আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বিশ্বমানের এবং স্মার্ট নাগরিক তৈরিতে শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে নতুন কারিকুলাম এনেছে সরকার। নতুন এই শিক্ষাক্রমে জোর দেওয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের ওপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে সব ক্লাসে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম বছর নতুন এই কারিকুলাম বুঝতে একটু সময় লাগলেও দ্বিতীয় বছরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সবার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের সব উপজেলায় শিক্ষকদের প্রথমে পাঁচ দিন এবং সাত দিন মোট বারো দিনের প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ হওয়ার কারণে।
একজন অভিভাবক হিসেবে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহযোগিতা করতে হবে কারণ অভিভাবকদের সচেতন ও সঠিক দিকনির্দেশনার ওপরে সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। সচেতন অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেন এবং তাদের সঙ্গে খাবার টেবিলে বসে খাবার খেতে খেতে একসঙ্গে গল্প করেন, বিদ্যালয়সহ পরিবারের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এর মাধ্যমে অভিভাবক ও সন্তানদের মধ্যে একটি সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে, যার কারণে সন্তানদের বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তারা পড়াশোনার পাশাপাশি নৃত্য, আবৃত্তি ও সংগীত ইত্যাদি বিষয়ে সন্তানদের পারদর্শী করে তোলার জন্য প্রতিযোগিতায় লেগে থাকেন। সুপরিকল্পিতভাবে তারা তাদের সন্তানদের মেধা, মতামত ও দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে চান যেটা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সহায়তা করে। সচেতন অভিভাবকরা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখেন সন্তানের সামনে শিক্ষক বা অন্য কারও সমালোচনা করেন না। এবং শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে সন্তানদের ঘাটতি জেনে নিয়ে তা পূরণ করতে চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে অসচেতন অভিভাবকদের সঙ্গে সন্তানদের কিছুটা দূরত্ব থাকে কেননা তারা নানা পেশার কাজে জড়িত থাকেন, যার কারণে সন্তানদের দিকে খেয়াল কম রাখেন। সন্তানরা খারাপ মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করে কিনা তার খোঁজখবর তেমন একটা রাখেন না। যার কারণে পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে না, এর ফলে সন্তানদের মেধা, মতামত ও দক্ষতার বিকাশ ঘটতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। অসচেতন পরিবারের সন্তানরা তাদের মতামত দিয়ে প্রয়োজন মতো সুযোগ-সুবিধা নিতে পারে না। পরিবারের গুরুজনরা যে সিদ্ধান্ত দেন তা মেনে নেয়। পরিবারের বড় এবং ছোট সদস্যের মধ্যে অনেক দূরত্ব থাকে, যার কারণে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও অসচেতনতার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও একটি পার্থক্য সৃষ্টি হয়। আমাদের সন্তানকে যদি একজন সুনাগরিক হিসেবে দেখতে চাইলে সচেতন অভিভাবকদের মতো ভূমিকা পালন করতে হবে। অভিভাবকদের দেখতে হবে সন্তান নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকে কিনা। সন্তানকে সময় দিতে হবে এবং সন্তানের সঙ্গে খেলাধুলায় অংশ নিতে হবে। নিজেদের পাশাপাশি সন্তানকে দিয়ে বাসার ছোট ছোট কাজগুলো করার অভ্যস্ত করতে হবে। তাদের ভালো কাজের প্রশংসা ও মন্দ কাজ পরিহার করতে বলতে হবে। সন্তানকে সততা, নৈতিকতা এবং বড়দের সম্মান করতে শেখাতে হবে। সত্যকে গ্রহণ করে মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারলেই আমাদের সন্তান একজন সুনাগরিক হিসেবে সমাজ, দেশ তথা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। নতুন কারিকুলামের লক্ষ্যও এটিই।
আব্দুল কাদের ফকির
থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, মিরপুর, ঢাকা