তিন মার্কেট ভাঙার কারণে বেকার ৬ হাজার ব্যবসায়ী

ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে বঙ্গবাজারের প্রায় ৫ হাজার দোকান পুড়ে যাওয়ার পর সেখানে নতুন মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভেঙে ফেলা হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার গুলশান শপিং সেন্টার। ভাঙার প্রস্তুতি চলছে কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজার। রাজধানীর এই তিন মার্কেট ভাঙার কারণে প্রায় ৬ হাজার ব্যবসায়ী আয়ের উৎস হারাচ্ছেন। এর মধ্যে কারওয়ান বাজার কাঁচাবাজারের ১৭৬ ব্যবসায়ী গাবতলীতে বিকল্প স্থানে ব্যবসা করার সুযোগ পেলেও বাকি প্রায় ৬ হাজার ব্যবসায়ী এক অর্থে বেকার হয়ে পড়েছেন। এসব ব্যবসায়ীর এখন কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। তারা ঠিকানাহীন।

বঙ্গবাজারে মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু: গত বছরের এপ্রিলে বঙ্গবাজারে আগুন লেগে পুরোটাই পুড়ে যায়। এতে প্রায় ৫ হাজার দোকানি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অগ্নিকান্ডের ঘটনার এক সপ্তাহ পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে আগুনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে খালি জায়গায় অস্থায়ী দোকান দিয়ে জামা-কাপড় বিক্রি শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। গত ১৩ মার্চ সেগুনবাগিচায় এক অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস নতুন মার্কেট নির্মাণকাজ শুরুর ঘোষণা দেন। ঈদের পরই মার্কেট নির্মাণকাজে হাত দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এরই প্রেক্ষাপটে এসব অস্থায়ী দোকান ১৫ এপ্রিল থেকে উচ্ছেদ শুরু করে ডিএসসিসি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত মার্কেট নির্মাণকাজ শেষ করে তাদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বঙ্গবাজারে দুই দশক ধরে ব্যবসা করেন লক্ষ্মীপুরের মো. ইসমাইল। গত বছর বঙ্গবাজার মার্কেটে লাগা ভয়াবহ আগুনে তার দোকানের সবকিছু পুড়ে যায়। তিনি সেই ধকল কাটাতে বঙ্গবাজারে অস্থায়ী দোকানে ব্যবসা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সোমবার তার অস্থায়ী দোকানটিও উচ্ছেদ করা হয়। এতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ইসমাইল। দোকান ভাঙায় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী ও মজিবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, তারা নোটিস পেয়েছিলেন। দোকানের মালপত্র সরিয়ে নিয়েছেন। এখানে নতুন মার্কেট হবে। দুই বছরের মধ্যে মার্কেটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে বলে তাদের জানানো হয়েছে। তারপর দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে। এখন কী করবেন তারা আল্লাহ জানেন।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের বলেন, বঙ্গবাজারে মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু হবে, সেখানে ঈদের পর উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে এমন নোটিস ঈদের আগেই ব্যবসায়ীদের দেওয়া হয়েছিল। এনডিই নামের প্রতিষ্ঠান মার্কেটটি নির্মাণ করবে। তারা কাজ শুরু করেছে।

ডিএসসিসির তথ্য বলছে, পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজারকে আধুনিক রূপদান এবং সেখানে ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। সেখানে ১০তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হবে। ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোর ও বেজমেন্ট ছাড়া আরও ৮টি ফ্লোর থাকবে। বঙ্গবাজারের নাম রাখা হবে বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণিবিতান। ১ দশমিক ৭৯ একর জায়গার ওপর নির্মাণাধীন ভবনে থাকবে ৩ হাজার ৪২টি দোকান। প্রতিটি দোকানের আয়তন হবে ৮০ থেকে ১০০ বর্গফুট। ভবনটিতে ৮টি লিফট থাকবে। এ ছাড়া থাকবে গাড়ি পার্কিং, খাবারের দোকান, সমিতির অফিস, নিরাপত্তাকর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থা। ভবনটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৮ কোটি টাকা।

