তাপপ্রবাহে পুড়ছে দক্ষিণ এশিয়া

দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে লাখ লাখ মানুষ উত্তপ্ত তাপমাত্রার মুখোমুখি হচ্ছে। অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়ার কারণে অনেক দেশ স্কুল বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। এ ছাড়া তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অরগানাইজেশনের ‘স্টেট অফ গ্লোবাল ক্লাইমেট’ রিপোর্টে ২০২৩ সালকে সবচেয়ে উষ্ণতম বছর বলা হয়েছে। তবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যেভাবে গরম অনুভূত হচ্ছে তাতে ২০২৪ সালের উষ্ণতা বিগত বছরকে ছাড়িয়ে যাবে কি না সেই শঙ্কা করা হচ্ছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের আবহাওয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশগুলোকে প্রস্তুত করতে বড় ধরনের সহায়তার প্রয়োজন পড়বে।

‘স্টেট অফ গ্লোবাল ক্লাইমেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে আবহাওয়া, জলবায়ু এবং পানি-সম্পর্কিত বিপদের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগ-বিধ্বস্ত অঞ্চল ছিল এশিয়া। এ অঞ্চলের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটেছে বন্যা ও ঝড়ে। এখানে তাপপ্রবাহের প্রভাবও তীব্র হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রিনহাউজ গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি, ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা, সমুদ্রের তাপ এবং অ্যাসিডিফিকেশন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্তাপ এবং অমøকরণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অ্যান্টার্কটিক সমুদ্রের বরফের আচ্ছাদন গলে যাওয়া এবং হিমবাহ পশ্চাদপসরণের মতো একাধিক ঘটনা উষ্ণায়নের বিষয়ে চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এপ্রিল ও মে মাস সাধারণত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য উষ্ণতম মাস। কিন্তু এ বছর তাপমাত্রা পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কারণ এল নিনোর প্রভাব। এল নিনো এমন এক প্রাকৃতিক ঘটনা, যা প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর ঘটে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনোর কারণে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা অস্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে তৈরি হতে পারে খাদ্য, পানি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার ঝুঁকি।

চলতি বছরে ইতিমধ্যে এশিয়ার অনেক দেশেই চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। হাঁসফাঁস করা এই পরিস্থিতিতে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান-সহ দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশ। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ছাড়িয়েছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভারতের একাধিক রাজ্যে তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছে। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশেও একই পরিস্থিতি। অন্যদিকে, ইরানে গত বছর সর্বাধিক তাপমাত্রা ছাড়িয়েছিল ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই নিরিখে এ বছরের চলতি মাসের ছবি বিশেষ আশার আলো দেখাতে পারছে না।

বাংলাদেশ

চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশের কিছু জেলায় তাপপ্রবাহ বইতে শুরু করে। এরপর গত দুই সপ্তাহে তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বাংলাদেশেই। যশোরে চলতি বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহে এই অঙ্ক ঘোরাফেরা করেছে ৪০ থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। সৈয়দপুরে গত এক সপ্তাহে সর্বাধিক ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা লক্ষ্য করা গেছে। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গায় ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ঢাকায় এ বছর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ভারত

গ্রীষ্মের শুরুতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ওড়িশার বারিপদাতে ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা লক্ষ্য করা গিয়েছে। রাজ্যটি ভুবনেশ্বরে গত এক সপ্তাহে সর্বাধিক তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা গিয়েছে। পিছিয়ে নেই পশ্চিমবঙ্গ ও। কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের তাপ মাপন কেন্দ্রে ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা লক্ষ্য করা গিয়েছে গত এক সপ্তাহে। পশ্চিমবঙ্গের পানাগড়ে এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৪৫ ডিগ্রি। বাঁকুড়াও রয়েছে ওই তালিকায়। পুরুলিয়া ও মেদিনীপুরে সর্বোচ্চ রেকর্ড করা তাপমাত্রা ৪২-৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ৪-৬ ডিগ্রি বেশি রয়েছে বলে আবহাওয়া দপ্তরের সূত্রে জানানো হয়েছে।

