রাফায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল

মিসরের মাধ্যমে ইসরায়েলের কাছ থেকে আসা যুদ্ধবিরতির একটি নতুন খসড়া চুক্তি প্রস্তাব বিবেচনা করছে হামাস। গতকাল বৃহস্পতিবার গোষ্ঠীটির একটি প্রতিনিধিদলের কায়রো সফর করার কথা ছিল। সে বিষয়ে হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়া তার ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছেন। যুদ্ধবিরতির এ আলোচনায় কাতারও যেন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে সেজন্য তিনি কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলানো শেখ মোহাম্মাদ আবদুল রহমান আল থানির সঙ্গে গতকাল ফোনালাপও করেছেন। সংশ্লিষ্টরা ভাবছেন, এ চুক্তিতে হামাসের বেশিরভাগ দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে এবং তারা এটি মেনে নিতে পারেন। ফলে শিগগিরই একটি যুদ্ধবিরতি আসতে পারে গাজায়।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করে আসছে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো। হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের দেওয়া সর্বশেষ পাল্টা প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল সফরে যাওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের।

হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ৪০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এবং বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তির বিনিময়ে বেশ কিছু জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে তারা।

এর আগে মিসরের কায়রোতে আলোচনা শেষে কাতারে ফিরে গেছে হামাস প্রতিনিধিদল। সেখানে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ধারণা ও প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। গতকাল লিখিত জবাব নিয়ে হামাসের প্রতিনিধিদলটি মিসরে যাওয়ার কথা।

অবশ্য যুদ্ধবিরতির মধ্যেই রাফায় অভিযানের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গতকাল আলজাজিরা জানিয়েছে, হামাসের হাতে বন্দি জিম্মিদের স্বজনদের সঙ্গে এক বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি হোক বা না হোক তিনি রাফায় হামলা চালাবেনই।

রাফায় আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের ঠিকমতো সুরক্ষা ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত সেখানে হামলা না চালানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বারবারই ইসরায়েলকে সতর্ক করে আসছিল। সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই নেতানিয়াহু এমন হুঁশিয়ারি দিলেন। তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। রাফা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছি এবং শিগগির সেখানে আক্রমণ শুরু হবে।

নেতানিয়াহু বলেন, হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্য পরিবর্তন আসেনি। হামাসকে নির্মূল এবং জিম্মিদের মুক্তিই তেল আবিবের প্রধান লক্ষ্য।

এদিকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত আরও ২৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এতে গত ৭ অক্টোবর থেকে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৪ হাজার ৫৯৬ জনে পৌঁছেছে।

গতকাল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে প্রায় সাত মাসের যুদ্ধে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ৭৭ হাজার ৮১৬ জন আহত হয়েছে। হতাহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।

বিবৃতিতে ফিলিস্তিনের গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, গাজায় ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি ও স্থাপনার নিচে প্রায় ১০ হাজার মরদেহ পড়ে আছে। এসব মরদেহে পচন ধরায় রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ছে।

গাজায় আন্তর্জাতিক আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন রায় উপেক্ষা করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাদের হামলার ফলে উপত্যকার অনেক মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং রাস্তায় আটকা পড়ে আছে। কারণ উদ্ধারকারীরা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।

গতকাল জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় সাত মাস ধরে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা উপত্যকা। সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়া আবাসনগুলো পুনরুদ্ধার করতে প্রায় ৮০ বছর সময় প্রয়োজন। তবে ২০২১ সালের সর্বশেষ সংকটের তুলনায় পাঁচগুণ দ্রুত নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করা হলে ২০৪০ সালের মধ্যে এটি পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে।

ইউএনডিপির মূল্যায়নে বর্তমান সংঘাতের সময়কালের ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধের আর্থ-সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে একাধিক অনুমান করা হয়েছে। ইউএনডিপির প্রশাসক আচিম স্টেইনার এক বিবৃতিতে বলেন, এত অল্প সময়ে নজিরবিহীন মানবিক ক্ষতি, মূলধন ধ্বংস এবং দারিদ্র্যের ব্যাপক বৃদ্ধি একটি গুরুতর উন্নয়ন সংকটের সূচনা করবে। এতে বিপন্ন হবে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।