সাকার মাছ জলজ বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় হুমকি

সাকারফিশ বা সাকারমাউথ ক্যাটফিশ যা বৈজ্ঞানিকভাবে গুীড়পুঢ়ৎরহঁং ধংরধঃরপঁং নামে পরিচিত। এদের প্রধানত নদী-নালা, পুকুর বা খালের অগভীর জলে পাওয়া যায়। আদিনিবাস দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ। বিশেষত ব্রাজিলের অ্যামাজন অববাহিকায় প্রচুর পাওয়া যায়। সাধারণত সর্বভুক প্রজাতির এবং প্রাথমিকভাবে পোকামাকড়, শামুক, কৃমি, ক্রাস্টেসিয়ান এবং ছোট মাছের মতো ছোট জলজ অমেরুদ-ী প্রাণী খায়। এমনকি বিভিন্ন স্তরে আটকে থাকা শেওলাও চুষে খায়। সামগ্রিকভাবে, এটি সুবিধাবাদী স্কেভেঞ্জার এবং প্রয়োজনে এরা মৃত মাছও খেয়ে থাকে।

সাকারফিশ মূলত অ্যাকুরিয়ামে চাষের জন্য বা অ্যাকুরিয়ামের ময়লা পরিষ্কার করার জন্য বিদেশ থেকে আমাদের দেশ আনা হয়েছে। ধারণা করা হয়, অ্যাকুরিয়াম থেকে গুলশান লেক হয়ে এটি দেশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি নদ-নদী, পুকুর ও হাওরে এই মাছটি ব্যাপকহারে দেখা যাচ্ছে যা দেশীয় জীববৈচিত্র্য ও জলাশয়ের জন্য হুমকিস্বরূপ। ইতিমধ্যে এই মাছের কারণে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছে মিয়ানমার ও আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ। সাকারফিশের ক্ষতিকর প্রভাবে ভারত, মিয়ানমারসহ আরও অনেক দেশের মৎস্যচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সাকারফিশের দ্রুত বংশবৃদ্ধির কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছের সঙ্গে খাদ্য ও বাসস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা করে এবং দেশীয় প্রজাতির মাছের ডিম ও রেণু খেয়ে বংশবিস্তারে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এছাড়া দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছসহ জলজ পোকামাকড়, শ্যাওলা, ছোট শামুকজাতীয় প্রাণী খেয়ে পরিবেশের সহনশীল খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট করে। জলাশয় পাড়ের ক্ষেত্রবিশেষ ৫ ফুট পর্যন্ত গর্ত করে পাড়ের ক্ষতি করে এবং জলাশয়ের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা কমায়। এ মাছের পাখনা খুব ধারালো। পাখনার আঘাতে সহজেই অন্য মাছের দেহে ক্ষত হয় এবং পরে পচন ধরে মারা যায়। মাছটি অত্যন্ত দূষিত পানিতেও অনায়াসেই কম অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এবং পানি ছাড়াও ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ এ মাছ না খাওয়ায় তারা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এবং যেকোনো পরিবেশে টিকে থাকে। এটির বৃদ্ধি ঠেকাতে না পারলে দেশীয় মাছ হুমকির মুখে পড়বে।

দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে এই মাছের উপস্থিতি উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হালদা নদীতে আট ইঞ্চি দৈর্ঘ্যরে সাকার মাছও পাওয়া গেছে। দেশীয় মাছ টিকতে না পারলে হালদায় ডিম উৎপাদন হবে না এবং মৎস সম্পদ বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা এবং তুরাগে জেলেরা জাল ফেললে সাকার মাছে জাল ভরে ওঠে, অথচ অন্য কোনো মাছ পাওয়া যায় না। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা প্রভৃতি নদীর মোহনায় প্রতিনিয়ত এ মাছগুলো ব্যাপকহারে দৃষ্টিগোচর হয়। এটি জলাশয়ে বেশি থাকলে প্রাকৃতিক খাদ্য দ্রুত কমে যাবে ও দেশীয় মাছের উৎপাদন ব্যাহত হবে।

সাকার মাছের কিছু ভালো দিকের মধ্যে রয়েছে, এটি অন্যান্য মাছের আবর্জনা ও শ্যাওলা খেয়ে অ্যাকুয়ারিয়ামের পরিবেশ ভালো রাখে। এই মাছের শুঁটকিতে ২৫-২৮ ভাগ আমিষ রয়েছে, যা থেকে খুবই উন্নতমানের মাছের খাবার তৈরি করা সম্ভব। ভালো পানি থেকে মাছটির নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে তাতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি অর্থাৎ মাছটি খাওয়াও যাবে। মেক্সিকোতে সাকার মাছ প্রক্রিয়াজাত করে মানুষের খাবার হিসেবে যেমন বাজারজাত করে, তেমনি শুঁটকি করে ইউরোপ-আমেরিকায় প্রাণী খাদ্য হিসেবে রপ্তানি করে যা আমরাও করতে পারি। এছাড়া এগুলো দিয়ে উচ্চ ক্ষমতার জৈব সার ও বায়োডিজেল তৈরিসহ বিভিন্ন কাজে লাগানো যায়।

মৎস্য আইন ২০১১ অনুযায়ী দেশে এ ধরনের বিদেশি মাছ চাষ দ-নীয় অপরাধ এবং দেশীয় প্রজাতির মাছের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ক্ষতিকর সাকার মাছ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে গত ১১ জানুয়ারি ২০২৩ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ সাকার মাছ নিষিদ্ধ করতে প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ অ্যাক্ট, ১৯৫০’র ১৮ নম্বর ধারা সংশোধন প্রস্তাব প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কেউ সাকার মাছ আমদানি, প্রজনন, চাষ, পরিবহন, বিক্রি, গ্রহণ বা প্রদান, বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও মালিক হতে পারবে না। বিদেশি কোনো মাছ, প্রাণী বা গাছ যা কিছুই এদেশে আনা হোক না কেন তার একটা নীতিমালা ও কোয়ারেন্টিনের বিধান থাকা দরকার। আগেই দেখা দরকার ওই মাছ বা প্রাণী আমাদের পরিবেশের উপযোগী কি না। এখন জলাশয় একেবারে শুকিয়ে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই, যেটা বড় জলাশয়ের ক্ষেত্রে একেবারেই অসম্ভব। মৎস্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যেই নির্দেশনা দিয়েছে যে, এ মাছ যাতে কোনোভাবেই উন্মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয়ে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে মনিটরিং করা হোক এবং অধিদপ্তর এ মাছটি চাষ ও উন্মুক্ত জলাশয়ে পাওয়া গেলে তা নষ্ট করার নির্দেশনাও দিয়েছে। তাই সবাইকে সচেতন করতে হবে, যেন কোথাও মাছটি পাওয়া গেলেই সঙ্গে সঙ্গেই সেটি ধ্বংস করা হয়। শুরুতেই শনাক্তকরণ, কোনো জলাশয়ে না ছাড়া, মাছগুলোকে প্রাণীখাদ্য হিসেবে কাজে লাগানো এবং জনসচেতনতার মতো সক্রিয় পদক্ষেপ এই আক্রমণাত্মক প্রজাতির মাছের বিস্তার রোধ করতে পারে।

লেখক : চেয়ারম্যান, একোয়াকালচার বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

mir.ali0077@gmail.com