পবিত্র ঈদুল ফিতর আর বাংলা নববর্ষ মিলিয়ে এবার দীর্ঘ ছুটি ছিল সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের। ঈদের আনন্দের সঙ্গে নতুন বছর বরণের উৎসব যোগ করেছিল বাড়তি মাত্রা। এই বাড়তি আনন্দ ভাগাভাগি করতে অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটি কাটিয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। অনেকে আবার গেছেন বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় বেড়াতে। কেউ কেউ আবার বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরার আগে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও ঢু মেরে এসেছেন পাহাড় কিংবা সমুদ্রপাড়ের পর্যটন এলাকায়। তবে রুমা ও থানচি উপজেলায় সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) তৎপরায় বান্দরবানে পর্যটকদের আনাগোনা ছিল তুলনামূলক কম।
টানা উৎসবের এই পর্বে পর্যটন এলাকগুলোর অবস্থা কেমন ছিল দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যে তার বিস্তারিত :
উৎসবের শহর রাঙ্গামাটি : এবার ঈদ আর বর্ষবরণ পাশাপাশি হওয়ায় পুরো উৎসবের শহরে পরিণত হয় পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি। ঈদের আগে থেকেই উৎসবের আবহ শুরু হয় সেখানে। ঢাকা-চট্টগ্রামের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে ভিড় করতে শুরু করেন পর্যটকরা। তবে ঈদের পরে গত শুক্রবার ফুল ভাসিয়ে সেখানে শুরু হয় বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা। সেদিন আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে কাপ্তাই হ্রদের জলে ভাসল ফুল বিজুর ফুল। আর এই ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তিন দিনব্যাপী বর্ষবরণের মূল আনুষ্ঠানিকতা। পানিতে ফুল ভাসিয়ে নতুন বছরের জন্য শুভকামনা জানিয়ে গঙ্গা দেবীর কাছে প্রার্থনা করা হয়। শুক্রবার চাকমা জনগোষ্ঠীর ‘ফুল বিজু, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ‘হাঁড়িবসু আর মারমা সম্প্রদায়ের সূচিকাজ। ঠিক ফুল বিজু নামে অভিহিত না হলেও এদিন প্রায় সব পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীই পানিতে ফুল ভাসানোর আনুষ্ঠানিকতা পালন করে।
উৎসবের প্রথম দিনে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমারা বন থেকে ফুল আর নিমপাতা সংগ্রহ করে এবং কলাপাতা করে পবিত্র এই ফুল ভাসিয়ে দেয় পানিতে, তাই একে বলা হয় ফুল বিজু। পানিতে ফুল ভাসিয়ে নিজ পরিবার এবং দেশ তথা সমগ্র জীবের মুক্তির জন্য গঙ্গা দেবীর কাছে প্রার্থনা করা হয়। পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের দুঃখ-বেদনা যেন ভাসিয়ে দিয়ে নতুন দিনের সম্ভাবনার আলো জ্বালায় পাহাড়ের বাসিন্দারা। পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো দিনের বেদনা ভুলে নতুন দিনের প্রত্যয়ের কথা জানায় ফুল ভাসাতে আসা পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা বর্ষকে বিদায় ও নতুন বছর স্বাগত জানানোর অনুষ্ঠান তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচিত। এই উৎসব চাকমা জনগোষ্ঠী বিজু নামে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসুক, মারমারা মা সাংগ্রাই, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী বিষু, কোনো কোনো জনগোষ্ঠী বিহু নামে পালন করে থাকে।
মৈত্রী বর্ষণে সিক্ত বান্দরবান : বান্দরবানে শুরু হয়েছে মারমাদের সাংগ্রাই উৎসব বা রিলংপোয়ে; যা অন্য ভাষাভাষীর মানুষের কাছে মৈত্রী বর্ষণ, জলকেলি উৎসব বা ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল বলে পরিচিত। বর্ষবরণের উৎসবের প্রথম দিনকে সাংগ্রাই আকনিয়াহ, দ্বিতীয় দিনকে সাংগ্রাই আক্রাইনিহ ও শেষ দিনকে লাছাইংতার বলে মারমারা। পানিকে পবিত্রতার প্রতীক মেনে তরুণ-তরুণীরা জল ছিটাছে একে অপরের গায়ে। গতকাল সোমবার বিকেলে বান্দরবানের স্থানীয় রাজার মাঠে ফিতা কেটে এই উৎসবের উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বীর বাহাদুর উশৈসিং। উপস্থিত ছিলেন পৌর মেয়র মো. শামসুল ইসলাম।
