চীনা নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের সেই বিখ্যাত প্রবাদ অনুযায়ী, বিড়াল সাদা না কালো সেটি কোনো মুখ্য বিষয় নয়, মূল বিষয় হলো বিড়ালটি ঠিকমতো ইঁদুর ধরতে পারছে কিনা। তাত্ত্বিক বা বাহ্যিক বিষয়ের চেয়ে কাজের ফলাফলই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে বলা যায় বাজেট বড় না ছোট সেটা বড় কথা নয় , বাস্তবায়নই হলো মূল কথা।
জন মেইনার্ড কেইন্স নামে এক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে বলেছিলেন, একমাত্র সরকারি ব্যয়বৃদ্ধি গুণক ও লিঙ্কেজ সৃষ্টি করে ঝিমিয়ে পড়া বা বেওয়ারিশ একটা অর্থনীতিকে ষাঁড়ের মতো দৌড়াতে সাহায্য করতে পারে যাকে বলে ‘বুলিশ প্রবণতা’। সুতরাং, কেইন্সীয় অর্থনীতি বলে, অর্থনৈতিক মন্দার সময় সরকারি ব্যয়বৃদ্ধি একটা মোক্ষম দাওয়াই।
বস্তুত, সেই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, এমনকি বাংলাদেশেও সম্প্রসারণমূলক বাজেটের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল। তাতে বেশ সুফল ঘরে তুলে বাংলাদেশের তিলকে উন্নয়ন ধাঁধার তকমা জোটে। তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন কার্যকারণে এর মধ্যে করোনা তো আছেই তারপরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং সর্বশেষ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ব্যাপক পাল্টে যায়। এছাড়া ২০২৪-এর আগস্ট পরবর্তী অনিশ্চয়তা, সহিংসতা এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে অবস্থা সঙ্গীন হওয়ার প্রেক্ষাপটে একটা ক্রান্তিকালে নতুন সরকার জাতীয় সংসদে পেশ করেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আয় ও ব্যয়ের খতিয়ান জাতীয় বাজেট।
দুই. বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উচ্চ-মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা ও আর্থিক খাতের নাজুকতায় নমিত। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই সামষ্টিক অর্থনীতির যেসব সূচকে নজর দেওয়ার কথা ভেবেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম মূল্যস্ফীতি। এর সঙ্গে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়, ব্যাংক খাত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদেশি ঋণ, রাজস্ব আয় ইত্যাদি তো ছিলই। এছাড়া ক্ষমতায় এসে সরকার আরও আশ্বস্ত করেছিল, দুর্নীতির ক্ষেত্রে তাদের সহ্যসীমা শূন্য (জিরো টলারেন্স) অর্থাৎ কোনো ধরনের দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না। তবে মনে রাখতে হবে, মাত্র ৩-৪ মাস বয়সী একটি সরকারের কাছ থেকে সঠিক হিসাব দাবি করাও অনুচিত।
ব্যাপক এবং বিস্তৃত দুর্নীতি ও বিদেশে অবৈধ অর্থপাচার এবং অপেক্ষাকৃত কম রাজস্ব আয় অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরার মতো অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছে। অপরদিকে, নানান ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতির পারদ কিছুতেই যেন নিচে নামছে না বরং ১০ শতাংশের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি বশীভূত। বাংলাদেশ কেন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না সর্ষের ভেতর ভূতের জন্য না অন্য কারণে সে এক মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। এ সমস্ত সংকট সাপেক্ষে প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ বলছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার অন্তত ২০২৬-২০২৭ বছরে চার শতাংশের নিচে থাকবে। যদিও চলমান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া-না দেওয়া নিয়ে শঙ্কা এবং যুদ্ধের দামামার মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহকে ব্যাহত করে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্তর আরও বাড়িয়ে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
তিন. জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট করা হয়েছে চমকপ্রদ শিরোনামে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’।
প্রথমত, গণতান্ত্রিক অর্থনীতি দাবি করে প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহি, যার অভাব পরিলক্ষিত। মানবিক অর্থনীতি দাবি করে একটা বৈষম্যবিরোধী বিতরণব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি দাবি করে সব দলের এবং মতের মানুষের অংশগ্রহণ। মূলত এসব কটি উপাদান অনুপস্থিত বর্তমান বাংলাদেশে। তবে যেহেতু অভিযাত্রা, তাই সরকারকে অন্তত এক বছর সময় দিতে চাই। আপাতত বোধ করি এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে দেয় পরিস্থিতিতে সাড়ে ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে যে বিনিয়োগ নীতিমালা প্রয়োজন সেদিকে সুনজর দিতে হবে। দেশের বর্তমান ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থায় বিনিয়োগ পরিবেশে প্রভূত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। জ্বালানি সমস্যা সমাধানে জুতসই সমাধান হাতের কাছে নেই; বাজার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল, ব্যাংক দখলের অপচেষ্টা দৃশ্যমান। তবুও ভালোটা আশা করি। মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশের নিচে কীভাবে আসবে দেয় দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে তা স্পষ্ট নয়।
তবে এখন কৃচ্ছ্র সাধনের যথাযথ সময়। ‘রাজনৈতিক প্রকল্প’, অপচয়ের প্রকল্প বাদ দিন, মেগা প্রকল্প না হলেই নয় এমনটি নিন। সরকার যা রাজস্ব পায় তার প্রায় অর্ধেক নাকি খরচ হয় বেতনভাতায়। স্মল ইজ বিউটিফুল সরকারের আকার ছোট রাখুন, বিলাসিতা পরিহার করুন। টাকা বাঁচানো মানে টাকা আয় করা। সরকার কর্তৃক দেয় ভর্তুকির সিংহভাগ রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা চেটেপুটে খায় বলে অভিযোগ আছে। সুতরাং, পুরো ভর্তুকি প্রক্রিয়ার ফোকাসে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি যাতে করে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র এবং দুর্বল প্রবেশগম্যতা পায়। আমরা কি এ বিষয়ে নতুন কিছু শুনতে পাব?
