পথ নেই। কেএনএফ শুধু টাকার জন্য ব্যাংক ডাকাতি করেনি বলে মনে হয়। কারণ তারা দুটি ব্যাংকের তিনটি ব্রাঞ্চ ডাকাতি করে ১৪ লাখের মাত্র কিছু বেশি অর্থ হাতিয়ে নিতে পেরেছে।
তাহলে কি অস্ত্র লুটই উদ্দেশ্য ছিল! পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তে এখন মিয়ানমার পরিস্থিতির কারণে বিচ্ছিন্নবাদীরা অস্ত্র সংকটে আছে সেটা সত্য না। এমনকি ডাকাতি এবং অস্ত্র লুটের পরও থানচি থানায় পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে পুরো ঘটনাকে কয়েকভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমত এটা হতে পারে কেএনএফ শান্তি আলোচনায় আরও দর কষাকষির জন্য তাদের শক্তির জানান দিতে চেয়েছে। কেএনএফ মূলত এটা দেখাতে চাচ্ছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তিশালী অবস্থানকে তারা চ্যালেঞ্জ করে দিতে পারে।
ধারণা করা হয়, দেশের সীমান্তের বাইরে তারা একটা শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে। কেএনএফের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে পোস্ট করা ভিডিওগুলোতে যেসব সামরিক ট্রেনিংসহ কার্যক্রম দেখানো হয়, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরের কোনো ছবি বা ভিডিও নয় বলেই মনে করছে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বরত সামরিক গোয়েন্দারা মনে করেন, নাথান বম বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে অবস্থান করেন। কর্মকর্তাদের ধারণা, ভারতের মিজোরামে নাথান বম-এর অবস্থান রয়েছে। ফলে ঘটনাকে শুধু ইন্টারনাল ফ্যাক্টর বা অভ্যন্তরীণ ইস্যু দিয়ে বিবেচনা করা যাবে না। মিয়ানমার সরকারের কাছে আরাকান আর্মির দাবির কাছে কেএনএফের দাবির কিছুটা মিল আছে। দুটি সংগঠনই স্বায়ত্তশাসনের দাবি করছে এবং স্বাধীনতার দাবি অস্বীকার করছে। সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মির সফলতা ও মিয়ানমার সীমান্তে অস্ত্রের সহজলভ্যতা কেএনএফকে উৎসাহিত করতে পারে।
আলোচনার জন্য তৈরি শান্তি কমিটির সদস্য স্থানীয় সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম বলছেন, আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার জন্য এই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলেই ধারণা। তিনি দাবি করছেন, শান্তি আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার জন্য অন্য কোনো মহলের ইন্ধন থাকতে পারে। এই ইন্ধন কারা দিচ্ছে! সেটা দেশ বা বিদেশ উভয় স্থান থেকেই হতে পারে। বিদেশ বললে শুধু যে কোনো রাষ্ট্র হতে হবে তা নয়। বিদেশে অবস্থানরত অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গ্রুপেরও ইন্ধন থাকতে পারে!
কী হতে পারে সামনে! সার্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর পদক্ষেপ দেখে মনে হয়, তারা ভেবেচিন্তেই এগোতে চায়। কেএনএফের যে ত্রাস সৃষ্টির উদ্দেশ্য সে ফাঁদে তারা পা দিতে চায় না। আলোচনার পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে জারি রাখার একটা সংবরণ আচরণ রয়েছে। এখন পর্যন্ত কেএনএফের সঙ্গে যেসব সশস্ত্র লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে, সেখানে পুলিশ ও বিজেবি লড়াই করছে। সেনাবাহিনী কোনো ধরনের লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বোঝাই যাচ্ছে, সরকার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া পর্যন্ত যেতে দিতে চায় না। এ ছাড়া জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশের বিবৃতি আসার পরিস্থিতিও তৈরি করতে চায় না। তবে যেভাবে সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার দ্রুততম সময়ের মধ্যে বড় কোনো আশঙ্কা ছাড়া মুক্ত হয়েছেন, সেটা একটা আশার আলো। বলা হচ্ছে, র্যাবের মধ্যস্থতায় তিনি মুক্ত হয়েছেন। যদিওবা বিস্তারিত জানানো হয়নি। তার মানে, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় বা কোনো না কোনো পর্যায়ে কুকি-চিনের যোগাযোগ হচ্ছে।
বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি খবরের সূত্র বলছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির ফেসবুক পেজে ক্যাপ্টেন ফ্লেমিং নাম দিয়ে একজন লিখেছেন, ‘সেনাবাহিনীর সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই এবং কেএনএফ সেনাবাহিনীকে সম্মান প্রদর্শনপূর্বক জানাতে চাই যে, কুকি জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে আপনাদের সহযোগিতার কথা আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। তবে আমাদের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সব নাগরিক সুবিধা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আপনাদের উদারতা দেখানোর আহ্বান জানাই।’
তার মানে কেএনএফের একটা দাবি, কুকি জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত বিষয়ে সরকার পক্ষ ইতিবাচক। বাকি বিষয়ে হয়তো একটা দরকষাকষি চলছে। কিন্তু কুকি-চিনকে খুব একটা হালকা করে নেওয়ার যেমন সুযোগ নেই, আবার বেশি সুযোগ দেওয়াও হবে বোকামি। কুকি-চিনের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফের বিরোধ রয়েছে। তবুও কুকি-চিনের বিশেষ অর্জন এসব সংগঠনকে উৎসাহিত করবে এবং চাপে ফেলবে। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের পরিস্থিতি কুকি-চিনকে উৎসাহিত করছে বলে দৃঢ় বিশ^াস রয়েছে। তবে একেবারে হালকা করে নেওয়ার সুযোগ নেই এই অর্থে, দমন-পীড়নের মাধ্যমে বান্দরবানের মতো গহিন বনজঙ্গলের এলাকার সশস্ত্র সংগঠনকে একেবারে নির্র্র্মূল করা সম্ভব না। বান্দরবানের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তের কারণে তারা যে কোনো সময় সীমান্ত পাড়ি দিতে পারে এবং সীমান্তের ওপার থেকে সহযোগিতা পেতে পারে। ফলে শুধু শক্তি প্রয়োগের পাল্টা জবাব না, আলোচনাও জারি রাখতে হবে। শুধু কেএনএফ নয়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মনের ভাষা বুঝতে হবে। দেশটা শুধু বাঙালির না, সবার। ফলে তারা দেশকে যেন নিজের মনে করে, তেমন পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি করাও জরুরি। সে পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীই কেএনএফকে প্রতিহত করতে এগিয়ে আসবে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট
shahadatju44@gmail.com