শুধু তরুণ-তরুণীরা আর যুবক-যুবতীরাই নয়, এই উৎসবে মেতে ওঠে সব বয়সের মানুষ। হাজার হাজার দর্শক এই উৎসবে ভিড় জমান। দেশি-বিদেশি পর্যটকের সমাগম মেলে এই উৎসবের। উৎসবে ঘুরতে আসা পর্যটক আবছার হোসেন বলেন, ‘ঢাকা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে এসেছি। আগে কখনো আসা হয়নি। দলবদ্ধ হয়ে একজন অপরজনকে পানি ছিটাচ্ছে। অনেক ভালো লাগছে। আমার গায়েও পানি দিয়েছে।’
পাহাড়ে আনন্দ শুধু জলকেলিতেই সীমাবদ্ধ নয়, আনন্দের মাত্রাকে আরেকটু বাড়িয়ে দিতে উৎসব উদযাপন কমিটি দুই দিনব্যাপী আয়োজন করেছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিকেলে মারমারা নিজস্ব ভাষায় গান করে পুরো অনুষ্ঠানস্থলকে মাতিয়ে তোলে। এদিকে অনুষ্ঠানস্থলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মোতায়েন আছে পুলিশ।
সিলেটে পর্যটকের ঢল : ঈদ ও নববর্ষের ছুটিতে সিলেটে এবার পর্যটকের ঢল নেমেছিল। টানা ছয় দিনের ছুটিতে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো মুখর ছিল। নগরের হোটেল-মোটেল ও রেস্টুরেন্টে ছিল উপচেপড়া ভিড়। এবার সবচেয়ে বেশি ভ্রমণপিপাসুদের সমাগম হয়েছিল সিলেটের গোয়াইনঘাটের জাফলং ও কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথরে। জাফলংয়ে পর্যটন ব্যবসায় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঈদ মৌসুমে জাফলংয়ে লাখ লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছিল। এ ছাড়া সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরাণ (র.) মাজার, গোলাপগঞ্জে শ্রী চৈতন্যের লীলাভূমি দর্শন করেন অনেকে। খাদিমনগর উদ্যান, ইকোপার্ক, হাকালুকি হাওর, মৌলভীবাজারের মাধবকু-, শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া উদ্যান, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক, বিছনাকান্দি, রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট, পানতুমাই ঝরনা, লালাখাল ও সিলেটের বিভিন্ন চা-বাগানে গত বৃহস্পতিবার থেকেই পর্যটকদের ঢল নেমেছিল। সিলেট নগরে থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে সাদাপাথর। সাদাপাথরে নদীর শীতল জল আর পাশেই দিগন্ত বিস্তৃত মেঘালয় পাহাড়। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে সারা বছরই পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। ঈদ মৌসুমে পর্যটক সমাগম আরও বেড়েছিল। গত শুক্রবার সাদাপাথরে দেখা যায়, পর্যটকদের কারণে নদীতে পা ফেলার অবস্থা নেই। ভিড়ের কারণে অনেকে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নামতে পারছিলেন না পানিতে। এদিকে জাফলংয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে মেঘ-পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন দর্শনার্থীরা। জাফলংয়ে সকাল থেকেই দল বেঁধে পর্যটকেরা ঘুরেছেন। নদীতে নেমে কেউ কেউ গোসল করতে ব্যস্ত ছিলেন। আর নৌকা পার হয়ে মায়াবী ঝরনা, খাসিয়া পল্লী ও চা-বাগানে ঘুরেছেন।
সাদাপাথর বেড়াতে আসা রুহি বেগম বলেন, এই পরিবেশ অপরূপ। যে কেউ এলে মন ভালো হয়ে যাবে।
জাফলং পর্যটন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হোসেন মিয়া বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে জাফলংয়ে অনেক পর্যটক বেড়াতে আসেন। ব্যবসায়ীদের বেচাকেনাও ভালো হয়। এখানকার কোনো হোটেল-রিসোর্টেই কক্ষ খালি ছিল না।
ট্যুরিস্ট পুলিশ সিলেট রিজিয়নের পরিদর্শক আখতার হোসেন বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ ও সাদাপোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর ছিল। সাদাপাথরে এই ঈদে প্রতিদিন কয়েক হাজার লোক বেড়াতে গেছেন। আমাদের কয়েকটি টিম সার্বিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল। পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরাফেরা করেছেন।’
