হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

দেশে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সারা দেশের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গরম চরম আকার ধারণ করেছে। তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারা দেশের হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা এবং একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে জরুরি রোগী ছাড়া ভর্তি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল রবিবার সকালে সারা দেশের হাসপাতালের পরিচালক ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। পরে দুপুরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক ব্রিফিংয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্তের কথা জানান। এ সময় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, সারা দেশে যত হাসপাতাল আছে সব পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কয়েকটা নির্দেশনা দিয়েছি। এর মধ্যে আছে মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা। বয়স্ক এবং শিশুরা প্রয়োজন ছাড়া যেন বাড়ি থেকে বের না হয়। পাশাপাশি হাসপাতালের বেড খালি রাখার জন্য বলেছি। এ মুহূর্তে কোল্ড কেসের রোগী ভর্তি করাতে মানা করেছি, অর্থাৎ যেসব রোগীর অপারেশন এক মাস পরে করলেও চলে কিংবা এখন ভর্তি না করালেও চলবে তাদের এখন যেন না রাখে। যদি চাপ তৈরি হয় তখন যেন শিশু এবং বয়স্কদের ভর্তি করানো যায়।

তাপপ্রবাহে বাচ্চাদের ঝুঁকি এড়াতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কাছে যখন মেসেজ এলো (হিট অ্যালার্ট), আমি শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ও আমরা প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। কারণ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে বাচ্চা এবং বয়স্করা।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ওরাল স্যালাইনের কোথাও কোনো ঘাটতি হলে যেন আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানানো হয়। এখন পর্যন্ত আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। প্রকৃতির ওপর তো আমাদের কারও হাত নেই। এটা আমাদের তৈরি রাখতে হবে।’

শিশুদের জন্য হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে কি না জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি শনিবার শিশু হাসপাতালে গিয়েছিলাম। শিশু হাসপাতালগুলোকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখার জন্যই সারা দেশের হাসপাতালগুলোকে নির্দেশ দিয়েছি। বাচ্চাদের ব্যাপারে আজকে (রবিবার) থেকে একটা অনলাইন ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করছি সারা দেশের চিকিৎসকদের নিয়ে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, মহাখালীতে করোনা চিকিৎসার জন্য ডিএনসিসি হাসপাতালে শিশু ও বয়স্কদের জন্য আলাদাভাবে বেড রাখতে বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইসিডিডিআরবির পরামর্শ : তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ। প্রচণ্ড গরমে দেখা দিচ্ছে হিট স্ট্রোক। প্রতিদিনই তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড হচ্ছে। ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশিসহ নানা ধরনের গরমের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ বাড়ছে। উদ্বেগে দিন কাটছে মানুষের। এমন অবস্থায় হিট স্ট্রোক ও গরমের রোগ থেকে সুরক্ষায় বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। গতকাল রবিবার এক তথ্য বিবরণীতে এসব পরামর্শ দেওয়া হয়। পরামর্শ মেনে চরার জন্য সর্বসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে; বিশেষ করে তাপপ্রবাহের ফলে রোগের প্রাদর্ভাব দেখা গেলে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসকের পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা নিতে স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এর আগে গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে দেশের সব সরকারি হাসপাতালের পরিচালক ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন।

তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, অতিরিক্ত গরমে মানুষের শরীরে অস্বস্তিবোধ, পানিশূন্যতা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, অনিদ্রা,মাংসপেশিতে ব্যথা, খাবারে অরুচি, চামড়ায় ক্ষত, কিডনি ও ফুসফুসে সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, হার্টের সমস্যা, হিট স্ট্রোক ও হিট ক্র্যাম্পস দেখা দিতে পারে।

বিভিন্ন শ্রেণির ও বয়সের মানুষের মধ্যে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, রিকশাচালক, কৃষক ও নির্মাণশ্রমিকসহ শ্রমজীবী ব্যক্তি, যাদের ওজন বেশি, যারা শারীরিকভাবে অসুস্থ, বিশেষ করে যাদের হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপ আছে এমন শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

চলমান তাপপ্রবাহে হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে বেশ কিছু পরামর্শ দেয় প্রতিষ্ঠান দুটি। সেখানে বলা হয়, দিনের বেলায় যথাসম্ভব বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকুন। রোদ এড়িয়ে চলুন। বাইরে বের হলে ছাতা, টুপি বা কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে রাখুন। হালকা রঙের ঢিলেঢালা এবং সম্ভব হলে সুতির জামা পরুন।

এ সময় প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করার, সহজে হজম হয় এমন খাবার খাওয়ার ও বাসি, খোলা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাপপ্রবাহ চলাকালে দিনের বেলায় একটানা শারীরিক পরিশ্রম করা থেকে বিরত থাকার, সম্ভব হলে একাধিকবার পানির ঝাপটা নেওয়া বা গোসল করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

গরমে সতর্কতা ও হিট স্ট্রোকের চিকিৎসায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরামর্শ : প্রচণ্ড গরমে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয়, গরম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু সতর্কতা পালন, হিট স্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে মন্ত্রী এসব পরামর্শ দেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এই গরমে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ সময় বাচ্চা ও বয়োবৃদ্ধদের যথাসম্ভব বাসায় ঠান্ডা স্থানে রাখতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, যদি একান্ত প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হয় সে ক্ষেত্রে ছাতা, পানির বোতল, নরম সুতি কাপড়, চশমা, মাস্ক পরিধান করতে হবে। কিছুক্ষণ পর পর পানিসহ অন্যান্য তরল পান করতে হবে। খুব বেশি ঘাম হলে ডাবের পানি, পরিমাণমতো স্যালাইন পান করা, লেবুর শরবত একটু লবণ দিয়ে ঘন ঘন খেতে হবে।