পুঁজিবাজার কি আর্থিক অপরাধীদের অভয়ারণ্য?

দেশকে শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। ২০২৬ সালের পর স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এই বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যাবে। কিন্তু ব্যাংক স্বল্পমেয়াদে আমানত সংগ্রহ করে। ফলে কাঠামোগতভাবে ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সরবরাহে অপারগ; চলতি পুঁজি সরবরাহ করতে পারে মাত্র। কিন্তু আমাদের দেশে এই বাস্তবতা ভুলে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগে জড়িয়ে পড়ায় আজ এই সেক্টর তারল্য সংকট ও মন্ধঋণের ভারে জর্জরিত। পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগের অর্থ সংগ্রহ করে এই পরিস্থিতি সহজেই উতরানো যায়; পশ্চিমা বিশ্বে এ পথেই করপোরেট সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে।

প্রশ্ন হলো- মানুষ পুঁজিবাজারে অর্থ নিয়ে আসবে কেন? পুঁজিবাজারে মানুষ আসবে দুটি কারণে; ক্যাপিটাল গেইন ও ডিভিডেন্ড বা মুনাফা লাভের আশায়। মানুষ যখন দেখবে যে, পুঁজিবাজারে যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে, তাদের কার্যক্রম ভালো; ভালো ডিভিডেন্ড দেয়, সেখানে সুশাসন রয়েছে, স্বচ্ছতা রয়েছে, আছে শেয়ার হোল্ডারদের কাছে জবাবদিহির ব্যবস্থা, শেয়ার কেনাবেচা নিয়ে নেই কোনো কারসাজি তখনই মানুষ স্বেচ্ছায় এ বাজারে চলে আসবে। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নেই, আছে হঠকারিতা। এখানে বন্ধ কারখানার মন্দ শেয়ারের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। আর কর্র্তৃপক্ষ শুধু ‘কোনো সংবেদনশীল তথ্য আছে কি না’ এমন একটি টেম্পলেট প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সন্তুষ্ট থাকে। এখানে কলমের এক খোঁচায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে ফ্লোর প্রাইস নামের এক অদ্ভুত মানদণ্ডের আদেশ জারি করে ১৮ মাস ধরে অনেক শেয়ার বাক্সবন্দি করে রাখা হয়। এতে যাদের স্বার্থরক্ষার কথা বলে এ কাজ করা হয়, তাদেরই বরং বারোটা বেজে যায়। একটু বুঝিয়ে বলছি।

বাজার চাঙ্গা রাখতে বিএসইসি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে সূচকের সঙ্গে মার্জিন লোন ব্যবহারের মাত্রা ঠিক করে রেখেছে। যারা মার্জিন লোন নিয়ে বাজার থেকে শেয়ার কিনেছিলেন, চাহিদা না থাকায় ফ্লোর প্রাইস আরোপের ফলে তারা ওই দামের কমে শেয়ার বিক্রি করতে পারছিলেন না। দীর্ঘ ১৮ মাস এই অচলাবস্থা চলতে থাকে। অন্য দিকে লোনের সুদ স্ফীত হতে থাকে। এরপর যখন ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই এই অচলায়তন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির ধুম পড়ে যায়। ফলে মার্জিন অ্যাকাউন্টগুলো দ্রুত নেগেটিভ হয়ে বাধ্যতামূলক বিক্রির পথ উন্মোচন করে। এর ডমিনো ইফেক্টে বাজার পতন আরও ত্বরান্বিত হয়। এখন এই অবস্থাই বাজারে চলছে। ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা না হলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তাদের শেয়ার তখনই বিক্রি করে দিতেন। তাতে হয়তো এখনকার মতোই ক্ষতি হতো; কিন্তু মার্জিন লোনের সুদ গুনতে হতো না। তাছাড়া, দু’বছরে ওই টাকা দিয়ে তারা কিছু একটা কাজ করতে পারতেন। এখন তারা শেয়ার বিক্রি করে যে অর্থ পাচ্ছেন, তার দাম এই দু’বছরে প্রায় ২০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতিতেই কমে গেছে। আসলে মার্জিন লোনের অর্থ সরবরাহ করে বাজারকে কৃত্রিমভাবে ওপরে তোলার প্রচেষ্টা কাণ্ডজ্ঞানহীন এক কর্ম; এখন বাজারে যে গড় ডিভিডেন্ড পে-আউট রেশিও এবং সুদহার চলমান, তা কি মার্জিন লোনের ব্যবহার আদৌ সমর্থন করে? বাজারকে তার নিজস্ব শক্তির ভিত্তিতে চলতে দিতে হবে। এখন বিএসইসি গবেষণা করে দেখাতে পারে যে, তারা যে কাজটি করেছিল, তাতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের নিট কতটুকু সুবিধাপ্রাপ্তি ঘটেছে। নিজের গায়ে নিজে সার্জারি করার নৈতিক বল ও সক্ষমতা কি এই প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে?

আলাদাভাবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা করা বিএসইসির কোনো কাজ বা ম্যান্ডেট হতে পারে না; ওটা বড়জোর ত্রাণ বিভাগের কাজ হতে পারে, আর ত্রাণ বিতরণ করে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করা যায় না। বিএসইসির কাজ বিনিয়োগকারী ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের স্বার্থে কাজ করা। কাজটা তারা শুরু করেছিলেন বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে বিদেশের মাটিতে রোড শো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এখন পুঁজিবাজারে এর ফল দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে; বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুঁজিপাটা নিয়ে ক্রমেই দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন। গ্রামীণফোনের বিদেশি শেয়ার হোল্ডিং ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ছিল ২.১৩ শতাংশ, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেটা নেমে গেছে ১.৪৪ শতাংশে। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির শেয়ার হোল্ডিংয়েও এর প্রতিফলন দেখা যায়; এ সময় তাদের হোল্ডিং ৬.৩৯ শতাংশ থেকে ৬.০৫ শতাংশে নেমে আসে। সিঙ্গারেও এ সময় বিদেশি হোল্ডিং ৪.৫২ শতাংশ থেকে ১.৪৭ শতাংশে নেমে আসে (The Financial Express, March 21, 2024)। এই মুহূর্তের খবর হলো বিগত মার্চ ১৮ তারিখ থেকে ২৮ তারিখ অর্থাৎ ১০ দিনে ৩৩ হাজার ৮৪৩ জন বিনিয়োগকারী তাদের বিও অ্যাকাউন্টে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে খালি করে ফেলেছেন (প্রথম আলো, এপ্রিল ৩, ২০২৪)। তবে এখনো কভিড-১৯, ইউক্রেন যুদ্ধ, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক মুদ্রানীতি কর্র্তৃপক্ষকে কেষ্ট হিসেবে রক্ষা করে চলেছে।

পুঁজিবাজারে কারসাজি রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া বিএসইসির অন্যতম প্রধান কাজ। এজন্য তাদের সর্বাধুনিক কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে। এ কাজের ওপরই সংবেদনশীল এ বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি-ব্যবস্থা নির্ভরশীল। বিএসইসি এক্ষেত্রে অনেক কাজ করেছে। তাদের কাজের কয়েকটি নমুনা নিচে তুলে ধরছি।

এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লি. এর শেয়ার কারসাজির দায়ে এজি মাহমুদ ও সাইফ উল্লাহ নামের দুজন বিনিয়োগকারীকে সম্প্রতি ৫৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে ন্যাশনাল ফিড মিলের শেয়ার কারসাজির জন্য এজি মাহমুদ ও সাইফকে যথাক্রমে ৩ কোটি ও ৮৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। তাছাড়া, সাফকো স্পিনিংয়ের শেয়ার কারসাজির জন্য সাইফ উল্লাহকে ২৫ লাখ জরিমানা করা হয়। এরও আগে এজি মাহমুদ, সাইফ উল্লাহ, কাজী সাদিয়া হাসান ও ডিআইটি কো-অপারেটিভ লি.-সহ চার জনকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লি.-এর শেয়ার কারসাজির জন্য ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। যদিও তদন্তে উঠে আসে যে, ওই চার বিনিয়োগকারী কারসাজি করে ৫ কোটি টাকা লাভ করেন (শেয়ার বাজার নিউজ, মার্চ ২৯, ২০২৪)।

আবার জেনেক্স ইনফোসিস-এর শেয়ার কারসাজির জন্য সম্প্রতি আবুল খায়ের ও তার অ্যাসোসিয়েটদের ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে ২০২২ সালে এশিয়া ইনস্যুরেন্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স ও গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজির জন্য তাদের ২ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। বিডি কম অনলাইন ও ওয়ান ব্যাংকের শেয়ার কারসাজির জন্য তাদের ৩.৫৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। সূত্রে প্রকাশ তাদের এই বেআইনি কারবারে লাভ হয়েছিল ৪৮.৫ কোটি টাকা (The Financial Express, March 28, 2024)।

