সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ভোট করে আগেও জিতেছিলেন গণেন্দ্র চন্দ্র সরকার। বিএনপি ভোট বর্জন করায় এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক এ সভাপতি। গত শনিবার তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তৃণমূলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা কেন্দ্রে বসে নির্দেশনা দেন। বাস্তবে মাঠের খবর রাখেন না।’ ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে রয়েছেন জানিয়ে গণেন্দ্র বলছেন, বহিষ্কারের এ হঠকারী সিদ্ধান্ত তিনি মানেন না।
শুধু গণেন্দ্র চন্দ্রই নন, মাঠপর্যায়ের আরও অনেক নেতাই বহিষ্কার সত্ত্বেও নির্বাচনে আছেন। তারা বলছেন, টানা ভোট বর্জনে মাঠপর্যায়ে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বহিষ্কৃত হয়েও নির্বাচনের মাঠে আছেন তারা।
এর আগেও বিএনপি জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের ভোট বর্জনের ঘোষণা দিলেও দলের মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাই মানেননি। তাই বহিষ্কারের পথে হেঁটেছে দল। কিন্তু দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে যখন কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল বিএনপি, তখন বহিষ্কৃত অনেককে দলে ফিরিয়ে আনা হয়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ সময়ে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছিল। তবে বিভিন্ন সময় দুই হাজার মতো নেতাকর্মীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। গত বছর সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় প্রায় ২৫০ নেতাকে আবার দলে ফিরিয়ে আনা হয়।
সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এবারের উপজেলা নির্বাচনও বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে অনেক নেতা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। ৮ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া উপজেলা নির্বাচনের চার ধাপের মধ্যে এ পর্যন্ত তিন ধাপের মনোনয়নপত্র জমা হয়েছে। এর মধ্যে দুই ধাপের প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে।
এ দুই ধাপে উপজেলা পরিষদের তিন পদে প্রার্থী হওয়ায় ১৩৩ জনকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। দলের সিদ্ধান্ত মেনে সরে দাঁড়িয়েছেন প্রথম ধাপে ১৬ ও দ্বিতীয় ধাপে ১২ জন।
উপজেলা নির্বাচনের তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপেও বিএনপি নেতাদের অনেকে প্রার্থী হতে মাঠে তৎপর রয়েছেন। ফলে উপজেলা নির্বাচন বর্জনের অবস্থানে থাকা দলটির বহিষ্কারের সংখ্যা দীর্ঘ হবে বলে নেতাদের ধারণা। তাদের অনুমান, উপজেলা নির্বাচনের শেষ ধাপ পর্যন্ত বহিষ্কারের আড়াইশ থেকে তিনশতে গিয়ে ঠেকতে পারে। যদিও দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় বহিষ্কারের এ সংখ্যাকে গুরুত্ব দিতে চাইছে না বিএনপির নেতৃত্ব।
বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, এসব প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরাতে প্রথমে জেলা, পরে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজ হয়নি। পরে কেন্দ্র থেকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব থেকে যুগ্ম মহাসচিব পর্যায়ের নেতারা তাদের বোঝানোর দায়িত্ব নেন। এতে খুব কমসংখ্যক প্রার্থীকে বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে ফেরানো গেছে। কিন্তু অধিকাংশই দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে নির্বাচনে থেকে যায়। ফলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু সেটিও আমলে নেননি এসব প্রার্থী। এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও অস্বস্তি রয়েছে বলে বিএনপিতে আলোচনা রয়েছে।
তৃণমূল নিষ্ক্রিয় নেতাদের সক্রিয় করতে গত বছর উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপি। ওই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি খুলনা বিভাগ দিয়ে শুরু করে ১৬ মার্চ ময়মনসিংহ বিভাগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে ১০ দিনের মতবিনিময় সভা শেষ করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ওই বৈঠকে বিএনপির সমর্থনে বিভিন্ন সময়ে বিজয়ী স্থানীয় জনপ্রতিনিধি অর্থাৎ সাবেক ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলরদের প্রায় চার হাজার জন অংশ নিয়েছিলেন। জনপ্রতিনিধিদের কাছে স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক পরিস্থিতি জানতে চাওয়ার পাশাপাশি তারেক রহমান নির্দেশনামূলক বক্তব্য রেখেছিলেন।
উপজেলা নির্বাচনে থাকা বিএনপির অন্তত ১০ নেতার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তারা বলছেন, এভাবে টানা বর্জন করতে থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতি করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কেউ বলেছেন, তারা তৃণমূলের মানুষের চাপে ভোটে দাঁড়িয়েছেন। আবার একাধিক প্রার্থী আছেন, যারা আগে থেকেই জনপ্রতিনিধি। তারা এখন দূরে সরে থাকতে নারাজ।
