একদিনের বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকা গতকাল রবিবার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সকাল থেকে বেশিরভাগ প্রধান সড়ক ও অলিগলি পানির নিচে তলিয়ে যায়। প্রচণ্ড জলাবদ্ধতা ও যানজটে ভয়াবহ দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। অনেক এলাকায় রাতেও সড়কে পানি দেখা গেছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কর্মীরা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করলেও তা জনদুর্ভোগ লাঘবে খুব একটা কার্যকর হয়নি।
আবহাওয়া অফিস গতকাল সন্ধ্যায় জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে ঢাকায় একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক জানান, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং পশ্চিমা লঘুচাপের সম্মিলিত প্রভাবে অল্প সময়ের মধ্যে এত ভারী বর্ষণ হয়েছে।
প্রবল বৃষ্টিতে সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে হাঁটুপানি জমে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কোমর পানির কারণে বন্ধ হয়ে যায় নিউমার্কেট। শহরের অলিগলি ও মূল সড়কের পাশের অনেক দোকানপাট ও বিপণিবিতানও বন্ধ ছিল। জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, বাস, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহন রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। রাজধানীর বিজয় সরণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের সড়ক, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ধানম-ি, মিরপুরের কাজীপাড়া, কালশী, সেগুনবাগিচা, আরামবাগ, কাকরাইল, নয়াপল্টন, বিজয়নগর, রাজারবাগ, মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগর, উত্তরা, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, নিউমার্কেট ও সচিবালয়সহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়।
অন্যান্য সময়ের তুলনায় গতকালের জলাবদ্ধতা ছিল দীর্ঘস্থায়ী। কোথাও কোথাও হাঁটুপানি থাকায় যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় ফুটপাত তলিয়ে যাওয়ায় পথচারীরা প্রধান সড়ক দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হন। সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও ধীরগতির কারণে বিভিন্ন অংশে যানজট ছিল তীব্র। গন্তব্যে যেতে বিকল্প যানবাহনে বাড়তি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে নগরবাসীকে।
রামপুরা বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষারত বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাসে উঠতে পারেননি। যে দুটি বাস এসেছে, তাতে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। অটোরিকশাও বেশি ভাড়া হাঁকাচ্ছে। বাংলামোটর এলাকায় হাফসাতুল ইসলাম নামে একজন বলেন, ‘অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও বাসে চড়তে পারিনি। অন্য যানবাহন যে পরিমাণ ভাড়া চাইছে সেটা দেওয়া আমার জন্য কষ্টকর।’
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী র্যাম্প এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে প্রচণ্ড দুর্ভোগ তৈরি হয়। র্যাম্পের নিচে পানি জমায় যানবাহনকে গতি কমিয়ে চলতে হয়। এর প্রভাব পড়ে আশপাশের সড়কেও। সামাজিক মাধ্যমে এক সতর্কবার্তায় গুলশান ট্রাফিক বিভাগ জানায়, টানা বর্ষণের কারণে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী র্যাম্পের নিচের অংশ, খিলক্ষেত এবং মহানগরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়েছে এবং কোথাও কোথাও দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে নগরবাসীকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার অনুরোধও জানায় গুলশান ট্রাফিক বিভাগ।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নীলক্ষেতসংলগ্ন আজিমপুরে ইডেন মহিলা কলেজের ২ নম্বর গেটের বিপরীত পাশে একটি বড় গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুস সালাম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে কর্মীদের নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে। দুপুর ১টার দিকে গাছটি অপসারণ করার পর সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
তবে বৃষ্টির মাঝেও মেট্রোরেলের যোগাযোগ ছিল স্বাভাবিক। সড়কের দুর্দশার কারণে যাত্রীর প্রচণ্ড চাপ লক্ষ করা গেছে। সচিবালয় ও মতিঝিল স্টেশনে সারাদিন ছিল উপচেপড়া যাত্রীর চাপ। উত্তরা উত্তর, টিএসসিসহ বিভিন্ন স্টেশনের নিচে পানি জমে থাকায় মেট্রো যাত্রীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। মিরপুরের মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের পূর্বনির্ধারিত অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা, দশম শ্রেণির প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা এবং একাদশ শ্রেণির ব্যবহারিক পরীক্ষা স্থগিত করার তথ্য পাওয়া গেছে। ধানমণ্ডির তানুজা আকবর নামের একজন অভিভাবক জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধানমণ্ডির কামরুন্নেছা স্কুলের অর্ধবার্ষিক এবং প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
সচিবালয়ে জলাবদ্ধতা : প্রবল বৃষ্টিতে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়েও তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। বিকেলেও বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকতে দেখা যায়। সরেজমিন দেখা গেছে, সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের সামনের সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া ৭ নম্বর ভবনের পশ্চিম পাশের সড়ক, তথ্য অধিদপ্তরের সামনের সড়ক, ৫ নম্বর ভবনের সামনের সড়ক, ৩ ও ৫ নম্বর ভবনের মাঝখানের সড়ক এবং ৭ নম্বর ভবন পর্যন্ত এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। সচিবালয়ের প্রধান ফটকের সামনেও জলজট দেখা গেছে। একই অবস্থা ছিল প্রেস ক্লাবমুখী গেটের সামনে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন কাজে আসা সেবাপ্রার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ক্ষোভ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সচিবালয়ের মতো জায়গায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকলে দেশের বাকি এলাকার কী অবস্থা হবে? যারা দায়িত্বে আছে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।’ একজন কর্মকর্তার গাড়িচালক জানান, পানির কারণে সকাল থেকে অনেকের গাড়ি বিকল হয়ে গেছে। হেঁটেও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিউমার্কেট বন্ধ : বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে নিউমার্কেটে দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) নিউমার্কেটে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেয়। নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির অফিস সেক্রেটারি ফিরোজ উল ইসলাম জানান, টানা বর্ষণে প্রচণ্ড জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সকাল থেকে দোকানপাট খোলা হয়নি। ক্রেতারাও মার্কেটে আসেননি। পরিস্থিতি বুঝে সোমবার দোকানপাট খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সিটি করপোরেশন কর্মীদের দিনভর ব্যস্ততা : জলাবদ্ধতা নিরসনে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মীদের পাশাপাশি মাঠে নামেন প্রশাসকরাও। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জানায়, জলজট দ্রুত নিরসনে তারা কমলাপুরের দুটি এবং ধোলাইখালের একটি উচ্চ ক্ষমতার পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ ছাড়া রাস্তায় পানি নিষ্কাশনের মুখগুলো কার্যকর রাখতে ডিএসসিসির ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম ভোর থেকে কাজ করেছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, ‘টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট হলেও আমাদের কর্মীরা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে ভোর থেকে মাঠে রয়েছে। নগরজীবন স্বাভাবিক করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।’
গুলশান, বনানী, মহাখালী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকার রাস্তায় জমে থাকা পানি অপসারণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সচল রাখার বিষয়টি তদারক করেন ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘ডিএনসিসির পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে দ্রুত পানি অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি মোতায়েন করা হয়েছে। ওয়াটার পাম্পগুলো সচল রাখা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।’
তিনি জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত খাল ও নালা পরিষ্কার এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আকস্মিক অতিভারী বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।