এসব খবর পড়ে চাকরিতে প্রবেশের শুরুতে শোনা একটা বাস্তব ঘটনা আবার স্মরণে এলো। স্বাধীনতার পর দেশে এক পর্যায়ে লবণ সংকট দেখা দেয়; ক্ষেত্রবিশেষে এক সের লবণের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকায় উঠে যায়। ওই সময় রংপুর অঞ্চলের কোনো এক গুদাম কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ২০ হাজার মণ লবণ মজুদ ছিল। অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির এই কর্মকর্তা রাতের আঁধারে এই পুরো লট প্রতি সেরে ১০ টাকা লাভ নিয়ে বিক্রি করে দেন। পরিকল্পনা মাফিক বেচারা দারোয়ানের হাত-পা বেঁধে এবং তাকে কয়েকটা ঘা লাগিয়ে লবণ লুটের নাটক মঞ্চায়ন করা হয়। তখন খাদ্য পরিদপ্তরে স্মার্ট একজন পরিচালক ছিলেন। তিনি তদন্তে নামলেন। সেখানে তিনি দেখতে পেলেন যে, লবণের মতো একটা মহার্ঘ্য পণ্যের রাত্রিকালে পাহারাতে মাত্র একজন হতবুদ্ধি পাহারাদার নিয়োজিত ছিল। এতে তিনি গুদাম কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে অবহেলা আবিষ্কার করলেন। বিভাগীয় নিয়ম অনুযায়ী অবহেলার জন্য সংঘটিত ক্ষয়ক্ষতির মূল্য দ্বিগুণ হারে আদায় করার বিধান ছিল। লবণের এক্স গুদাম মূল্য ছিল তখন ২৫ পয়সা। কাজেই সেই চৌকস পরিচালক ২০ হাজার মণ লবণের জন্য দ্বিগুণ হারে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করে কেসটা নিষ্পত্তি করে দিলেন। যে গুদাম কর্মকর্তা নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে ৮০ লাখ টাকা কামাই করেছিলেন, তার কাছে ৪ লাখ টাকা তো নস্যি।

ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে যে, বিএসইসি ওই পরিচালকের চেয়ে আরও বেশি স্মার্ট হয়ে গেছে; পরিচালক কাজটা করেছিলেন একবার, কিন্তু পুঁজিবাজারের রক্ষাকর্তা এখন এই কাজটি করে যাচ্ছেন বার বার। তাছাড়া, একই দল বা সিন্ডিকেট যখন একই অপরাধ বার বার করে চলেন, তখন কি তার সাজা শুধু দণ্ড আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে? তার জন্য দৃষ্টান্তমূলক নিবর্তন ব্যবস্থা অতি আবশ্যক।

কয়েক দিন আগে বিএসইসির জনৈক সদস্য আক্ষেপ করে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন যে, এখানে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে কোম্পানির শেয়ারমূল্য ক্রমাগত কমতে থাকে। এর অর্থ কোম্পানির মৌলগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই তালিকাভুক্ত করা হয়। এর বড় প্রমাণ রিং সাইন টেক্সটাইলসের অনুমোদন। কিছু সনদপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষকের সহায়তায় সব কিছুর দাম ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখিয়ে কোম্পানিটি ১৯৯৮-২০২২ সালের মধ্যে ১২২.২৮মিলিয়ন ডলার পাচার করল, অথচ কেউ সেটা ধরতে পারল না, এটা কী করে সম্ভব? এখন আবার দেখা যাচ্ছে যে, রুল তৈরি ও অনুমোদন হয়নি, কাজেই এর জন্য এফআরসি (Financial Reporting Council) তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না (The Financial Express, March 17, 2024)। পুঁজিবাজার কি আর্থিক অপরাধীদের অভয়ারণ্য?

দেশকে শিল্পায়ন করতে হলে পুঁজিবাজার থেকে অর্থের জোগান দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, ব্যাংকের মাধ্যমে এ কাজ করা যাবে না; এটা এখন প্রমাণিত। আর পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে হলে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কার্পেটের নিচে ময়লা রেখে ঘর পরিষ্কার করা যাবে না; কার্পেট ও ময়লা- দুটোকেই নির্মূল করতে হবে। অন্যথায় দেশে বিদেশে যতই রোড শো করা হোক না কেন, ফলাফল শূন্যই থেকে যাবে। আশা করি দেশের স্নাতকায়নের এই সন্ধিক্ষণে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।

লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট

rulhanpasha@gmail.com