গুলশান শপিং সেন্টার ভেঙে ফেলা হয়েছে : রাজধানীর গুলশান-১-এ অবস্থিত গুলশান শপিং সেন্টার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভেঙে ফেলা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মার্কেটটি ভেঙে ফেলা হয়। এই মার্কেটে ৭২৩ জন ব্যবসায়ী ছিলেন। নতুন মার্কেট নির্মাণ হলে সেখানে ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু করার সুযোগ পাবেন।

জানা গেছে, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ গুলশান শপিং সেন্টার ৩০ দিনের মধ্যে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। পরে এ নিয়ে আপিল করা হয়। গত ২২ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ৫ সদস্যের আপিল বেঞ্চ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার আদেশ দেয়। রায়ের পর ওই দিন রাত থেকেই মার্কেট ভাঙার কাজ শুরু হয়।

জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গত বছরের ১৩ জুলাই গুলশান শপিং সেন্টারটি সিলগালা করে দেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। গুলশান শপিং সেন্টারের হোটেল, দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সিলগালা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলকার নায়ান ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুব হাসান। পরে গুলশান শপিং সেন্টার ভেঙে ফেলার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করে বাণী চিত্র ও চলচ্চিত্র নামে দুটি কোম্পানি। রিটের শুনানি শেষে আদালত মার্কেট ভাঙার নির্দেশ দেয়। এর আগে জরাজীর্ণ ভবন ও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকায় ২০২১ সালে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর গুলশান শপিং সেন্টারকে ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ডিএনসিসিকে জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেয়।

কারওয়ান বাজার ভেঙে ফেলা হবে : গত ১৮ মার্চ গাবতলীতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, কারওয়ান বাজার এখন ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে। একটি সিটির প্রাণকেন্দ্রে পাইকারি কাঁচাবাজার থাকতে পারে না। ট্রাক আসছে, ট্রাক যাচ্ছে, রাস্তা বন্ধ করে মালামাল নামছে। কোনো ডিসিপ্লিন নেই, রাস্তায় প্রচন্ড ট্রাফিক জ্যামের সৃষ্টি হচ্ছে।

আতিকুল ইসলাম বলেন, কারওয়ান বাজারের এই কাঁচাবাজারের ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় এটি ধসে পড়তে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে বহু মানুষের জীবন হুমকিতে রয়েছে। ঈদের পর কারওয়ান বাজারে ডিএনসিসির পরিত্যক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলা হবে। এই মার্কেটের ব্যবসায়ীদের গাবতলীর পাইকারি কাঁচাবাজারে স্থানান্তর করা হবে। খুব শিগগির গাবতলীতে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে। দোকান বরাদ্দ দেওয়া হলে যারা যাবেন না, তাদের দায় নিজেদের নিতে হবে। দোকান বরাদ্দ পাওয়ার পরে কেউ না গেলে সেটি নিয়ম অনুযায়ী অন্য জনকে বরাদ্দ দিয়ে দেওয়া হবে। মেয়র বলেন, প্রথম ধাপে কারওয়ান বাজার আড়ত মার্কেটের প্রথম তলার ৪০০ বর্গফুটের ৬২টি দোকান এবং দোতলার ১৭০ বর্গফুটের ১১৪টি দোকানসহ মোট ১৭৬টি দোকান স্থানান্তর করা হবে। এ ছাড়া কারওয়ান বাজারে সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ কর্র্তৃক বরাদ্দ ১৮০টি টিনশেড দোকান আছে, সেগুলো আমিনবাজারে পাইকারি কাঁচাবাজারের আশপাশের উন্মুক্ত স্থানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজারের ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা আগুন লাগলে বহু মানুষ হতাহত হবে। আমরা আর মৃত্যুর মিছিল দেখতে চাই না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ঝুকিপূর্ণ ভবনে কোনো ব্যবসা চলতে দেওয়া যাবে না। ঈদের পরে কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীদের স্থানান্তর শুরু হবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুকবুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সেখানে থাকা ডিএনসিসির আঞ্চলিক কার্যালয় মোহাম্মদপুরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মার্কেট ভাঙার দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাদের একাধিক বৈঠক হয়েছে। তারা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন এমন কিছু দাবি-দাওয়া আছে। এগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব বিষয় সমাধান করে খুব শিগগির ভাঙার কাজ শুরু করা হবে।