অস্থিরতার অবয়ব

দিন দিন ভূপৃষ্ঠ গরম হয়ে উঠছে এমন কথা আজকাল রেডিও-টেলিভিশনে প্রায়ই শোনে সবাই। একসময় রেডিওতেই শুনতে হতো সব সরকারি রেডিও-সিনেমার গান থেকে শুরু করে সুনীল গাভাস্কারের শতরান করার কাহিনি সবই। দেখার কিছু ছিল না। কানটা খাড়া রাখলে চলত। যা হোক, আজকাল বেসরকারি টেলিভিশনেই সবকিছু সচিত্র দেখানো হয়। হৃদয়ে মাটি ও মানুষ ধরনের অনুষ্ঠানে গাছে পোকা লাগা থেকে শুরু করে সব কিছু দেখা যায়। এসব দেখে গ্রাম থেকে আসা শহরবাসী তাদের গাঁওগেরামের স্মৃতি রোমন্থন করে। রাখাল সেজে গরু ও ছাগল নিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার স্মৃতি এখনো অনেককেই রোমাঞ্চিত করে। কারও হয়তো মনে পড়ে যায় যে, বেয়াদব প্রকৃতির একটা ছাগল তার সঙ্গে সহযোগিতা করত না। ছাগলটির এই আচরণকে মিডিয়ায় আগে হয়তো কিছুটা বামপন্থি কিংবা সন্ত্রাসী এ ধরনের শব্দ সুষমায় তুলে ধরা হতো। এখনকার টিভির ভাষ্যকার হয়তো ছাগলটির একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারত না। ছাগলটি নিয়ে বড় ধরনের কোনো সমস্যার সম্ভাবনা দেখা দিলে সেখানে টিভি চ্যানেলের প্রতিনিধি ক্যামেরা নিয়ে স্পট থেকে স্টুডিওতে সরাসরি রিপোর্ট করার জন্য প্রস্তুত থাকত। মিডিয়া কভারেজ পেয়ে ছাগলটি হয়তো হিরো বনে যেত। আজকাল কুকুরের দাঁত মাজা নিয়ে টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনও তো হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় আইলা কোন পথ দিয়ে আইলো আর গেল তা বুঝবার আগেই উপকূলের ঘরবাড়ি লোনা পানিতে একাকার। সয়লাব হয়ে যাওয়া মাছের ঘের, নগেন মাঝির খেয়াঘাট, নইকাটিরনুকো মহাজনের চাতাল, ঘরদোর সবই। সুন্দরবনের কোলঘেঁষে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যে জনপদ তারা বনের আশ্রয়ে-প্রশয়ে বেশ ভালো থাকত ঘূর্ণিঝড়ের সময়। সিডরের বড় ধাক্কা সুন্দরবন বুক পেতে নিল, আইলার আঘাতও তার ওপর দিয়েই গিয়েছে; কিন্তু জলোচ্ছ্বাস ঠেকাবার পুরো ক্ষমতা তার আর ছিল না। নদী দিয়ে সে পানি হঠাৎ অমাবস্যার গোনে (জোয়ারে) লোকালয়ের দুর্বল বেড়িবাঁধ ছাপিয়ে ঘাস ফল-ফসলের মাঠঘাট সব তলিয়ে দিয়ে গেল। লবণাক্ত পানি মুহূর্তের মধ্যে পাখিমারা, পদ্মপুকুর, প্রতাপনগর, কয়রা, বেদকাশী, গাবুরা, পাতাখালীর সব পুকুর ভাসিয়ে নিল। একে প্রকৃতির বিরূপ আচরণ বলে নিজেদের সৃষ্ট সমস্যাকে সবাই পাশ কাটাতে চায়। মরু শহর, অতি আধুনিক বাণিজ্যিক বিনোদনের শহর, কোটিপতি শেখদের শহর দুবাই কীভাবে পিরোজপুরের বলেশ^র নদীর লাহান ল-ভ- করে দিল, দোষটা যেন কারও না, ন্যানো টেকনোলজির, কৃত্রিম মেঘের, এমনকি নিরীহ নিরপরাধ ড্রোনের।  

