বহুতর্কে দিন বয়ে যায় /বিশ্বাসে ধন নিকটে পায়।/সিরাজ সাঁই ডেকে বলে লালনকে/কুতর্কের দোকান খুলিস নে আর।-লালন ফকির। লালনের এই অমর পঙ্্ক্তিগুলো শুধু আধ্যাত্মিক উপলব্ধির কথা বলে না, আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিও এক গভীর ইঙ্গিত বহন করে। ‘কুতর্ক’ শব্দটির অর্থই হলো এমন তর্ক, যার উদ্দেশ্য সত্য অনুসন্ধান নয়; বরং নিজের অবস্থান জোর করে প্রতিষ্ঠা করা, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা বা অন্যকে পরাজিত করা। তাই লালনের সতর্কবাণী আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেন, অহংকার থেকে জন্ম নেওয়া তর্ক মানুষকে সত্যের কাছাকাছি নয়, বরং আরও দূরে নিয়ে যায়। সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি তর্কে জয়ী হওয়ার চেয়ে সত্যকে উপলব্ধি করতে চান। আর সেই কারণেই কুতর্ক ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র তিন ক্ষেত্রেই অগ্রগতির অন্তরায়।
বর্তমান সময়ে আমরা দেশ নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসি। রাজনীতি, উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা সামাজিক সমস্যা সব বিষয়ে আমাদের মতামতের অভাব নেই। চায়ের আড্ডা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত সর্বত্র বিতর্কের ঝড় বইছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কথার ভিড়ে কাজ কোথায়? আমরা কি সত্যিই দেশ গঠনের পথে এগোচ্ছি, নাকি কুতর্কের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি? আমাদের অন্যতম বড় সংকট হলো দায়বদ্ধতার অভাব। আমরা পরিবর্তন চাই, কিন্তু নিজের জায়গা থেকে পরিবর্তনের দায়িত্ব নিতে চাই না। রাষ্ট্রকে দোষ দেওয়া সহজ, নেতৃত্বের সমালোচনা করা সহজ; অথচ নিজের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা করা কঠিন। ফলে সমস্যার সমাধানের চেয়ে সমস্যা নিয়ে তর্কই বেশি হয়। এই প্রবণতা সমাজে হতাশা বাড়ায় এবং উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করে। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়; রাষ্ট্র গড়ে ওঠে নাগরিকদের আচরণ, মূল্যবোধ এবং দায়িত্ববোধের সমষ্টিতে।
দেশ গঠন কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের একক দায়িত্ব নয়। এটি একটি সামষ্টিক প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্ব সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। একজন শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান করলে, একজন চিকিৎসক সততার সঙ্গে সেবা দিলে, একজন সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্বশীলভাবে কাজ করলে এবং একজন সাধারণ নাগরিক আইন মেনে চললে দেশ এগিয়ে যায়। কিন্তু যখন দায়িত্ববোধের জায়গায় গাফিলতি, অনিয়ম ও স্বার্থপরতা স্থান করে নেয়, তখন উন্নয়নের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের নাম নয়; এটি মানুষের চরিত্র, প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক আস্থারও উন্নয়ন।
দুর্নীতিও আমাদের অগ্রযাত্রার বড় বাধা। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু অনেক সময় নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙতে দ্বিধা করি না। ঘুষ দিয়ে কাজ করানো, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি সমাজকে ধীরে ধীরে নৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। দুর্নীতিকে শুধু আইনি নয়, সামাজিকভাবেও অগ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে। কারণ দুর্নীতি অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের ন্যায়বোধ ও আস্থাকেও ক্ষয় করে। যে সমাজে যোগ্যতার চেয়ে তদবির বেশি কার্যকর হয়, সেখানে মেধা নিরুৎসাহিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ক্ষতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। একইভাবে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব আমাদের সমাজে বিভাজন বাড়াচ্ছে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতভেদ স্বাভাবিক, কিন্তু ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখার প্রবণতা কখনোই সুস্থ সংস্কৃতির লক্ষণ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত যে বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা ও অসহিষ্ণুতা দেখা যায়, তা গঠনমূলক আলোচনার পথ সংকুচিত করে। ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি না থাকলে সৃজনশীল চিন্তার বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। দেশ গঠনের জন্য প্রয়োজন যুক্তিনির্ভর সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতার সংস্কৃতি।
দেশপ্রেম জাগানোর ক্ষেত্রেও, আমাদের নতুনভাবে ভাবতে হবে। দেশপ্রেম কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়। দেশপ্রেমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কাজে। দেশপ্রেমের বীজ রোপিত হয় পরিবারে। শিশু তার পরিবার থেকেই সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা শেখে। এরপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেই বোধকে আরও বিকশিত করে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে নাগরিক সচেতনতা, নৈতিকতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঠিক উপস্থাপন তরুণ প্রজন্মকে দেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করতে পারে। ইতিহাস জানা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করা।
আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ জনগোষ্ঠী। যদি আমরা তাদের শক্তি, উদ্ভাবনী চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারি তাহলে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। যে জাতি তার তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে, সেই জাতিই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। একই সঙ্গে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যখন মানুষ দেখে যে আইনের চোখে সবাই সমান, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা বাড়ে। পক্ষপাত, বৈষম্য ও অন্যায়ের সংস্কৃতি দেশপ্রেমকে দুর্বল করে আর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ দেশপ্রেমকে শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে দেশপ্রেমকে আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে, বাস্তব কর্মে রূপ দিতে হবে। পরিবর্তনের অপেক্ষায় না থেকে, প্রত্যেকে দায়িত্ব পালন শুরু করলেই পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হবে। দেশ গঠনের ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলো কখনো একদিনে আসেনি; এসেছে অসংখ্য মানুষের ছোট ছোট দায়িত্বশীল কাজের সমষ্টি থেকে। প্রশ্ন তাই একটাই, আমরা কি কুতর্কেই সময় নষ্ট করব, নাকি দেশ গঠনের কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করব? সিদ্ধান্ত আমাদের।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক