রানা প্লাজা ধস

যুগ পেরিয়েছে শুকায়নি ক্ষত

  • অনেক আহতের মেলেনি সুচিকিৎসা
  • প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ মেলেনি অনেকের
  • ঝুলে আছে বিচার
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৩০ এএম

সাভারে বহুতল ভবন রানা প্লাজা ধসের এক যুগ পূর্তি হচ্ছে আজ। ২০১৩ সালের এই দিনে রানা প্লাজা ধসে নিহত হন ১ হাজার ১৩৮ শ্রমিক। আহত হন আরও অন্তত দুই হাজারজন। গেল এক যুগে হতভাগ্য সেসব শ্রমিক বা তাদের পরিবারে অনেকেই যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাননি।

পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে এখনো আহত শ্রমিকরা অনাহারে, অর্ধাহারে জীবন পার করছেন। নিহত ও নিখোঁজ পরিবারের স্বজনরা প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া ভবন ধসের ঘটনায় দোষী ভবন ও কারখানা মালিকদের আজও বিচার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা।

আহত-নিহত ও নিখোঁজের স্বজনরা জানান, রানা প্লাজা ধসের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত কারও বিচার হয়নি। পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসা সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে না ভুক্তভোগীদের। তাদের চাওয়া, দ্রুত দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ রানা প্লাজার স্থানে মার্কেট অথবা বাসস্থান নির্মাণ করে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারকে পুনর্বাসন হোক।

রানা প্লাজা ভবনের ধ্বংসস্তূপে দুদিন আটকে থাকা নারীশ্রমিক জেসমিন বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দুদিন আটকা ছিলাম, বাঁচার কোনো আশা ছিল না। একজন অচেনা মানুষ আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। বাঁচার চরম ইচ্ছা এবং সন্তানকে দেখার ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছু তখন মাথায় আসেনি। কিন্তু ১২ বছর ধরে শরীর এবং মনে সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছি। অথচ দোষীদের এখনো শাস্তি হয়নি। মরার আগে দোষীদের শাস্তি দেখে যেতে পারলে একটু শান্তি পেতাম।’

বরিশালের শীলা বেগম একটু ভালোভাবে বাঁচার আশায় একমাত্র মেয়ে নীপাকে নিয়ে সাভারে এসে রানা প্লাজার ছয়তলার ইথার টেক্স কারখানায় অপারেটর পদে চাকরি নিয়েছিলেন। বেতনে সংসারে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও এসেছিল। কিন্তু সেই সুখ বেশি দিন তার কপালে জোটেনি। রানা প্লাজা ধসের সময় ভবনের বিমের নিচে চাপা পড়েন শীলা। প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর উদ্ধারকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। প্রথমদিকে সরকারিভাবে কিছু টাকা পেলেও সেই টাকায় তার চিকিৎসাও ঠিকমতো করতে পারেননি। অভাবের কারণে সন্তানের লেখাপড়াও বন্ধ রয়েছে। এখন কোনোরকম খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছেন তিনি।

শীলা বেগম বলেন, ‘আমার মেরুদণ্ডে সমস্যা, হাতে সমস্যার পর এখন পেটে টিউমার হয়েছে। সর্বক্ষণ রক্তক্ষরণ হচ্ছে। দ্রুত অপারেশন করা দরকার। কিন্তু টাকার অভাবে করতে পারছি না। টাকার অভাবে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষপড়ূয়া মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। মেয়েকে পড়ালেখা না করাতে পারলে আমার আত্মহত্যা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।’ 

ভবনটির তৃতীয়তলার নিউ ওয়েভ বটমস কারখানার অপারেটর আজিরন বেগমকে স্বামী ও মেয়ে ধ্বংসস্ত‚পের নিচ থেকে খুঁজে বের করে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। আজিরন বেগম বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে ১০ দিন ভর্তি থাকার পর সুস্থ না হওয়ায় সাভার সিআরপি হাসপাতালে দেড় বছর চিকিৎসাধীন ছিলাম। পুরো শরীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ব্যথা, এখনো ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারি না।’ সরকারের কাছে সুচিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন আজিরন।

রানা প্লাজার পঞ্চমতলায় প্যান্টম অ্যাপারেলস কারখানায় সুইং অপারেটর নিলুফার ইয়াসমিন ভবন ধসের সময় বিমের নিচে চাপা পড়ে পঙ্গু হয়ে যান। বর্তমানে তার পায়ে পচন ধরেছে, ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। ডাক্তার বলেছেন, পা কেটে ফেলতে হবে। টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে না পারায় পা কেটে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

ভবন ধসের ঘটনায় আহত শ্রমিক হাওয়া বেগম কোমরে আঘাত পেয়ে দীর্ঘদিন বিছানায় পড়েছিলেন। সংসার না চলায় অসুস্থ থাকা অবস্থায় বিভিন্ন কারখানায় ঘুরে চাকরি না পেয়ে অবশেষে গৃহপরিচারিকার কাজ নেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে সেটাও করতে পারেননি। কোনো উপায় না পেয়ে এখন মানুষের কাছে হাত পাতেন। দুই মেয়ে, দুই ছেলে ও অসুস্থ স্বামী নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করছেন তিনি।

রানা প্লাজা ধসের পর বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ধসে পড়া ভবনটির সামনে একটি অস্থায়ী শহীদবেদি নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীকালে সেখানেই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান নিহত, আহত ও নিখোঁজদের স্বজনরা। একসময় জায়গাটিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দেয় প্রভাবশালীরা। মাদকসেবীদের আস্তানায় পরিণত হয় জায়গাটি। বিগত সরকারের আমলে শ্রদ্ধা জানাতে আসা লোকজনকে তাড়িয়ে দিতে দেখা গেছে পুলিশকে। তবে বর্তমানে ২৪ এপ্রিলকে সামনে রেখে জায়গাটি পরিষ্কার করা হয়েছে।

অন্যদিকে এক যুগ পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা অধিকাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রানা প্লাজার ঘটনায় হওয়া ১১টি শ্রম (ফৌজদারি) মামলা এখনো ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন। এর মধ্যে চারটি মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর্যায়ে রয়েছে, চারটি মামলার নোটিস পত্রিকায় প্রকাশের অপেক্ষায় এবং বাকি তিনটি মামলার কজলিস্টে তারিখ বা নম্বর হালনাগাদ হয়নি। এ ছাড়া দায়রা আদালতে তিনটি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে একটি মামলা ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর আওতায় হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে। বাকি দুটি মামলা ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে একত্রে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ইতিমধ্যে ৯৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য হয়েছে আগামী ১৯ মে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত