অভিবাসী ঠেকাতে কর্তৃত্ববাদ তোষণ

তিউনিসিয়া হতে যাচ্ছে ইউরোপ মহাদেশে অনিয়মিত উপায়ে অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র। নানা বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে অবৈধ উপায়ে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক অভিবাসীদের ঢল ঠেকাতে তিউনিসিয়াকে অভিবাসী আশ্রয়ের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়াকে অনেকে যুক্তরাজ্যের ব্যাপক সমালোচিত ‘রুয়ান্ডা পরিকল্পনা’-এর সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের ওই পরিকল্পনা নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টির সরকার সম্প্রতি ‘রুয়ান্ডা পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করেছে, যার মূল কথা হলো যুক্তরাজ্যে অবৈধ উপায়ে আসতে চাওয়া অভিবাসীদের আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডাতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। রুয়ান্ডাকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ব্রিটিশ পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে। হয়তো তিউনিসিয়াকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় নেতারা যে পরিকল্পনা করছেন, তার সঙ্গে রুয়ান্ডা পরিকল্পনার মিল কমই। তবে অভিবাসীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নে দুটি প্রক্রিয়া একই রকম বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা। উত্তর আফ্রিকা ও সাব সাহারা অঞ্চল থেকে বিপুল অভিবাসী ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপ পাড়ি দিতে তিউনিসিয়ার সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করে। এই অভিবাসীদের মহাদেশটিতে প্রবেশ করতে দিতে চায় না ইউরোপীয়রা। এর পরিবর্তে তিউনিসিয়াকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে সেখানে একটি অভিবাসী আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে মরিয়া ইউরোপীয় নেতারা ।  ইউরোপ মহাদেশের পাশাপাশি অভিবাসীদের নিয়ে এককভাবে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা ইতালির। কারণ অভিবাসীরা ইতালিকেই তাদের গন্তব্য হিসেবে প্রথমে বেছে নেয়। অভিবাসীদের স্রোত ঠেকাতে ‘মাত্তেই পরিকল্পনা’-এর অংশ হিসেবে ইতালির ডানপন্থি সরকারের প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কায়িস সাইদের সঙ্গে তিনটি চুক্তি করেছেন। এর আওতায় আফ্রিকার দেশগুলোতে সুযোগবৃদ্ধি করতে উদ্যোগী হওয়ার অঙ্গীকার করেছে ইতালি, যাতে অভিবাসী আসা হ্রাস পায়। আবার তিউনিসিয়ার কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের হাতেও ইউরোপীয়দের তরফ থেকে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে কায়িস সাইদ জনগণকে তুষ্ট করতে পারেন এবং অভিবাসী ঠেকাতে পারেন। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তিউনিসিয়াকে একটি ‘অংশীদারি কর্মসূচি’ প্রণয়নের প্রস্তাব দেয়। এতে ১ বিলিয়ন ইউরো আর্থিক সুবিধা এবং ১০ কোটির ওপর অর্থ অভিবাসী প্রবাহ কমাতে ব্যয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর আওতায় সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানায়, চলতি মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত তিউনিসিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী ২১ হাজার অভিবাসীকে ইউরোপীয় জলসীমায় প্রবেশের আগেই আটক করে। সামগ্রিকভাবে এ পথে আগের বছরের তুলনায় অভিবাসীও হ্রাস পেয়েছে। তা ছাড়া কায়িস সাইদের কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন অভিবাসীদের প্রতি রূঢ় আচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তিউনিসিয়া শাখার পরিচালক সালসাবিক চেল্লালি বলেন, ‘এখন তিউনিসিয়ায় অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী এবং শরণার্থীরা মারাত্মক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড ও কোস্ট গার্ড দ্বারা। কেউ ফেরত এলে তাকে গ্রেপ্তার, হয়রানিসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়।’ চেল্লালি মনে করেন, এ পরিস্থিতি একমাত্র সাইদের নিপীড়নমূলক নীতির প্রতিফলন নয়। তার ভাষ্য, ‘তিউনিসিয়ায় মানবাধিকার ও ইউরোপীয় মূল্যবোধের অনুপস্থিতিতে দেশটির অভিবাসী নিয়ন্ত্রণ নীতিতে ইইউয়ের অব্যাহত আর্থিক প্রণোদনাই এ রকম পরিস্থিতি তৈরি করেছে।’  আগামী অক্টোবরে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। দেশটির মানুষ অভিবাসীদের নিয়ে বেজায় ক্ষুব্ধ। আসন্ন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদ অভিবাসীদের পরিবেশ উন্নয়নে কিছুই করবেন না। বিষয়টিতে তিনি জোরই দেবেন না। এর পরিবর্তে তিনি দেশের অর্থনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরে জনতুষ্টিমূলক কিছু প্রতিশ্রুতি দেবেন। মেলোনির সরকারের সঙ্গে তিউনিসিয়ার সরকারের সই হওয়া চুক্তিতে ১২ হাজারের মতো দক্ষ কর্মীকে আগামী তিন বছরে ইতালিতে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে কাইস সাইদের দিক থেকে এ ধরনের ব্যাপারগুলোকে তুলে ধরা হবে।