শ্রমজোঁক

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় শ্রেণিবৈষম্য প্রবল। বাজারব্যবস্থার মাধ্যমে এই শ্রেণিবৈষম্য নানাভাবে টিকিয়ে রাখা হয়। যদিও মিশ্র অর্থনীতির রাষ্ট্রে অনেক সময় সরকার নানাভাবে সমন্বয়ের চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের দেশে কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী মুনাফার লোভে, শ্রমঘণ্টা বিচার না করেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করে। শ্রমিকের প্রতি বৈষম্যের নিকৃষ্ট উদাহরণ মজুরি বৈষম্য। এখানে আন্তর্জাতিক শ্রম আইন মেনে চলার কোনো বালাই নেই। বিশেষ করে, কর্মক্ষেত্রে নারীরা প্রতিদিন যে কর্মঘণ্টা ব্যয় করেন এবং যে অর্থ মজুরি হিসেবে পান তা রীতিমতো আন্তর্জাতিক বিচারে অবাক করার মতো। যে কারণে বিশ্ববাজারে আমাদের শ্রমবাজারের চাহিদা প্রবল। কোনো পণ্য প্রস্তুতের ক্ষেত্রে, শ্রমিকের শ্রমঘণ্টা এখানে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। দিনরাত পরিশ্রম করে একজন শ্রমিককে তার নির্দিষ্ট পাওনা বুঝে নিতে হয়। সেখানেও আবার নানা ধরনের টালবাহানা। একদিকে গুটিকয় শোষক আর অন্যদিকে লাখো শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রম।

আর কয়েক দিন পরই ঈদ। দিনরাত চলছে শেষ মুহূর্তের বেচাকেনা। বিক্রয়কর্মীদের ফুরসত নেই। সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত সময় পার করছেন বিক্রয়কর্মীরা। শুধু ঈদ নয়, সারা বছরের হিসাবেই কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সময় দিতে হয় বিক্রয়কর্মীদের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, পেশার দিক থেকে প্রতি সপ্তাহে বিক্রয়কর্মীদের কর্মঘণ্টা সর্বোচ্চ। কর্মক্ষেত্রে এ পেশার কর্মীদের সময় দিতে হয় সপ্তাহে গড়ে ৫৪ ঘণ্টা জানা গেল রবিবার প্রকাশিত দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে। ‘কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সময় দেন বিক্রয়কর্মীরা’ প্রতিবেদনে নারীশ্রমিকদের শ্রম শোষণের বাস্তব করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি চাকরি তথা আনুষ্ঠানিক খাতে নারী-পুরুষের বেতন  বৈষম্য অনেকটা কম হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতে বৈষম্য এখনো অনেক বেশি। গবেষক, নারী উদ্যোক্তা এবং সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, সর্বস্তরে আয় বৈষম্য নিরসন করা এখনো বাংলাদেশে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শ্রমশক্তির ৮৭ শতাংশেরই কর্মসংস্থান হয় অনানুষ্ঠানিক খাতে। যেখানে নারীর সংখ্যাই বেশি। শ্রম জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীদের ৯২ শতাংশের কর্মসংস্থান এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ বলছে, কর্মক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেন বিক্রয় ও সেবাকর্মী, কারখানা ও মেশিন চালনাকারী ও সংযোজনকারীরা। প্রতি সপ্তাহে এ কর্মীরা গড়ে ৫৪ ঘণ্টা সময় দেন। এক্ষেত্রে পুরুষ কর্মীদের গড় সময় দিতে হয় ৫২ ঘণ্টা, নারী কর্মীরা সময় দেন ৪২ ঘণ্টা। কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সপ্তাহে কাজের জাতীয় গড় ৪৭ ঘণ্টা। অঞ্চলভিত্তিক বিভাজনে পাওয়া যায়, পল্লীতে গড় কর্মঘণ্টা ৪৫ ঘণ্টা যা শহরে ৫০ ঘণ্টা। পুরুষদের জাতীয় গড় কর্মঘণ্টা (৫০ ঘণ্টা) মহিলাদের গড় কর্মঘণ্টা (৩৪ ঘণ্টা) থেকে বেশি। দেশের সিংহভাগ শ্রমিক নির্মাণ, গার্মেন্ট, পরিবহন, চাতাল, ওয়েল্ডিং, শিপব্রেকিংসহ অসংগঠিত সেক্টরে কাজ করেন। এসব কারখানা প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের যে মজুরি দেওয়া হয়, তা দিয়ে কোনোভাবেই পরিবার-পরিজনসহ জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব সেক্টরে মজুরি বৈষম্য বিরাজমান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, বাংলাদেশের শ্রমিকদের শ্রম দিতে হয় বেশি কিন্তু মজুরি কম। বিশেষ করে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টারও বেশি কাজ করতে হয় শ্রমিকদের। গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বাংলাদেশে সবচেয়ে কম। অর্থাৎ দেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি কম কিন্তু পরিশ্রম বেশি। বিবিএস বলছে, যে কোনো কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি আগের সপ্তাহের রেফারেন্স পিরিয়ড অনুযায়ী ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করলে তাকে কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত সময় কাজ হিসেবে ধরা হয়। সে হিসেবে বিক্রয়কর্মীরা শ্রম আইনের চেয়েও বেশি সময় দেন। কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত হয় অন্যভাবে।

শিল্প খাতের শ্রমিকদের ওভারটাইমসহ দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয়, যা বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বেশি। অথচ শ্রমিকরা যে হারে শ্রম দেন সে হারে মজুরি পান না। এই না পাওয়াই যেন আমাদের দেশে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, বিক্রয়কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে যে সময় দিচ্ছেন ‘ঘণ্টা’ হিসাবে তার আর্থিক মূল্য যত, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কত! এমন প্রশ্ন কে, কোন কর্তৃপক্ষকে করবে আমরা কি জানি? নাকি বিক্রয়কর্মী এবং শ্রমিকের রক্তচোষা হিসেবে ‘শ্রমজোঁক’ নামে নতুন প্রাণী সৃষ্টি হবে?