ভারতের ১৮তম লোকসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর আগ্রাসী ধর্মীয় ‘মেরূকরণ’ শুরু করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। রাজস্থানের একটি সভা থেকে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘বিতর্কিত’ মন্তব্য করেছেন, যা নিয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। সভা থেকে তিনি বলেছেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে দেশের সম্পদ মুসলমানদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে। আবার গতকাল উত্তর প্রদেশের সভা থেকে তিনি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে মানুষের বাড়িঘর নিয়ে নেবে। এ নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, নির্বাচন কমিশন কি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে?
ভারতের লোকসভা নির্বাচনের প্রথম দফা শেষ হয়েছে ১৯ এপ্রিল। বিরোধীদের অভিমত, এতে ভালো ফল না করার আভাস পেয়েছেন বলেই ‘উসকানিমূলক সাম্প্রদায়িক’ প্রচারে নেমেছেন নরেন্দ্র মোদি। আর তা দেখেও নিশ্চুপ নির্বাচন কমিশন।
সম্প্রতি হায়দরাবাদে নির্বাচনী সভা থেকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী দাবি করেন, ‘কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে কোন শ্রেণির হাতে কত সম্পদ আছে তা জানতে সমীক্ষা করা হবে।’
ওই বক্তব্যকে অবলম্বন করে গত রবিবার রাজস্থানের বাঁশোয়াড়ার এক জনসভায় নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘মনমোহন সিংহের (কংগ্রেস শাসিত সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ই জানিয়েছিল, দেশের সম্পদে সবার আগে মুসলিমদের অধিকার আছে। এবার তারা বলছে, ক্ষমতায় এলে আপনাদের রোজগারের অর্থ মুসলিম, অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে বণ্টন করবে। বোনেদের গয়না নিয়ে হিসাব করে তা বিলিয়ে দেবে। আপনারাই বুঝুন, মা-বোনেদের গয়না ওরা কাদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে। যারা বেশি বেশি সন্তানের জন্ম দেয়, তাদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হবে দেশের সম্পত্তি। বহিরাগতদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হবে আপনাদের কষ্ট করে অর্জিত পয়সা। আপনারা কি চান, আপনাদের পয়সা বহিরাগতদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হোক? মেনে নিতে পারবেন তো সেটা?’
উল্লেখ্য, বিজেপি ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বহিরাগত’ বলতে মুসলমানদের বুঝিয়ে থাকে। কারণ তারা মনে করে, মুসলমানদের অনেকে বাইরে থেকে ভারতে এসে বসতি গড়েছে।
মোদি আরও বলেন, ‘শহুরে নকশালদের এই ভাবনা মা-বোনেদের মঙ্গলসূত্রকে পর্যন্ত ছাড়বে না।’ ‘শহুরে নকশাল’ বলতে বিজেপি কংগ্রেসসহ ভারতের বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোকে বোঝায়।
মোদি আরও বলেন, ‘প্রত্যেকের বাড়িতে মা-বোনেদের কত করে সোনা রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে। এই সোনা দেখানোর জন্য তো বাড়িতে রাখা হয় না। এর সঙ্গে নারীদের আবেগ, আত্মমর্যাদা জড়িত থাকে। মঙ্গলসূত্রের মূল্য তো সোনার বাজারদর দিয়ে মাপা যাবে না। এটা মহিলাদের কাছে একটা স্বপ্ন। কংগ্রেস সেই স্বপ্ন, সেই আবেগ, সেই আত্মমর্যাদা ছিনিয়ে নিতে চাইছে।’
মোদির এসব বক্তব্যের পর জবাব দিতে পিছপা হয়নি কংগ্রেস। এ নিয়ে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য, ‘প্রথম দফার হতাশার পরে নরেন্দ্র মোদির মিথ্যার স্তর এমন পর্যায়ে নেমেছে যে ভয়ে তিনি বিষয় থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে চাইছেন। কংগ্রেসের বিপ্লবী ইশতেহারে যে বিপুল জনসমর্থন পাচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে।’ এ ছাড়া কংগ্রেস মনমোহন সিংহের পুরনো ভিডিও পোস্ট করে বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসলিম সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়নের কথা বলেছিলেন।
আবার বেশি সন্তান নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মোদির মন্তব্যেরও জবাব দিয়েছে কংগ্রেস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কংগ্রেস মনে করিয়ে দিয়েছে, ‘নরেন্দ্র মোদির বাবা-মাও ছয় সন্তানের জনক।’
রাজস্থানের বিতর্কিত মন্তব্যের পর গতকাল উত্তর প্রদেশের আলিগড় থেকেও একই রকম মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। নির্বাচনী সভা থেকে তিনি নারীদের আবেগকে অবলম্বন করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘কংগ্রেস আইন বদলের চেষ্টা করছে এবং নারীদের গয়না নিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে।’
মোদির অভিযোগ, ‘কেউ যদি গ্রামে পৈতৃক বাড়ির অধিকারী হন কিংবা শহরে ফ্ল্যাট ক্রয় করেন, কংগ্রেস সেই বাড়িগুলো নিয়ে নেবে। কংগ্রেস বলছে, আপনার একটি বাড়ি থাকলে, আপনার আরেকটির দরকার নেই। এটি মাওবাদী মানসিকতা, কমিউনিস্ট মানসিকতা এবং তারা আমাদের দেশকে ধ্বংস করবে। কংগ্রেস এবং ইন্ডি জোট ভারতে এই নীতি চর্চা করতে চাইছে।’
উল্লেখ্য, বিজেপি বিরোধী জোট ‘ইনডিয়া’কে ইন্ডি জোট বলে অভিহিত করে।
মোদির এসব বক্তব্য নিয়ে এখনো নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে কিছু বলা হয়নি। বিরোধীরাও প্রশ্ন তুলছে, কমিশন কি মোদির বক্তব্য নিয়ে কিছু বলবে?