বিশ্ব জুড়ে গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত যেন মুহূর্তেই যুক্তরাষ্ট্রে বিস্ফোরণের রূপ নিয়েছে। দেশটি গত সপ্তাহ থেকে লাগাতার ছাত্র বিক্ষোভে উত্তাল। গত বুধবার থেকে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসেও। অস্টিনের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসেও একইভাবে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে। এর মধ্যে গাজার খান ইউনিসে নাসের হাসপাতাল প্রাঙ্গণে গণকবর থেকে আরও মরদেহ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলি প্রশাসনের বর্বরতায় আন্তর্জাতিক নিন্দা আরও তীব্র হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়, গত বুধবার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীরা তাঁবু খাটিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করে।গত সোমবার হার্ভার্ডের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের একটি সংস্থার অনুষ্ঠান বাতিলের জেরে শুরু হয় উত্তেজনা।
এর আগে হার্ভার্ডের প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিন গে গত জানুয়ারি মাসে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ওই সময়ও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। এরপর গাজা যুদ্ধ নিয়ে হার্ভার্ডে নানা প্রতিবাদ হলেও সর্বশেষ বিক্ষোভটি হচ্ছে সবচেয়ে বড়। ১৩টির মতো তাঁবু খাটিয়ে চলছে বিক্ষোভ। জন হার্ভার্ড স্ট্যাচুর সামনে জড়ো হয়েছেন কয়েকশ শিক্ষার্থী।
ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ আঁচ করতে পেরে গত রবিবার থেকে হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষ শুধু পরিচয়পত্রধারীদের জন্য ক্যাম্পাস উন্মুক্ত করে দেয়। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভের তাঁবু স্থাপন করলে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। তবে সেই হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে তাঁবু স্থাপন করেছেন ফিলিস্তিনপন্থিরা।
এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ক্যাম্পাসেই ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভের জোয়ারে উত্তাল। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন আর নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির নেই। কর্তৃপক্ষ তাঁবু তুলে ফেলতে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করলেও শিক্ষার্থীরা ইসরায়েলের সঙ্গে অস্ত্র-সংক্রান্ত সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানাচ্ছে। বিশেষ করে নিউ ইয়র্কের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইসরায়েলবিরোধী মনোভাবে ফুঁসছে। গত সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তুলে কলাম্বিয়া, ইয়েল, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে কয়েকশ গণহারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
গতকাল বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কের আভি লিগ ইউনিভার্সিটিতে পুলিশ তাঁবু তুলতে যায়। এ সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় তাদের। পুলিশ গ্রেপ্তার করে শতাধিক। তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে যায় পুলিশ। বস্টন ও লস অ্যাঞ্জেলসেও সংঘর্ষ হয়েছে।
গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের আল নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে পাওয়া গণকবর থেকে আরও মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে গত বুধবার পর্যন্ত ফিলিস্তিনের বেসামরিক প্রতিরক্ষা দলগুলো নাসের হাসপাতালের গণকবর থেকে ৩২৪টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ওসিএইচএ। তারা জানায়, গণকবর থেকে পাওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং রোগীরাও রয়েছে। এসব মরদেহের মধ্যে শুধু কয়েকজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক এই হত্যাকা-ের স্বাধীন, কার্যকর ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে হাসপাতালগুলো বিশেষ সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। বেসামরিক নাগরিক, বন্দিদের কারণ ছাড়া হত্যা করা একটি যুদ্ধাপরাধ।’
অন্যদিকে আল নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে পাওয়া গণকবর থেকে উদ্ধারকৃত মরদেহ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বুধবার হোয়াইট হাউজ জানায়, ইসরায়েলি অবরোধে ধ্বংস হওয়া গাজার হাসপাতালগুলোতে গণকবর আবিষ্কারের পর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ‘উত্তর’ চায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে উত্তর চাই। আমরা এটির পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এবং স্বচ্ছভাবে তদন্ত দেখতে চাই।’