নিজেকে অন্যের তুলনায় ক্ষমতাধর কিংবা বড় মনে করার মানসিকতাকে অহংকার বলে। এটি একটি তীব্র মানসিক অনুভূতি, যা মানুষের কথা ও কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। আল্লাহতায়ালা সবাইকে ধন-সম্পদ, ক্ষমতা ও যোগ্যতা সমানভাবে দেন না। কাউকে দেন বেশি, কাউকে দেন কম। মানুষের উচিত হলো আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। মানুষ যখন আল্লাহর নিয়ামতের কথা ভুলে এটাকে নিজের সম্পদ মনে করে, তখনই অহংকারের সূত্রপাত হয়। আর এ অহংকারের কারণে আল্লাহতায়ালার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।
কোরআন ও হাদিসে অহংকারী মানুষের পরিণতি ও শাস্তি প্রসঙ্গে অনেক বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহতায়ালা কোনো অহংকারীকে পছন্দ করেন না। অহংকার প্রসঙ্গে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন লোককে পছন্দ করেন না, যে বড় হওয়ার গৌরব ও অহংকার করে।’ (সুরা নিসা ৩৬)। কোরআনের অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রেখে কথা বলো না এবং পৃথিবীতে গর্বের সঙ্গে চলবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো বড়াইকারী ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লোকমান ১৮)
অহংকারীর সর্বশেষ পরিণতি হলো জাহান্নাম। কেননা সে অহংকারের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার অধীনতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে বেপরোয়া হয়ে যায়। নিজেকে অনেক বড়, ক্ষমতাবান ও শক্তিশালী মনে করে এবং মানুষকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। বিষয়টি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বর্ণিত এক হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। এক ব্যক্তি বললেন, কোনো ব্যক্তি পছন্দ করে তার কাপড় সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক (তাও কি অহংকার?)। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার হলো, আল্লাহর গোলামি থেকে বেপরোয়া হওয়া এবং মানুষকে অবজ্ঞা করা।’ (সহিহ মুসলিম)। অন্য হাদিসে আরও ইরশাদ হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অহংকারী ও অহংকারের মিথ্যা ভানকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (আবু দাউদ)
আল্লাহতায়ালা অহংকারের শাস্তি শুধু আখেরাতে নয়, দুনিয়াতেও দিয়ে থাকেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আগেকার অনেক জাতি ধন-সম্পদ ও শাসনক্ষমতা নিয়ে অহংকার ও বাড়াবাড়ি করার কারণে আল্লাহতায়ালা দুনিয়াতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করেছেন। এ প্রসঙ্গে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এমন কত জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, সেখানকার লোকেরা ধন-সম্পদের অহংকার করত। এই যে তাদের বাড়িঘর পড়ে আছে, যেখানে তাদের পর কম লোকই বসবাস করেছে। শেষ পর্যন্ত আমিই (এসবের) মালিক রয়েছি।’ (সুর কাসাস ৫৮)
কোরআন ও হাদিসে পূর্ববর্তী বিভিন্ন সম্প্রদায় ধ্বংসের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। পূর্ববর্তী অনেক শাসক ও ক্ষমতাধররা অহংকার করায় আল্লাহ তাদের সমুচিত শিক্ষা দিয়েছেন। তাদের এসব করুণ পরিণতির ইতিহাস বিশ্ববাসীর জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তাই তো ফেরাউন, কারুন ও নমরুদের মতো নামগুলোকে আজও মানুষ ঘৃণাভরে স্মরণ করে।
প্রকৃত মুমিন ব্যক্তি যেকোনো অবস্থায় গর্ব ও অহংকার পরিত্যাগ করবে। তাদের কথা, কাজ ও আচরণে কখনো অহংকার নয় বরং বিনয় প্রকাশ পাবে। মুমিনদের উদ্দেশে কোরআনে আল্লাহ বলছেন, ‘মাটির বুকে গর্বের সঙ্গে চলবে না। নিশ্চয়ই তুমি কখনো পদচাপে জমিনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না। আর পাহাড়ের সমান উঁচুও হতে পারবে না।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৩৭)
অনেক মানুষ আছে যারা দামি ও মূল্যবান পোশাক পরিধান করে অহংকার প্রকাশ করে থাকে। তাদের বিষয়ে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অহংকারবশত স্বীয় বস্ত্র মাটির ওপর দিয়ে টেনে চলে, কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তার দিকে তাকাবেন না। তখন হজরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমার লুঙ্গি অসতর্ক অবস্থায় ঢিলা হয়ে পায়ের গিরার নিচে চলে যায়, যদি না আমি তা ভালোভাবে বেঁধে রাখি। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি তা অহংকারবশত করো না।’ (সহিহ বোখারি)
অহংকার মানুষের ইবাদতকে নষ্ট করে দেয়। অহংকার থেকে বাঁচতে আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদ, জ্ঞান ও যোগ্যতাকে আল্লাহ প্রদত্ত দয়া, রহমত ও নিয়ামত ভেবে তার শুকরিয়া আদায় করতে হবে। আর যে ব্যক্তি এসব নিয়ামত পাননি তার জন্য মহান রবের দরবারে দোয়া করতে হবে, যাতে আল্লাহ তাকেও এসব নিয়ামত দান করেন। আর এ মানসিকতা পোষণ করতে হবে, আমি যে ইবাদত-বন্দেগি করছি তা আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের তুলনায় অতি নগণ্য। কাজেই আমার তৃপ্ত হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ প্রদত্ত এ নিয়ামত যেকোনো মুহূর্তে ছিনিয়ে নিতে পারেন। তিনি একজন বাদশাহকে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ফকিরে পরিণত করতে পারেন। তাই আসুন অহংকারমুক্ত জীবন গড়ে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা অর্জন করি।