অনেক পুরনো অপবাদ এই যে এতদঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম। বাংলাদেশে নাকি ৯৭ লাখ মানুষ কর প্রদানের যোগ্য অথচ বর্তমানে কর দেয় মাত্র ৯ লাখ; বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৫ হাজার ডলার এমন লোক এই দেশে প্রায় আড়াই কোটি। ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন মনে করেন, ‘এদের পর্যায়ক্রমে করের আওতায় আনা গেলে কর-জিডিপি অনুপাতের তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি সম্ভব। গবেষকরা বলছেন, কর জাল বিস্তৃত করে, আয়কর বাড়িয়ে পরোক্ষ করের চাপ কিছুটা হলেও লাঘব করা যায়। কয়েক দশক ধরে কর-সংস্কারের কথা, ব্যাংকিং খাত সংস্কারের কথা শুনে আসছি, অথচ এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি মন্থর কেন তা জানার অধিকার জনগণের আছে। কতগুলো মন্দ ব্যাংক ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? যেখানে গ্রাসামস ল’ কাজ করে অর্থাৎ মন্দটা বাজার থেকে বিতাড়িত করে ভালোটাকে?
চার. আগামী অর্থবছরের জন্য কৃষি খাতে ৬ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট বরাদ্দ ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা যা দেশে জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ। মনে রাখা প্রয়োজন, এখনো কৃষি হচ্ছে বাংলাদেশের প্রাণ। কৃষিকে অবজ্ঞা করে তথাকথিত শিল্পায়ন বা উন্নয়ন অভিযাত্রা হোঁচট খেতে পারে। তাই নতুন বাস্তবতা কিংবা প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও এর বাস্তবায়ন দরকার। অবাস্তব পরিকল্পনা নয়, দরকার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। কৃষি ঘিরে আমাদের সম্ভাবনার চিত্র যেমন উজ্জ্বল, তেমনি চ্যালেঞ্জও কম নয়।
এবারে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষা খাতের উন্নয়নে যে কোনো দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বিনিয়োগের সুপারিশ করে জাতিসংঘের শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। বাংলাদেশে শিক্ষায় বরাদ্দের হার সবসময় কম। গত এক দশকে প্রস্তাবিত অধিকাংশ বাজেটে জিডিপির ২ শতাংশের নিচে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মেনে এবার সরকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিডির দুই শতাংশে উন্নীত করেছে।
সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও সেবার সংকট কাটিয়ে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে একগুচ্ছ সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা এসেছে। এর সবই ইতিবাচক। তবে শঙ্কার জায়গা অন্যত্র। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি প্রতিটি ক্ষেত্রেই অতীতে অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। কোয়ান্টিটি বাড়ানোকে বাহবা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোয়ান্টিটির চেয়ে যে কোয়ালিটির উপযোগিতা বেশি, সেদিকে দৃষ্টিপাত করা হয়নি।
পাঁচ. এমনিতে জনগণ প্রকৃতি প্রদত্ত তাপপ্রবাহে নাকাল, তার মধ্যে আবার বাজার-সৃষ্ট তাপপ্রবাহে অবস্থা অনেকটাই নাজুক। আগামী বাজেটে প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা। কারণটি অজানা নয় কারও সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘খাদ্যনিরাপত্তা’-সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘খাবারের ক্রমবর্ধমান দাম দেশের ৭১ শতাংশ পরিবারের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছয়. ২৪ পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরে অর্থনীতির যে স্থবিরতা, বিনিয়োগে খরা, ব্যবসা-বাণিজ্যকে পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা সেখান থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতিতে গতি আনতে প্রয়োজন জোরালো পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে যথাযথ সুশাসন নিশ্চিত করে দুর্নীতি দূরীকরণ ও আর্থসামাজিক বৈষম্য হ্রাসে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার আছে বলে দেশের প্রতিটি মানুষ প্রত্যাশা করে। ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দ্রুত বর্ধনশীল দুর্নীতি ও বৈষম্যের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে এ যাবৎকালের সমস্ত অর্জন বিসর্জন দিতে হতে পারে। সেই লক্ষ্যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সাপেক্ষে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
পাদটীকা : একবার আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে মস্কো গেলেন। কী আলাপ হয়েছে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী প্রিমাকভ বললেন, তিনি আশা করেছিলেন মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় তার ব্রিফকেস ভর্তি করে ডলার নিয়ে এসেছেন; তিনি আসলে ব্রিফকেস ভর্তি করে নিয়ে এসেছেন শর্তের কাগজপত্র।
সেদিন আর নেই। এখন আইএমএফ যেখানেই যায়, ব্রিফকেস ভর্তি করে ডলার ও শর্ত দুটোই নিয়ে যায়। পরিস্থিতি বুঝে সবাই বদলাতে পারে, আমরা কেন পারব না? সবার সুমতি হোক।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সমাজ-বিশ্লেষক। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়