আসলে এসবের কারণ হিসেবে পরিবেশবিদরা বলছেন ভূপৃষ্ঠ গরম হয়ে ওঠার ফল। বেশি গরম হওয়ার প্রকৃতির মাথা নাকি খারাপ হচ্ছে। হিমালয়ের বরফ গলে নদী দিয়ে পানি গড়াচ্ছে সমুদ্রে, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলেও সমুদ্রের পানি বাড়ছে। আর ছোট-বড় ভূমিকম্পে সমুদ্রের তলদেশ এবড়োখেবড়ো পাহাড় পর্বত উঁচু হয়ে উঠছে। এসব হঠাৎ ফুলে ফেঁপে ওঠা, স্থানচ্যুত হওয়া পানি যাবে কোথায়? সুনামি হয়ে জলোচ্ছ্বাস হয়ে ছুটছে জনবসতির ভূস্থলের দিকে। এসব নিয়ে গবেষণা করেন যেসব বিজ্ঞ ব্যক্তিরা তারা বলছেন সমুদ্র মেখলা ছোট ছোট অনেক দ্বীপ রাষ্ট্র নাকি পানিতে তলিয়ে যাবে। অর্থাৎ পৃথিবীর ৩ ভাগ পানি আর এক ভাগ ভূস্থলের হিসাবে কিছুটা গরমিল হবে। সে না হয় হলো, কিন্তু ঘন জনবসতির কী হবে? সুন্দর বনের বাসিন্দাদের সংগঠন বাবাহকু (বাঘ বানর হরিণ ও কুমির) সমিতির সদস্যরা স্মারকলিপি তৈরি করছে। তাদের অনুযোগ, পৃথিবী উষ্ণ করছে মানুষ আর তার প্রতিশোধের শিকার কেন হবে তারা? তাদের পরিসংখ্যান ব্যুরো গেল শতাব্দীর সত্তর দশক থেকে সেবারের সিডরের সময় পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে সুন্দরবনের গাছ-পাখপাখালি আর বাবারহকু সমিতির সদস্যদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সুন্দরবনকে ভোট দিয়ে এক নম্বর করার যে চেষ্টা-তদ্বির চলছিল  তা কাদের স্বার্থে এ প্রশ্ন প্রায়ই রাখেন বাবাহকুর প্রেসিডিয়াম সদস্য হরিণা হাপান। হরিণা কচিখালীতে তড়িঘড়ি করে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে অনুযোগ করেন সুন্দরবনে বাস করি আমরা, আমরাই সব সৌন্দর্যের আধার, অথচ আমাদের সঙ্গে আলাপ না করে সংলাপে না বসে, মতামত না নিয়ে একতরফাভাবে মানুষ্য জাতির পক্ষে পর্যটনের চেয়ারম্যান বিশ্বব্যাপী প্রচারণা চালান। হরিণা প্রশ্ন রাখেন, আমরাই যদি না বাঁচি তাহলে কী দেখতে আসবেন পর্যটকরা? এদিকে সুন্দরী, গরান, বাইন ও কেওড়া গাছের সংগঠন ‘সুগবাকে’ এক বিবৃতিতে তাদের মৃত্যুদশা যথাযথ পরিদর্শন ও প্রতিকার প্রার্থনা করেছে। সুগবাকে মনে করে তাদের রক্ষণাবেক্ষণের নামে গণি মিয়ারা অর্থ আত্মসাৎ করে বালিশে ঢুকিয়েছে। সিডরে মরে পড়ে থাকলেও কেউ তাদের সৎকারে এগিয়ে আসেনি।

ইদানীং আবদুর পুরের আদনান সাহেবের মাথায় আবার ঢুকল আরেক দুশ্চিন্তার পোকা। এমনিতে তার অবসর মাথায় নানান ভাবনা-দুর্ভাবনার পোকারা কিলবিল করছে। তিনি এসবের থেকে মুক্তি যেমন পাচ্ছেন না, তেমনি তাদের কাছ থেকে গঠনমূলক কোনো কাজের ইঙ্গিত ও প্রেরণাও পাচ্ছেন না। আদনান সাহেব অনেক আগে একটা মহাজন বাক্য শুনেছিলেন,  ‘ওফষব ইৎধরহ রং উবারষ’ং ডড়ৎশংযড়ঢ়’. তার বয়সে নানান দুর্ভাবনার অনুপ্রবেশের ফলে তার মাথা কি শয়তানের কর্মশালা হয়ে গেল নাকি? তার ছেলেবেলার বন্ধু রমেন, পরে সাইকোলজিস্ট হয়েছে, শুনেছে। রমেন বলেছিল অলস মাথা শয়তানের কর্মশালা হয় যৌবন ও মাঝ বয়সে গো। কেননা সে সময় ব্রেন থাকার কথা সতেজ, সজিব ও সক্রিয়। এ সময় মাথা যদি অলস হয়ে পড়ে তখন শয়তানের দুষ্টু বুদ্ধি খেলার জন্য সেটা তো ভাড়া নেবেই। তাকে ভালো গঠনমূলক ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনা থেকে যত বেশি দূরে রাখতে পারবে শয়তানের তত লাভ। শয়তান এ জাতীয় পটেনশিয়াল ব্রেনকে টার্গেট করে। ‘আজকাল তুমি দেখবা অনেক ভালো ছাত্ররা হঠাৎ মাথা বিগড়িয়ে ভিন্ন পথে হাটছে’ রমেন বলে চলে গেল। আদনান সাহেব তখন সচল সতেজ যুবক। তার কানে কথাগুলো ধরেছিল তখন। কিন্তু এখন? এখন তো আর তিনি ভেঙেচুরে কিছু করতে পারেন না। তার এখন বিপথে যাওয়ার বয়স নেই। সুতরাং এখন তার মাথায় যেসব ভাবনা -চিন্তারা পান-তামাক-বিড়ি খেতে আসছে তা তো তাকে মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কিছু না।

