চলতি বিশ্বকাপের ট্র্যাকে তিনি ছিলেন যেন এক অপ্রতিরোধ্য গতিময় ট্রেন। প্রতি ম্যাচেই প্রতিপক্ষের জালে গোলবন্যা, আর মাঠজুড়ে হালান্ড-বন্দনা। ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর নরওয়ের এই ‘ভাইকিং’ সেনানিকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। বাংলাদেশের অলিগলি থেকে ফুটবল বিশ্বের প্রতিটি কোণায় জল্পনা ছিল ইংল্যান্ডকে হয়তো একইভাবে গুঁড়িয়ে দেবেন আর্লিং হালান্ড। কিন্তু ফুটবলের বিধাতা বোধহয় ভিন্ন কিছু লিখে রেখেছিলেন। মায়ামি স্টেডিয়ামে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মঝে যে বড় এক দেয়াল তৈরি হলো, তাতে কেবলই এক রাশ দীর্ঘশ্বাস।
ম্যাচ শুরুর আগে হালান্ড অবশ্য বেশ নির্ভার ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে হাসিমুখেই বলেছিলেন, ‘এই ম্যাচে ইংল্যান্ডই পরিষ্কার ফেভারিট, তাই সব চাপ তাদের ওপরই থাকা উচিত।’ কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই ‘ফেভারিট’ ইংল্যান্ডের চাপের কাছেই যেন নুইয়ে পড়লেন নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন। এই ম্যাচের মূল আকর্ষণ ছিলেন জুড বেলিংহাম। তার একক নৈপুণ্যেই ইংল্যান্ড ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নেয়। টানা দুই ম্যাচে জোড়া গোল করে বেলিংহাম প্রমাণ করলেনথ কেন তিনি বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। এদিকে হালান্ড দীর্ঘ ৬৩৬ দিন পর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোলহীন থাকলেন। এবারের বিশ্বকাপে ৭টি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ছিলেন বেশ ভালোভাবেই। তবে আপাতত তাকে বিদায় নিতে হলো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার স্মৃতি নিয়েই।
দ্বিতীয় হাফে একসময় যখন তাকে দেখাচ্ছিল ছন্নছাড়া, তখন শঙ্কা জাগে হালান্ড কি তবে ইনজুরিতে ভুগছেন? অতিরিক্ত সময়ে কোচ স্টালে সোলবাকেন যখন তাকে তুলে নিলেন, তখন পুরো বিশ্ব হয়েছে অবাক। ম্যাচ শেষে এই বদলি সিদ্ধান্ত নিয়ে কোচ স্টলে সোলবাকেন খোলাখুলি ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘তাকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি নেওয়া খুব কঠিন ছিল না, কারণ সে (শারীরিকভাবে) একদম শেষ হয়ে গিয়েছিল। হয়তো ১০ মিনিট আগেই আমার তাকে তুলে নেওয়া উচিত ছিল। সে এবারের বিশ্বকাপে একের পর এক ম্যাচে তার পুরো শক্তি ও সামর্থ্য উজাড় করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে সে ‘ডেড লেগ’র (পেশিতে আঘাত বা টান) শিকার হয়েছিল। সেই আঘাতের সাথে প্রচণ্ড ক্লান্তি যুক্ত হওয়ায় তার আর দৌড়ানোর মতো অবস্থায় ছিল না; সে তার সাধ্যমতো সবকিছুই করেছে।’
মাঠ থেকে তার বেরিয়ে আসার দৃশ্যটি যেন নরওয়ের বিশ্বকাপের স্বপ্নভঙ্গের প্রতিচ্ছবি। গোল করতে না পারলেও মাঠের লড়াইয়ে হালান্ডের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। তার এক ধাক্কায় বাতিল হওয়া গোলটিই হয়তো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারত। ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত হালান্ড বলেন, ‘আমরা নরওয়েকে বিশ্বম্যাপে চিনিয়ে দিয়েছি। এই বিশ্বকাপ আমাদের প্রজন্মকে বদলে দিয়েছে।’
২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে আসা নরওয়ের জন্য কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানো কম বড় সাফল্য নয়। হালান্ডের সেই গোল করার হাহাকার কিংবা মাঠের লড়াইয়ে হার মানা সব মিলিয়ে এই আসরটি তাকে দিয়েছে এক নতুন অভিজ্ঞতার স্বাদ। জয়ী বেলিংহামের সঙ্গে পুরনো বন্ধুর উষ্ণ আলিঙ্গন বলে গেল, হারলেও হালান্ড হারেননি। নরওয়ের ফুটবলে এক নতুন সূর্যের যে উদয় তিনি করেছেন, তার আভা হয়তো আগামী ইউরো বা পরবর্তী বিশ্বকাপে আরও উজ্জ্বল হয়ে দেখা দেবে। আপাতত আটলান্টার রাত থেকে বিদায় নিলেন এক ক্লান্ত, কিন্তু স্বপ্ন দেখা এক নায়ক।