দেশে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের গত ২৪ বছরের মধ্যে রোগী ও মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল গত বছর। সে বছর মোট রোগী শনাক্ত হয় ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ এবং মারা যায় ১ হাজার ৭০৫ জন। কিন্তু চলতি বছর ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুর আগেই প্রথম তিন মাসের হিসাবে গত বছরের রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।
গত বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) মোট রোগী ছিল ৮৪৩ জন। আর মৃত্যু হয়েছিল ৯ জনের। কিন্তু এ বছর একই সময়ে রোগী পাওয়া গেছে ১ হাজার ৭০৫ এবং মৃত্যু হয়েছে ২২ জনের। অর্থাৎ গত বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে রোগী দ্বিগুণ ও মৃত্যু প্রায় আড়াইগুণ।
চলতি বছর আগাম বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গুর মৌসুম এক মাস এগিয়ে আসার সম্ভাবনাও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের হিসাবে, জুলাইয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে এবং সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি বছর ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার ঘনত্বও বেশি পাওয়া গেছে ঢাকার বাইরে ১০ জেলায়। সে কারণে পরিস্থিতি অন্যান্য বছরের চেয়ে খারাপ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের জরিপ অনুযায়ী, এসব জেলায় বর্ষা মৌসুমে মশার ঘনত্ব বা ব্রুটো ইনডেক্স ‘২০’ হতে পারে। এই সূচক ডেঙ্গুর জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বিবেচনা করা হয়।
এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিমধ্যেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের চেয়ে খারাপ হয়ে গেছে। সামনে আরও খারাপ হওয়ার সময় আসছে। গরম পড়ছে। গরমে তাড়াতাড়ি এডিস মশার ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এখন বৃষ্টি ছাড়াও পানি জমে থাকে। তার ওপর বৃষ্টি হবে। খুবই মারাত্মক খারাপ অবস্থা হবে।
অনুরূপভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘এবার ডেঙ্গুর মৌসুম এগিয়ে আসবে। জুলাই মাসেই ডেঙ্গুর প্রকোপ ব্যাপক আকার ধারণ করবে। অন্যান্য বছর আগস্ট-সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ব্যাপক হয়। কারণ এ বছর আগাম বৃষ্টি হয়েছে। আগাম বৃষ্টির কারণে এডিস মশার ঘনত্ব বাড়বে ও মৌসুমটা এগিয়ে আসবে বলে আমার মনে হয়।’
এ বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে আরও বলেন, ঢাকার পরিস্থিতি হয়তো অতটা খারাপ নাও হতে পারে। তবে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অন্যান্য বছরের তুলনায় খারাপ হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এ সংখ্যা গত তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ নিয়ে এ মাসে মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১৯৪ জন। মারা গেছে একজন।
মাসের হিসাবে চলতি বছর সর্বোচ্চ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যু ছিল গত বছর। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন রোগী ছিল ২০১৯ সালে ও ২৮১ জনের মৃত্যু ছিল ২০২২ সালে।
তৃতীয় সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া যায় ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল ২০১৯ সালে ১৭৯ জন। চতুর্থ সর্বোচ্চ রোগী ছিল ২০২১ সালে ২৮ হাজার ৪২৯ জন। ওই বছর মারা গেছে ১০৫ জন।
২০২২ সালের প্রথম তিন মাসে রোগী ছিল ১৬৬ জন, ২০২১ সালে ৫৪ ও ২০২০ সালে ৭৩ জন। এই তিন বছর প্রথম তিন মাসে কেউ মারা যায়নি।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, আগে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হতো জুন থেকে। চলত অক্টোবর পর্যন্ত। তবে এখন আর মৌসুম নেই। সারা বছরই ডেঙ্গু থাকে। এবার জানুয়ারিতে এক হাজারের বেশি রোগী ছিল।
‘ঝুঁকিপূর্ণ’ পর্যায়ে ১০ জেলা : গত বছর অক্টোবর থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় এডিস মশার প্রাথমিক জরিপ করেছেন অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। তার জরিপ অনুযায়ী, ১০ জেলায় এ মশার ঘনত্ব বেশি। জেলাগুলো হলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, বরগুনা, চাঁদপুর, নরসিংদী, কুমিল্লা, মাদারীপুর, গাজীপুর ও পিরোজপুর।
এ ব্যাপারে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, ‘এসব জেলায় বিস্তারিত না হলেও একটা সার্ভে করেছি। এ বছর এডিস মশার ঘনত্ব বেশি পেয়েছি। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বেশি। এ দুটি কারণে আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, এ জেলাগুলোতে পরিস্থিতি খারাপ হবে।’
ড. কবিরুল বাশার বলেন, ব্রুটো ইনডেক্স (মশার ঘনত্বের সূচক) যদি ২০ হয়, তাহলে ধরে নেওয়া হয় যে সেখান এডিস মশাবাহিত রোগ হবে। এটাকে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায় বলে। সাধারণত বর্ষার আগে ব্রুটো ইনডেক্স এত হয় না। বর্ষাকালে এটা ২০-এর ওপরে হয়। যখন বর্ষার আগে ১০ পাওয়া যায়, তখনই ধরে নেওয় হয় যে ওখানে ব্রুটো ইনডেক্স বর্ষার সময় ২০-এর ওপরে হয়ে যাবে। এই ১০ জেলায় ব্রুটো ইনডেক্স ১০-এর কাছাকাছি পাওয়া গেছে। যখন সার্ভে হয়েছে তখন বর্ষা মৌসুম ছিল না। শীতকাল ছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত এ ১০ জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ রোগী ছিল কক্সবাজারে ১১৬ ও সর্বনিম্ন গাজীপুরে ৫ জন। এর আগে গত বছরের এ সময় পর্যন্ত এসব জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ১১৪ জন রোগী ছিল চট্টগ্রামে। এ বছর সেখানে রোগী এখনই ১৩০ জনে পৌঁছেছে। গত বছর সর্বনিম্ন তিনজন রোগী ছিল কুমিল্লায়। এ বছর এখন পর্যন্ত ৭৪ জন রোগী পাওয়া গেছে।
ডেঙ্গু বাড়ার ৪ কারণ : অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার অনেক কারণ আছে। বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন একটি কারণ। আমরা ব্যবস্থাপনা করতে পারিনি, এটাও সত্য। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়াও কারণ। বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক দীর্ঘদিন ধরে এ দেশে ব্যবহার হওয়ার কারণে অনেক কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশা তার প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।’
ঢাকার বাইরেও ইজিপটাই মশা : ড. কবিরুল বাশার বলেন, দুই ধরনের এডিস মশার মধ্যে ঢাকায় ইজিপটাই মশা বেশি। অ্যালবোপিকটাস ঢাকায় কম, দুই শতাংশের নিচে। ঢাকার বাইরে যে জেলাগুলোতে নগরায়ণ বেশি, সেখানে ইজিপটাই বেশি। তবে কোন কোন জায়গায় ইজিপটাই ও অ্যালবোপিকটাস সমান সমান আছে। কোনো কোনো জায়গায় ৬০ শতাংশ ইজিপটাই ও ৪০ শতাংশ অ্যালবোপিকটাস। অর্থাৎ নগরায়ণ যেখানে বেশি সেখানে ইজিপটাই মশা বেশি।