আবহাওয়া দপ্তরে সূত্রে জানানো হয়েছে, রাজধানী দিল্লিতে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস না থাকলেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি হবে আগামী তিন দিনে। গত এক সপ্তাহে ওই তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি থেকে ৩৯ ডিগ্রির মধ্যে। হরিয়ানাতেও তাপমাত্রার দিল্লির কাছাকাছি রয়েছে। বিহার, পূর্ব মধ্য প্রদেশ, তামিলনাড়ু এবং পন্ডিচেরির একাধিক অঞ্চলসহ পূর্ব উত্তর প্রদেশের বিচ্ছিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে।

পাকিস্তান

এই বছর পাকিস্তানের আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সিন্ধ প্রদেশের একাধিক অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। সিন্ধের নওয়াব শাহতে গত এক সপ্তাহে সর্বাধিক তাপমাত্রা ছুঁয়েছে ৪২ ডিগ্রি, মহেঞ্জোদারোতে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। লাহোরে গত এক সপ্তাহে সর্বাধিক তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। উষ্ণতম শহরের তালিকায় বেলুচিস্তানের তুরবত অঞ্চলের নাম অনেক আগেই নথিভুক্ত হয়েছে। সেখানে গত এক সপ্তাহে তাপমাত্রা ছুঁয়েছে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বেলুচিস্তানের নাকুন্দিতে ৩৭ ডিগ্রি এবং সিব্বিতে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। অন্যদিকে করাচিতে চলতি মাসে সর্বাধিক তাপমাত্রা রয়েছে ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। গত এক সপ্তাহে করাচির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

মালদ্বীপ

চলতি মাসে মালের গড় তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত এক সপ্তাহে সর্বাধিক তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি। মালদ্বীপের আদ্দু অ্যাটলের দক্ষিণতম দ্বীপ গান-এ গত এক সপ্তাহে নথিভুক্ত করা তথ্য বলছে সেখানে সর্বাধিক তাপমাত্রা রয়েছে ৩২ ডিগ্রি থেকে ৩৩ ডিগ্রির মধ্যে। হিথাধুর পরে গান হলো দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ। মালদ্বীপের ফুভাহমুলাহতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা গত এক সপ্তাহে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মালদ্বীপের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-এর মে মাস ছিল সেখানকার উষ্ণতম মাস। তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয় উল্লেখ করে, আবহাওয়া অফিস জানিয়েছিল ওই বছর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

শ্রীলঙ্কা

চলতি মাসে শ্রীলঙ্কার গড় তাপমাত্রা ২৭.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কলম্বোতে এ সপ্তাহে তাপমাত্রা সর্বাধিক তাপমাত্রা রয়েছে ৩৩ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক শহর অনুরাধাপুরার বিমানবন্দর অঞ্চলের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত এক সপ্তাহে সাবারাগামুওয়া প্রদেশের রাজধানী শহর রত্নপুরায় সবচেয়ে বেশি উষ্ণতা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চল প্রদেশে অবস্থিত অন্যতম বৃহত্তম শহর ক্যান্ডিতে গত এক সপ্তাহে যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করা গিয়েছে তা হলো ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর ২০২৩-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে গ্রীষ্মম-লীয় অঞ্চলে অবস্থিত শ্রীলঙ্কার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত বছর ওই দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিভিন্ন অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি থেকে ৩২ ডিগ্রির এর মধ্যে ছিল পুরো বছর।

নেপাল

চলতি মাসে নেপালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করেছে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। রাজধানী কাঠমান্ডুর গড় তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে জানা গিয়েছে। চলতি সপ্তাহে কাঠমা-ুর বাগমতি অঞ্চলের তাপমাত্রা রয়েছে ৩০-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। অন্যদিকে নেপালের লুম্বিনী অঞ্চলে অবস্থিত গৌতম বুদ্ধ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত এক সপ্তাহে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। নেপালের জ্বালানি, জলসম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের জলবায়ু রিপোর্ট অনুযায়ী, নেপালের সারা বছরের স্বাভাবিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ০.৬ শতাংশ বেড়েছে।