বিশ্ববিদ্যালয় ছাড় দিলেও ছাড় নেই ছাত্রলীগ থেকে

দেশ জুড়ে চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যে শিক্ষার্থীদের স্বস্তি দিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্র্তৃপক্ষ। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই ছাড় পেলেও ক্ষমতাসীন দলের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ থেকে ছাড় পাননি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। অসহনীয় গরমের মধ্যেও ছাত্রলীগের নিয়মিত কর্মসূচির পাশাপাশি গেস্টরুম কর্মসূচিতে (রাতে হলগুলোর অতিথিকক্ষে ছাত্রলীগ পরিচালিত নিয়মিত কর্মসূচি) অংশ নিতে হচ্ছে তাদের। এসব কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে গরমে ইতিমধ্যে দুজন শিক্ষার্থীর অচেতন হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে নড়েচড়ে বসেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও। গঠন করেছে তদন্ত কমিটি।

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে গত ২১ এপ্রিল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত শতভাগ অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নেয় ঢাবি প্রশাসন। এ সময়টায় শিক্ষার্থীদের হলে নিরাপদে অবস্থান করতে বলা হলেও ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিতে হচ্ছে তাদের। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে শীর্ষ নেতাদের প্রটোকল দিতে হয়। মধুর ক্যানটিন, টিএসসি কিংবা ডাস চত্বরে গিয়ে সালাম দিতে হয় নেতাদের। তাদের নিয়ে যান হল শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীরা। এ ছাড়া অংশ নিতে হয় গেস্টরুম কর্মসূচিতে। কোনো শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যোগ না দিলে তাকে শাস্তি পেতে হয়। গেস্টরুমে দাঁড় করিয়ে রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নানা কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যা চলছে এই তীব্র গরমেও।

গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে ঢাবি বিজয় একাত্তর হলে ছাত্রলীগের গেস্টরুম কর্মসূচিতে গরমে এক শিক্ষার্থীর অচেতন হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম নিয়ামুল ইসলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী। তখন গেস্টরুম কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাব্বি আহম্মেদের কর্মীরা। রাব্বি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের অনুসারী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্রলীগের গেস্টরুম কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে রাত ১০টার দিকে অচেতন হয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন নিয়ামুল ইসলাম। এর আগে তিনি গরমের কারণে কয়েকবার খারাপ লাগার কথা জানালেও তাতে কর্ণপাত করেননি ছাত্রলীগের কর্মীরা। একপর্যায়ে পড়ে যেতে গেলে তাকে কক্ষে নিয়ে মাথায় পানি এবং ভেজা গামছা বেঁধে দেন বন্ধুরা। ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ কর্মীরা এসে ঘটনাটি যাতে জানাজানি না হয় সেজন্য হাসপাতালে নিতে নিরুৎসাহিত করেন।

এর আগের দিন সোমবারও একই হল এবং বিভাগের মোহাম্মদ আলি শহীদ নামে এক শিক্ষার্থী অচেতন হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে। রাত ২টার দিকে তাকে এবং তার বন্ধুদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। কর্মসূচিতে নিয়মিত কেন অংশ নিচ্ছে না সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থী অচেতন হয়ে পড়েন। জানা গেছে, ওই দুই ঘটনার পর ভয়ে হল ছেড়ে চলে যান ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী নেয়ামুল এবং শহীদ। তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে নেয়ামুলকে খুঁজতে গেলেও তাকে হলে পাওয়া যায়নি।

এদিকে মঙ্গলবারের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হল প্রশাসন। হলের আবাসিক শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহ মিরানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আবাসিক শিক্ষক মোহা. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং আবু হোসেন মুহাম্মদ আহসান। আগামী ৭ দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য বলা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার সময় কখনো ভাবিনি যে এমন দাসত্বের জীবন আমাদের বইতে হবে, প্রশাসন পর্যন্ত গরমের কারণে দয়াপরবশ হয়ে আমাদের ক্লাস অনলাইনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু ছাত্রলীগের রাজনৈতিক মহড়া দেওয়া আমাদের জীবনের চেয়েও বেশি জরুরি। জোর করে আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে তাদের প্রোগ্রামগুলো করতে। হিট স্ট্রোক করে যদি আমাদেরও কেউ মারা যায় তার দায় কি ছাত্রলীগ নেবে? ইতিমধ্যে আমাদের বন্ধুরা অসুস্থ হওয়া শুরু করেছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত বলেন, ‘গরমের মধ্যে আমাদের খুব বেশি প্রোগ্রাম নেই। টুকটাক যা করে আমাদের নেতাকর্মীরাই করেন। এর বাইরে কাউকে আমরা বাধ্য করি না। আর অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে আমরা সব সময় ব্যবস্থা নিচ্ছি। আগামীতেও আমরা তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেব।’

বিজয় একাত্তর হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আব্দুল বাছির বলেন, ‘তথাকথিত গেস্টরুমের নামে যে অনাকাক্সিক্ষত এবং দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটেছে, সেটির সত্যতা নিরূপণের মাধ্যমে কমিটি আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে একটি রিপোর্ট জমা দেবে। সেই আলোকে আমরা ব্যবস্থা নেব। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নেব।’

আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল রউফ মামুন বলেন, ‘হলের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা আমাদের কাছে সবার আগে। কোথাও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলে নির্দিষ্ট হল কর্র্তৃপক্ষ দেখবে। বিজয় একাত্তর হলের ঘটনায় হল প্রশাসন তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবে।’

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় প্রশাসন অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটলে শিক্ষার্থীরা লিখিত অভিযোগ দিলে যথাযথ কর্র্তৃপক্ষ সেটি দেখবে।’