রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি

‘বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো ছিল’

পোশাক শিল্পে দেশের ইতিহাসে ভয়াবহ দুর্ঘটনার নাম রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। ঘটনার ১১ বছর শেষ হয়ে ১২ বছরে পা দিলেও এ দীর্ঘ সময়ে দোষীদের বিচার না হওয়ায় হতাশা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ওই ঘটনায় হতাহতদের স্বজনরা। বুধবার (২৪ এপ্রিল) সকালে নিহত ও নিখোঁজদের স্মরণে ধ্বসে পড়া রানা প্লাজার সামনে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে হতাহত শ্রমিকদের স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন।

হতাহত শ্রমিকদের স্বজনরা বলেন, রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনায় ১১ বছর পার হলেও দোষীদের বিচার না হওয়াটা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। অপরাধ করেও এভাবে যদি কেউ ছাড় পেয়ে যায় তাহলে আইন-আদালত দিয়ে আমরা কী করব? দ্রুত অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাসহ হতাহত শ্রমিকদের পুর্নবাসন ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।

রানা প্লাজার ছয় তলায় কাজ করতেন মনির হোসেন। ভবন ধ্বসের ঘটনায় তিন দিন চাপা পড়ে থাকার পর উদ্ধার করা হয় তাকে। পায়ে গুরুতর আঘাতের ক্ষত বয়ে বেড়ানো মনির হোসেন বলেন, পাঁচ মাস আগেও আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। লিভারে সমস্যা। রক্তবমি হয়। হাসপাতালে ভর্তি হলে অনেক টাকা খরচ হয়। কিন্তু টাকা পাই নাই। অথচ প্রতি বছর এই দিনটিকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা হলেও তারপর সবাই চুপ করে যায়। এক যুগ পূরণ হওয়ার আগেই ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও বিচারের দাবি জানান তিনি।

আহত শ্রমিক তাসলিমা বেগম বলেন, সবসময়ই সেই দিনের কথা মনে পড়ে। আজীবন মনে হয় ভুলতে পারব না। কেউ কিছু করল না আমাদের জন্য। এখন বোতল কুড়ায়ে খাই। রানা প্লাজার ঘটনায় আমার পা ভাঙে। কোনো কাজ করতে পারি না। আমাদের এমন যারা করল তাদের বিচার হলো না। এখন দোয়া করি, যাতে আল্লাহ বিচার করে।

রানা প্লাজার শ্রমিক নীলুফা বেগম ধসে পড়ার ঘটনায় মারত্মক আহত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘রানাপ্লাজা ধসে পড়ার এত বছর হয়ে গেলেও আমাদের কোনো খোঁজ কেউ নেয় না। আমার একটা পা মারাত্মকভাবে আহত। অপারেশনের জন্য ৭ লাখ টাকা লাগবে। এখন বিশেষ সহায়ক জুতা পরে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় নিলুফাকে। পঙ্গুত্ববরণে ৬ বছরের মাথায় স্বামী শহিদুল ইসলামও ছেড়ে চলে গেছেন।

তিনি আরও বলেন, এখন যদি চাকরিও করতাম, মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় থাকত। কিন্তু এখন আমাদের মর্মান্তিক জীবন; যে জীবনে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো ছিল। আজ পর্যন্ত বায়ার, মালিক কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের খোঁজখবর কেউ রাখেনি। এখন পর্যন্ত বিনা চিকিৎসায় ১৩ জন মারা গেছেন। আমিও মরার অপেক্ষায় আছি।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, রানা প্লাজার ১১ বছর পার হলো কিন্তু এখনও শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, চিকিৎসা কোনোটাই দেওয়া হয়নি। আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারগুলো মানবেতর দিন পার করছে। তাই সরকার ও বিজিএমইএ’র প্রতি দাবি দ্রুত অবিলম্বে রানা প্লাজা শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এ ঘটনার সঙ্গে দায়ীদের বিচার করতে হবে।

সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসে নিহত শ্রমিকদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে সাড়ে ১১ বছরের শিশু রিহান শেখ। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ভবনের নিচে চাপা পড়ে অন্যদের সঙ্গে তার বাবা মনসুর শেখ ও মা রেহানা বেগম মারা গেছেন। বুধবার সকালে সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনে অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিহান জানায়, ‘রানা প্লাজা ধসের কারণে মা-বাবাকে হারাই। আমি তখন ছিলাম মাত্র ছয় মাসের শিশু। মা-বাবা কী, আমি তা বুঝতে পারিনি। যারা আমার সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছে, মা-বাবার আদর থেকে বঞ্চিত করেছে, আমি তাদের বিচার চাই।

এদিন রানা প্লাজায় হতাহতদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ সারোয়ার আলম। এ সময় তিনি বলেন, রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনার তদন্ত কাজ শেষ হয়ে গেছে, এখন বিচার পর্যায়ে আছে। নিম্ন আদালতে বিচার হয়েছে, উচ্চ আদালতে আপিল হওয়ার পরে বিষয়টা পেন্ডিং আছে। যেহেতু আদালতে বিচার কাজ চলমান আছে তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এ ছাড়া শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী দেনা পাওনার বিষয়গুলো দেখে কলকারখানা অধিদপ্তর। আমরা তাদের বলেছি, ওনারা কাজ করছেন, চেষ্টা করছেন এগুলো দ্রুত আদায় করার জন্য।

এ ছাড়া নিহত শ্রমিকদের শ্রদ্ধা জানিয়ে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নিহত ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসার দাবি জানায় বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম, বাংলাদেশ ও এস কে গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।

এর আগে রানা প্লাজা ধ্বসে নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালনসহ নানান প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে হতাহতদের পরিবার, আহত শ্রমিক এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) রাতে সাভারে ধ্বসে পড়া রানা প্লাজার সামনের শহীদ বেদির সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় রানা প্লাজা ধসে নিহত শ্রমিকদের স্মরণে পোশাক শিল্পে শোক দিবস ঘোষণা, রানা প্লাজার সামনে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের এক জীবনের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও এ ঘটনায় দোষীদের দ্রæত শাস্তি দাবি করে প্রতিবাদ সমাবেশ করে শ্রমিক সংগঠনগুলো।