সুনামগঞ্জ বিশ্বম্ভরপর উপজেলা বিএনপির সদস্য ও সদ্য বহিষ্কৃত হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে ৩০ বছর ধরে জড়িত। আমি বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলাম। এতদিন নির্বাচন করিনি দলীয় চাপে। কিন্তু এবার কর্মীরা চাপ দিচ্ছেন। সে কারণেই মূলত নির্বাচনে এসেছি। কর্মীদের শক্তিতে দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করছি।’ একই জেলার ধর্মপাশা উপজেলার সদ্য বহিষ্কৃত বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী কামাল বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে সঙ্গে দলীয় কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যখন তফসিল হয়েছে তখন সুনির্দিষ্টভাবে বুঝতে পারিনি দল নির্বাচন করবে না। এখন মাঠে নেমে গেছি, গণসংযোগ শুরু করেছি, এখন বলে নির্বাচন করবে না। এখানে এলাকার মানুষ ভোট দেয়। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে কী করা যায় তা পরে ভেবে দেখব।’
বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. হালিম বলেন, ‘তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মী ও জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি।’
কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনা জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও বরগুনা সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. সানাউল্লাহ সানি বলেন, ‘কেন্দ্রে বসে যারা নির্দেশনা দেন তারা তৃণমূলের পরিস্থিতি জানেন না। আমাদের যে আন্দোলন একটি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, তার জন্যও জনগণের সম্পৃক্ততা দরকার। জনগণ ছাড়া কোনো আন্দোলনই সফল করা সম্ভব নয়। তাই জনগণের সমর্থন আদায়ে আমি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। নির্বাচনে অংশ না নিলে মানুষগুলোর সমর্থন কোথায় পেতাম?’
মানিকগঞ্জ জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘তৃণমূলের রাজনীতি করি। বারবার নির্বাচন বর্জন করলে দল ছোট হয়ে যায়। বিএনপির সমর্থক ভোটাররা নির্বাচনের সময় বিএনপির প্রার্থী না পেলে, আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে সমর্থন দিলে, তাদের আর বিএনপিতে ফেরানো যায় না। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে আমার বিএনপির কর্মীরা মার খেয়েছে ও মামলার আসামি হয়েছে। আমি নির্বাচিত হতে পারলে তাদের ছাতা হতে পারব।’
যদিও কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, ভোটে থাকা তৃণমূল নেতাদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ‘যোগাযোগ’ রয়েছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। ভোটে থাকা নেতাদের কেউ কেউ আবার অনেক দিন ধরেই দলে নিষ্ক্রিয়। নিজেকে নতুন করে তুলে ধরার সুযোগ কাজে লাগাতে ভোটের মাঠে চেষ্টা করছেন। আবার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় বাইরে থাকা, আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে পড়ায় তৃণমূল নেতারা আশাভঙ্গ হয়ে নির্বাচন করছেন বলেও তথ্য রয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ বলেন, ‘যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, অনেকেই অনেক দিন ধরে দলের কর্মকান্ডে নেই। নিজেকে তুলে ধরতে সুযোগ পেয়েছেন বলে প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচন জমিয়ে রাখতে সরকারের ফাঁদে পড়ে অনেকে প্রার্থী হয়েছেন। বাকিদের কয়েকজন বর্তমানে বা আগে জনপ্রতিনিধি ছিলেন। তাদের সম্ভাবনা থাকায় তারা সুযোগ নিতে চাইছেন। কিন্তু দল যেহেতু নির্বাচনে নেই, দলের কর্মী হিসেবে তারা সেটি না মানলে বহিষ্কার হচ্ছেন, হবেন।’
গণহারে দল থেকে বহিষ্কার, তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, দলকে আরও দুর্বল করবে কি না, সে আলোচনা রয়েছে বিএনপিতে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়, বহিষ্কারের সংখ্যা যতই হোক কঠোর অবস্থানেই থাকবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব।
স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ এক নেতা বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে বহিষ্কার করা ছাড়া বিকল্প নেই। কিছু নেতা বহিষ্কারের ফলে সাংগঠনিক ভিত্তি কিছুটা দুর্বল হতে পারে, যা দলকে উপেক্ষা করতে হচ্ছে সচেতনভাবে।
জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘এ সরকারের সময় গাজীপুরে মান্নান সাহেব (প্রয়াত), রাজশাহীতে বুলবুলসহ অনেকেই তো মেয়র হয়েছেন। সরকার কি তাদের চেয়ারে বসতে দিয়েছে। হয় সরকারের সঙ্গে চলতে হবে, নয় সাসপেন্ড হবে, মামলা হবে।’