ঘটনাটা পাঁচ দিন আগের। ঢাকা থেকে বড় ছেলে আহমদ কবীর জানিয়েছেন, তার বড় মেয়ে বিপাশা বিদেশে পড়তে গিয়ে আর দেশে ফিরতে চাচ্ছে না। সেখানেই বিয়েশাদি করে থাকতে চায়। অত্যন্ত মেধাবী বিপাশা স্নাতকে শীর্ষস্থান অধিকার করেছিল। তারপর কিছুকাল এখানে-সেখানে বড় ও মাঝারি চাকরি করে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে মার্কিন মুলুকে পাড়ি জমায়। তার উচ্চশিক্ষার পেছনে দেশের বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বৃত্তি কর্মসূচির আওতায় অর্থ জোগানও দেয়। প্রত্যাশা ছিল, উচ্চশিক্ষা লাভ করে দেশে ফিরে সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও শিক্ষকতা করবে, দেশের সমৃদ্ধি সাধনে অবদান রাখবে। সবাই দেশ ছেড়ে চলে গেলে চলবে কেন? আদনান সাহেব ভারত বিভাগ এভাবে হবে ভাবেননি। তাকে কলকাতার বাড়ি, হুগলির কোম্পানি আর বর্ধমানের বিশাল জমি ফেলে এভাবে পূর্ববঙ্গে আসতে হবে ভাবতে পারেননি। যে মাটিতে বিপাশার নাড়ি পোঁতা, যে প্রতিবেশীদের আদর-স্নেহ পেয়ে তার বড় হওয়া, সেই মাটির টানে সেসব পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব-সহপাঠীদের কাছে ফিরে এসে তার মেধা ও দক্ষতালব্ধ জ্ঞান বিতরণ করা কর্তব্য নয় কি? আদনান সাহেব মানুষের এই বীড়ফঁং হওয়ার প্রবণতায় দুঃখ পান। মানুষ অনবরত জায়গা বদল করছে, চলে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই এক জায়গায় থাকতে চাচ্ছে না। শৈলকুপায় যাদের কাছ থেকে জমি বিনিময় করে পেয়েছেন তারা এ এলাকায় যথেষ্ট অবস্থাপন্ন ও বিশেষ প্রভাবশালী ছিলেন, কিন্তু দেশ ভাগের কারণে তারাও এখন রিফিউজি তার বর্ধমানের জমিতে। আদনান সাহেব এখানে, আর তারা সেখানে। এটা তো গেল রাজনৈতিক নির্বুদ্ধিতার ও ভেদ স্বার্থবাদিতার ফলাফল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও এখন এক দেশের মানুষ আরেক দেশে পাড়ি জমাচ্ছে স্রেফ অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে নিরাপত্তা লাভের আশায়। সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। আদনান সাহেবের মন খারাপ সে কারণে।

কলম্বাস সাহেব জাপানে যেতে চেয়েছিলেন। পথ ভুলে পৌঁছালেন নয়া জঙ্গলে, মার্কিন মুলুকে। তিনি সেখানে না পৌঁছালে আমেরিকার আমাজান মিসিসিপি অববাহিকার মানুষেরা এশিয়া-ইউরোপীয় সভ্যতার সহবত পেত না জানি না তারা এতদিন কী পর্যায়ে পৌঁছাত! আদনান সাহেবের মাথায় হঠাৎ এ প্রশ্নও জাগে আচ্ছা ব্রিটিশরা যদি ভারতবর্ষে না আসত তাহলে আজকের ভারতবর্ষ আজকের অবস্থায় পৌঁছাত কিনা। পাল, গুপ্ত, সেন সাম্রাজ্যের দিনকাল পাল্টিয়ে গেল সমরখন্দ থেকে আসা মোগলদের মোড়লিপনায়। ভারতবর্ষ এতদিন মোগলদের শাসনাধীনে থাকলে রাস্তাঘাট, রেললাইন, স্টিমার, ইউনিভার্সিটি-কলেজ এসব কি হতো না? শের শাহর আমলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড তো হয়েছিল,  টোল, মাদ্রাসা এসব তো ছিল। ইংরেজ আসাতে বিলেতি জিনিস এসেছে, বিদেশি ভাষা ও শিক্ষা এসেছে, বিদেশি বেলেল্লাপনা এসে ঢুকেছে হুড়মুড় করে নতুন; আমলা মুৎসুদ্দির নতুন নগরায়ণ হয়েছে। ভারতবর্ষে ইউরোপের জ্ঞানবিজ্ঞান যেমন এসেছে, তেমনি ধর্ম-কর্ম জীবনযাপন এসব ব্যাপারে নতুন নতুন ভাবধারাও এসে ঘাঁটি গেড়েছে এখানে। দোষ-গুণ সহজাত প্রক্রিয়ায় আসে, আত্মশ্লাঘা ও দোষারোপ করে লাভ নেই । এতে প্রকৃতির প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায় এবং এক সময় প্রকৃতিই প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হয়। অন্যায় করে একজন আর শাস্তিভোগ করে শতজন।

লেখক: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

mazid.muhammad@gmail.com