জাফলং ট্যুরিস্ট পুলিশের ইনচার্জ রতন শেখ বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে সকাল থেকেই পর্যটকে মুখরিত ছিল জাফলং। পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা কাজ করেছেন। পর্যটকরা বেড়াতে এসে যাতে কোনোভাবেই ভোগান্তিতে না পড়েন, সেদিকে আমাদের নজর ছিল।’
টানা ছুটিতে চায়ের রাজ্যে পর্যটকের ঢল : ঈদুল ফিতর ও বাংলা নববর্ষের টানা ছুটিতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে ঈদের দিন থেকে গত রবিবার পর্যন্ত পর্যটকেন্দ্রগুলোয় বিভিন্ন বয়সী পর্যটকের উপচেপড়া ভিড় ছিল। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, রেকর্ড পরিমাণ পর্যটক এবারের ছুটিতে চায়ের রাজ্য ভ্রমণ করেছেন। পর্যটকের ভিড়ে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না চা-বাগানসহ হোটেল-রিসোর্টগুলোতে। এবারের ঈদের ছুটিতে এযাবৎ কালের রেকর্ড ১১ হাজার ২০০ পর্যটক টিকিট কেটে লাউয়াছড়ায় প্রবেশ করেন।
শুধু লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানেই নয়, ঈদের দিন থেকে কমলগঞ্জের টিলাঘেরা চা-বাগান, লাউয়াছড়া বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ, নয়নাভিরাম মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জিসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র দর্শনার্থীদের আগমনে মুখর ছিল।
লাউয়াছড়া সহব্যবস্থাপনা কমিটির অফিস সহকারী আফজাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদের ৪ দিনে উদ্যানে প্রায় ১২ হাজার পর্যটক প্রবেশ করেন। এতে রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।। ঈদ ও নববর্ষের টানা এই ছুটিতে রেকর্ড পরিমাণ পর্যটকের আগমন হয়। তবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে আসা ঢাকার ব্যবসায়ী মামুন আহমেদ, খুলনার সুমা বেগম, সিলেটের কলেজছাত্র মোফাজ্জল আহমেদসহ বেশ কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি ঈদেই চেষ্টা করেন তারা কমলগঞ্জের লাউয়াছড়ায় ঘুরে যেতে। এটি একটি সমৃদ্ধ বন। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর জীববৈচিত্র্যে ভরা এই বন দেখে মন জুড়িয়ে যায়।
এদিকে, ঈদের ছুটিতে পিকআপ, জিপ, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টমটম ও মোটরসাইকেলে করে ঝুঁকি নিয়ে বেড়াতে দেখা গেছে অনেক তরুণকে। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় তাদের আটকে ঝুঁকিপূর্ণ চলাচলে নিরুৎসাহিত করেছেন পুলিশ সদস্যরা।
মুখরিত সোনারগাঁ : সোনারগাঁয়ের বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, পানাম নগরী ও বাংলার তাজমহলসহ বিভিন্ন স্পটে ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখের ছুটিতে দর্শনার্থীদের ঢল নামে।
এবারের ঈদুল ফিতরের ছুটি ও বৈশাখে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, পানাম নগরী ও বাংলার তাজমহলে। ঈদের চতুর্থ দিন পহেলা বৈশাখ থেকে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে আয়োজন করা হয় ১৫ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। মেলায় পর্যটকদের আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ করে। ঈদের ছুটিতে অতিরিক্ত পর্যটক উপস্থিতির কারণে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশ সামনের সড়ক থেকে পানাম নগরী পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
এদিকে উপজেলার জামপুর ইউনিয়নের পেরাব গ্রামে ছিল দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভিড়। সেখানে নির্মিত বাংলার তাজমহল ও পিরামিড দেখে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হন।