নিজ উপজেলার রাজনীতি কবজায় রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য ও ডিমলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আফতাব উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে। উপজেলা পরিষদের আসন্ন নির্বাচনে তার তিন নিকট আত্মীয় প্রার্থী হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মাঠে এমপি আফতাব উদ্দিন সরকারের প্রভাব বিস্তারের কারণে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য প্রার্থীরা।
এ ছাড়া এমপি আফতাব ও অন্য নেতাদের গ্রুপিংয়ে বেকায়দায় পড়েছেন আওয়ামী লীগের অন্যান্য প্রার্থী এবং দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা। সব মিলিয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীন দলে গৃহদাহ প্রকট হয়ে উঠেছে। যার জেরে সহিংসতারও আশঙ্কা করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
যদিও দলের মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের সন্তান, পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের উপজেলা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের নিকটাত্মীয়দের কেউ ভোট থেকে সরে না দাঁড়ালে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। তবে সেই নির্দেশনা প্রতিপালন না করার অভিযোগ উঠেছে আফতাব উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে।
নাম না প্রকাশের শর্তে ডিমলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী বলেন, ডিমলায় এমপি আফতাব পরিবারের রাজতন্ত্র চলছে। এ পরিবারের কোনো সদস্য অন্যায় করলেও তার প্রতিবাদ করতে সাহস পান না কেউ। টেন্ডার থেকে শুরু করে নিয়োগবাণিজ্য সব এই একটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে।
ডিমলা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ইতিমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিলের পর তা যাচাই-বাছাইও হয়ে গেছে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও ডিমলা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, চেয়ারম্যান পদে চার, ভাইস চেয়ারম্যান পদে সাত ও সংরক্ষিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে তিনজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। তাদের সবার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২২ এপ্রিল ও ভোটগ্রহণ ৮ মে।
চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া চারজন হলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি টানা দুই মেয়াদে নৌকা প্রতীকের উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা তবিবুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক সরকার মিন্টু, উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ফেরদৌস পারভেজ ও ন্যাপ নেতা আবদুর রহমান।
চার চেয়ারম্যান প্রার্থীর মধ্যে দুজন এমপি আফতাব উদ্দিন সরকারের পরিবারের নিকট আত্মীয়। এর মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক সরকার মিন্টু এমপির আপন চাচাতো ভাই। আর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌস পারভেজ এমপির আপন ভাতিজা। তৃণমূল নেতাকর্মীরা জানান, চাচাতো ভাই আনোয়ারুল হক মিন্টুর সঙ্গে এমপির ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। এমপি তার ভাতিজা ফেরদৌস পারভেজকে সরাসরি সমর্থন দিয়ে দলের নেতাকর্মীদের ডেকে ভাতিজার পক্ষে নির্বাচন করতে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে দলের নেতাকর্মীরা বাধ্য হয়ে ফেরদৌস পারভেজের পক্ষে মিছিল-মিটিং করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অন্যদিকে যারা আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা তারাও বিভক্ত হয়ে অন্য দুই চেয়ারম্যান প্রার্থী তবিবুল ইসলাম ও আনোয়ারুল হক সরকারের পক্ষ নিয়েছেন।
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে এমপির আপন ভাতিজি বউ ডিমলা সদর ইউনিয়ন মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পারুল বেগম প্রার্থী হয়েছেন। এই পদে অন্য দুই প্রার্থী হলেন উপজেলা তাঁতী লীগের সভাপতি জাহানারা বেগম ও বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান জামায়াতপন্থি আয়শা সিদ্দিকা।
তৃণমূল নেতাকর্মীরা জানান, ভাইস চেয়ারম্যান পদে এমপির পরিবারের বা নিকট আত্মীয় কেউ প্রার্থী না হলেও ওই পদে সাত প্রার্থীর মধ্যে মোফাক্কারুল ইসলাম পেলবকে এমপি সমর্থন দিয়েছেন। পেলব কিছুদিন আগেও ন্যাপের উপজেলা আহ্বায়ক ছিলেন। তাকে এমপি আওয়ামী লীগের যোগদান করিয়েছেন। যদিও ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী রয়েছেন বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং ডিমলা সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নীরেন্দ্র নাথ রায়।
ডিমলা উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ও এবারের নির্বাচনেও প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা তবিবুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমপি আফতাব উদ্দিন সরকারের আপন চাচাতো ভাই আনোয়ারুল হক সরকার মিন্টু ও ভাতিজা ফেরদৌস পারভেজ চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছেন। এর মধ্যে ফেরদৌস পারভেজকে বিজয়ী করার জন্য এমপি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতিদিন বাসায় ঢেকে এনে পক্ষে কাজ করার জন্য দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন। এ ছাড়া যারা তাকে সমর্থন করছেন না তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি প্রদান করছেন।’
এমপির প্রভাব বিস্তারের কারণে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে অভিযোগ করে তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে এমপির ভাতিজা ফেরদৌস পারভেজ প্রকাশ্যে আমাকে লাঞ্ছিত করেছিল। যার বিচার আজও পাইনি আমি।’
আরেক প্রার্থী এমপি আফতাব উদ্দিন সরকারের চাচাতো ভাই আনোয়ারুল হক সরকার মিন্টু বলেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্তের কোনো চিঠি এখনো হাতে পাইনি। তবে পত্রপত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি মন্ত্রী-এমপির স্বজনরা উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। যদি দলীয় চিঠি হাতে পাই তাহলে সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ২২ এপ্রিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেব।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘নির্বাচনে এমপি ভাই হিসেবে আমাকে সমর্থন দেননি। তিনি ভাতিজা ফেরদৌস পারভেজকে সমর্থন দিয়ে তার পক্ষে দলের লোকজনকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছেন।’
এ ব্যাপারে চেয়ারম্যান প্রার্থী এমপির ভাতিজা ফেরদৌস পারভেজ বলেন, ‘আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি। এখানে এমপি চাচার কোনো প্রভাব নেই। নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছি ভোট করার জন্য। সুষ্ঠু ভোট হলে আমি প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য তিনজন যে ভোট পাবে তাদের চেয়ে দ্বিগুণ ভোট পেয়ে বিজয়ী হব।’
মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের নিকটাত্মীয়দের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে আওয়ামী লীগের নির্দেশের বিষয়ে জানতে চাইলে এই যুবলীগ নেতা বলেন, ‘এটা তো আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত, যুবলীগের কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এ ধরনের কোনো চিঠি হাতে পাইনি। এমপির স্বজনরা নির্বাচন করতে পারবে কি পারবে না, সে বিষয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেব।’
এদিকে সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন সরকার তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে সাংবাদিকদের জানান, তিনি চাচাতো ভাই আনোয়াররুল হক সরকার ও ভাতিজা ফেরদৌস পারভেজের প্রার্থী হওয়া নিয়ে শুরু থেকেই বিরোধিতা করেছেন। এখন দলের সিদ্ধান্ত মন্ত্রী বা এমপির কোনো স্বজন উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না তা সবাই মানবে বলে মনে করেন তিনি।