তিউনিসিয়া থেকে ফিরল ৮ মরদেহ

জমিজমা বিক্রি করে ও সুদে ঋণ নিয়ে দালালদের ৮ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। দালালরা বলেছিল কায়সারকে লিবিয়া থেকে জাহাজে করে ইতালি পৌঁছে দেবে। কিন্তু নৌকা করে নেওয়ার সময় পাটাতনের নিচে দমবন্ধ হয়ে হয়ে মারা যান তিনি। এ কথা বলছিলেন কায়সারের ভগ্নিপতি শাওন ফকির।

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কবিরাজপুরের কায়সারের মতো আরও সাত বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তিউনিসিয়া উপকূলে মারা যান। গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের লাশ তিউনিসিয়া থেকে ঢাকায় এসেছে। এ সময় তাদের স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়নি। সন্ধ্যায় মরদেহগুলো হস্তান্তর না করে পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বজনরা।

শাওন ফকির বলেন, ‘কায়সারের ছোট দুটি মেয়ে আছে। বাবাকে ছাড়া কীভাবে দুটি মেয়ে মানুষ হবে?’

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রিফাতও ইতালি যাওয়ার পথে মারা গেছেন। তার মামা রনি বলেন, ‘ভাই, আমার ভাগ্নে মরেও শান্তি পাচ্ছে না। সেই দুপুরে লাশ এসেছে। পুলিশ বলছে ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ দেবে না। এখন আমরা কী করব বলেন। কতক্ষণ অপেক্ষা করব। আজ (বৃহস্পতিবার) ময়নাতদন্ত হবে না। আগামীকাল (আজ শুক্রবার) দুপুর পর্যন্ত লাশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

জানা গেছে, লিবিয়া থেকে নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার পথে তিউনিসিয়া উপকূলে অন্তত নয়জন অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা যান। তাদের আটজনই বাংলাদেশি। একজন পাকিস্তানি।

নিহত বাংলাদেশি আটজন হলেন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ির নয়ন বিশ্বাস, একই উপজেলার খালিয়ার মামুন শেখ ও সজল, একই উপজেলার বাজিতপুর নতুনবাজারের কাজী সজীব ও কবিরাজপুরের কায়সার, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাগদীর রিফাত, দিগনগরের রাসেল ও গঙ্গারামপুর গোহালার ইমরুল কায়েস ওরফে আপন।

ওই ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মানব পাচার ও হত্যা মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তের স্বার্থে মরদেহ হস্তান্তরের আগে ময়নাতদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছে বিমানবন্দর থানা পুলিশ।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিমানবন্দর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার তৌহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে লাশগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশের সুরতহাল করা হবে। লাশের সঙ্গে যদি এমন কোনো নথি থাকে যে, তাদের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে; তাহলে আমরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করব। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত কোনো নথি পাইনি। তাই ময়নাতদন্ত করে লাশগুলো হস্তান্তর করা হবে। আজ (গতকাল) আর ময়নাতদন্ত সম্ভব নয়। আগামীকাল (আজ) শুক্রবার ময়নাতদন্ত করে লাশ হস্তান্তর করা হবে।’

বিমানবন্দর থানা পুলিশ জানিয়েছে, দুপুর সাড়ে ১২টায় বাংলাদেশি আটজনের মরদেহ এসভি ৮০৮ বিমানযোগে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। এর আগে গত মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) আবুল হাসনাত মুহাম্মাদ খায়রুল বাশারের (তিউনিসিয়ার অনাবাসিক রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত) উপস্থিতিতে মিশনের কর্মকর্তারা মরদেহগুলো তিউনিস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করেন।

জানা গেছে, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি অভিবাসী দল নৌকায় করে স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১১টায় লিবিয়ার জোয়ারা উপকূল থেকে ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। যাত্রাপথে নৌকাটি তিউনিসিয়া উপকূলে গেলে মধ্যরাত সাড়ে ৪টার দিকে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। নৌকায় ৫৩ জনের মধ্যে ৫২ জন যাত্রী এবং একজন চালক ছিলেন। দুর্ঘটনার পর তাদের মধ্যে ৪৪ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে ২৭ জন বাংলাদেশি নাগরিক আছেন।

দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ দূতাবাস ও লিবিয়ার একটি প্রতিনিধিদল তিউনিসিয়ার জারবা ও গ্যাবেস হাসপাতাল মর্গে অজ্ঞাতপরিচয়ে সংরক্ষিত মৃতদেহগুলো পরিদর্শন করে। এরপর দুর্ঘটনায় জীবিত উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের সহায়তায় সম্ভাব্য মৃত আটজন বাংলাদেশি নাগরিকের ছবি এবং প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ-পূর্বক বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। এরপর দূতাবাস থেকে নিহত বাংলাদেশিদের অনুকূলে ট্রাভেল পারমিট (আউটপাস) ইস্যু করে মৃতদেহগুলো দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

দূতাবাস থেকে তিউনিসিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটির সঙ্গে সমন্বয়ক কাজ করে পর্যায়ক্রমে মৃতদেহগুলোর সুরতহাল, মৃত্যুসনদ ও মেডিকেল সার্টিফিকেট ইস্যুসহ অন্যান্য সব দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।

বিমানবন্দরে লাশের অপেক্ষায় থাকা নিহত ব্যক্তিদের স্বজনরা বলেন, ৩০ জন যেতে পারবেন এমন একটি ছোট নৌকায় ৫২ জন তুলেছিল দালালরা।  যে আটজন মারা গেছেন,  তাদের নৌকার পাটাতনের নিচে জোর করে রাখা হয়েছিল। তারা অক্সিজেন সংকটের কারণে পাটাতন থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু দালালরা মারধর করে আবার তাদের সেখানে পাঠায়। এভাবে নির্যাতন ও অক্সিজেন সংকটে দমবন্ধ হয়ে মারা যান তারা।