তথ্য প্রতিমন্ত্রীর সমালোচনা উদীচীর প্রতিবাদ

সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নির্দিষ্ট সময়ের পরও পহেলা বৈশাখে উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করা ও নেতিবাচক বিবৃতি দেওয়া অনাকাক্সিক্ষত এবং দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে নিজের দপ্তর কক্ষে তিনি এ কথা বলেন। অন্যদিকে বাংলা বর্ষবরণের আয়োজনে সময় বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত না মেনে প্রতিবাদী অনুষ্ঠান করা নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর এ মন্তব্যের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে উদীচী। গতকাল দুপুরে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এ ধরনের বক্তব্য দুঃখজনক।

বাংলা বর্ষবরণের আয়োজনে সময় বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত না মেনে উদীচীর অনুষ্ঠান করা নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা পহেলা বৈশাখের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যে নির্দেশনা জারি করেছিল, সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অনুষ্ঠান করা ছিল হঠকারী ও দুঃখজনক। তাদের এ আচরণে সরকার খুবই ব্যথিত ও মর্মাহত।

তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে এবং যশোরের উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং অনেকে পঙ্গু হয়েছে।

হলি আর্টিসান, শোলাকিয়া ময়দান ও সিলেটে ঈদের জামাতের জঙ্গি হামলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে পুলিশের কয়েকজন সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং জনগণের জীবন বাঁচিয়েছেন। প্রতিটি অনুষ্ঠানে সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে সবসময় সতর্ক থাকায় অতীতের মতো বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি হামলা বা সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটতে পারেনি। এ বিষয়ে সরকার সবার সহযোগিতা কামনা করে।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘১৯৯৩ সালে ১৪০০ বঙ্গাব্দে, বাংলা শতবর্ষ বরণ করার সময় বেগম খালেদা জিয়া সরকার বাধা দিয়েছিল। তাদের বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল নিরাপত্তাজনিত নয় বরং বাঙালির সার্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক এই উৎসবকে নিরুৎসাহিত করা। বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব সংগঠনসহ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা আমরা সবাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করেছিলাম।’

তথ্য প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে উদীচীর প্রচার ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সম্পাদক কংকন নাগ স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি পাঠানো হয়। যাতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি মাহমুদ সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, ‘বর্ষবরণে উদীচীর আয়োজন দুঃখজনক ও অনাকাক্সিক্ষত বলে তিনি (তথ্য প্রতিমন্ত্রী) যে মন্তব্য করেছেন, তাতে বিস্মিত হয়েছে উদীচী। যেকোনো বিষয়ে প্রতিবাদ জানানো ও সংগঠিত হওয়া জনগণের সংবিধানসম্মত অধিকার। বর্ষবরণ আয়োজনের সময় সংকোচন করতে সরকারের নির্দেশের প্রতিবাদে অনুষ্ঠান আয়োজন করে উদীচী সেই সংবিধানসম্মত অধিকারই চর্চা করেছে। একইভাবে সরকারের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বর্ষবরণের দিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘উদীচী সবসময়ই মনে করে আবহমান বাংলার সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব পহেলা বৈশাখ বা বাংলা বর্ষবরণ। আর সেজন্যই বহু বছর ধরেই এ উৎসবের বিরুদ্ধে মৌলবাদী, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী নানা ধরনের অপপ্রচার ও কুৎসা রটিয়ে চলেছে। আমরা জানি প্রতি বছর খ্রিস্টীয় নতুন বছরের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু কোনো ঝুঁকি নেই বলে জানালেও নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে মৌলবাদী, ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর অবস্থানের সাযুজ্য রয়েছে বলে মনে করে উদীচী। বর্ষবরণ উৎসবকে নির্দিষ্ট সময়ের ঘেরাটোপে বেঁধে দেওয়ার হঠকারী সিদ্ধান্ত প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির কাছে নির্জলা আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছুই নয়।’