যেখানে পদ্ম ফোটা কঠিন!

২০১৪ সালের পর ২০১৯, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে পর পর দুটি লোকসভা নির্বাচনে ব্যাপক জয় পেয়েছে। চলতি বছর আরও একটি লোকসভা নির্বাচনে ছন্নছাড়া বিরোধী শিবিরের উল্টোদিকে আরও এক মেয়াদে মোদির শাসনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের ধারাবাহিক সাফল্য নয়, বরং রাজ্যস্তরেও দলটি প্রবল শক্তিমান। এই মুহূর্তে তারা ১২টি রাজ্যে একক শক্তিতে ক্ষমতায় এবং চারটিতে তাদের শরিকদের নিয়ে জোটের শাসন চলছে। কিন্তু বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক ‘পদ্মফুল’ তামিলনাড়ুতে শত চেষ্টা ও প্রত্যাশা-মাফিক প্রস্ফুটিত হতে পারছে না। আর কেরালায় তো কার্যত বিজেপি অপ্রাসঙ্গিক।    

সারা ভারতে যখন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ভাবাদর্শে চালিত বিজেপির জয়জয়কার, তখন কেরালা ও তামিলনাড়ুতে তাদের নির্বাচনী কায়দা-কৌশল মুখ থুবড়ে পড়ছে। হিন্দুত্বের হাওয়া দুই রাজ্যে শক্তি সঞ্চয় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনেও তাই-ই হচ্ছে।

কেরালা বর্তমানে শাসন করছে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এলডিএফ), যার নেতৃত্বে ভারতের কমিউনিস্ট পাাির্ট-মার্কসবাদী (সিপিআইএম)। সিপিআইএম নেতা মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ানের শাসনাধীন রাজ্যটির বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ), যার নেতৃত্বে সর্বভারতীয় স্তরের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। অর্থাৎ সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপিবিরোধী লড়াইয়ে একসঙ্গে চলা সিপিআইএম এবং কংগ্রেস কেরালায় একে অপরের রাজনৈতিক শত্রু। সারা ভারতের নানা প্রান্তে মোদি হাওয়া পৌঁছলেও লোকসভা-বিধানসভা নির্বিশেষে এখানে কংগ্রেস আর সিপিআইএমের পাল্টাপাল্টি প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। কেরালায় ২০টি লোকসভা আসন রয়েছে। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ইউডিএফ ১৯টি আসনে জয়লাভ করে, যার মধ্যে কংগ্রেস একাই দখল করে ১৫টি। রাজ্যটিতে মুসলিম ভোট ২৬-২৭ শতাংশ এবং খ্রিস্টান জনসংখ্যাও ১৮ শতাংশের মতো। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলিমরা এলডিএফ ও ইউডিএফের লড়াইয়ে নিয়ামক হয়ে ওঠে। বিজেপি রাজ্যটিতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নির্বাচনী সাফল্যের কৌশল সাজালেও তা হালে পানি পায়নি। এবার এলডিএফ ও ইউডিএফের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিজেপি প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। যদিও নরেন্দ্র মোদি এবার কেরালায় বিজেপি প্রার্থীদের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে বিশ্লেষকরা বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রথের কোনো তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি এখানে দেখেন না। তামিলনাড়ুর পরিস্থিতি কেরালার মতো না হলেও, বিজেপির সাফল্যের প্রশ্নে তা একই রকম। তামিল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত রাজ্যটির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হলেন দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাম (ডিএমকে) দলের প্রধান এমকে স্ট্যালিন। এ রাজ্যে ডিএমকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিধানসভার বিরোধী দল সারা ভারত আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাম (এআইএডিএমকে)। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এআইএডিএমকের প্রয়াত নেত্রী জয়ললিতার প্রভাব এখনো রয়েছে। ডিএমকে ও কংগ্রেসের জোট রাজ্যে ক্ষমতায়। বিজেপি রাজ্য বিধানসভায় মাত্র চারটি আসন দখল করতে সমর্থ হয়েছে। রামমন্দির আবেগকে রাজ্যটিতে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করছে বিজেপি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এআইএডিএমকের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাঁচটি আসনেই হেরে যায় বিজেপি।

এবার লোকসভা নির্বাচনে তামিলনাড়ু রাজ্যের ৩৯টি আসনের মধ্যে ১৯টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বিজেপি। তারা রাজ্যভিত্তিক কয়েকটি দলের সঙ্গে জোট তৈরি করে এবার ভোটের মাঠে লড়াই করছে। রাজ্য বিজেপির সভাপতি আন্নামালাই দলের ভোটের হার ২০ শতাংশের ওপরে নিয়ে যেতে চান। তামিলনাড়ুর ভোটের রাজনীতিতে শক্তভাবে দাঁড়াতে নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত সচেতন। তিনি রাজ্যে বেশ কয়েকটি শোভাযাত্রা ও জনসভার সময় নির্ধারণ করেছেন। বিজেপি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মেরূকরণ কৌশল এখানে যখন তেমন ভিত্তি পচ্ছে না, তখন বিজেপি ভোটের আগে অন্য কৌশলে শান দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ‘বিরোধপূর্ণ’ কচ্চথিবু দ্বীপ নিয়ে তামিল জেলেদের আবেগ উসকে দিতে সরব হন মোদি।