আর্জেন্টিনা কখনোই সহজ পথে জেতে না। বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে তাদের পারফরম্যান্স দিন দিন যতই মøান মনে হোক না কেন, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা কিন্তু এখনো টিকে আছে। শনিবার কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়াম শেষ পর্যন্ত বুয়েনস আইরেসের রূপ নিয়েছিল; গ্যালারির উন্মাদনা দেখে মনে হচ্ছিল ম্যাচটি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নয়, আর্জেন্টিনার নিজেদের ঘরেই হচ্ছে। তবে মাঠের সেই বুনো উদ্যাপন আর চোখ ধাঁধানো গোলের আড়ালে লুকিয়ে ছিল দলটির এক চরম হতাশাজনক ফুটবল।
অবশ্য আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের তা নিয়ে এখন ভেবেই বা কী হবে। কারণ, সেমিফাইনালে তাদের সামনে অপেক্ষা করছে ইংল্যান্ডের সঙ্গে এক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার মহারণ। তার ওপর মন ভালো করার জন্য তাদের কাছে রয়েছে হুলিয়ান আলভারেজের ১১২ মিনিটের সেই অবিশ্বাস্য গোল। ঠিক যখন মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনা বড্ড বেশি লিওনেল মেসি-নির্ভর হয়ে পড়েছে, তখনই ত্রাতা হয়ে উঠলেন অন্য কেউ। এরপর ১২১ মিনিটে লাউতারো মার্তিনেজের গোলটি আর্জেন্টিনার এই কষ্টার্জিত জয়কে কাগজে-কলমে আরও বড় ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলে।
এই ম্যাচটি মূলত ছিল দুই স্ট্রাইকারকে ঘিরে। আলভারেজ চলতি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি করে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সেমিফাইনালে তুললেন। আর অন্যদিকে ব্রেল এমবোলো হয়তো সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথমবার সেমিফাইনালে যাওয়ার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিলেন। ম্যাচটি যখন ১-১ সমতায় ছিল, তখন সুইসরাই ভালো খেলছিল। কিন্তু ভিএআর-এর নাটকীয়তার পর ডাইভিংয়ের অপরাধে এমবোলো লাল কার্ড দেখলে সুইসরা রক্ষণাত্মক হতে বাধ্য হয়। আর্জেন্টিনাকে পেনাল্টি শুটআউট পর্যন্ত আটকে রাখার সব রকম বন্দোবস্ত করেই ফেলেছিল তারা, ঠিক তখনই আলভারেজের ওই বিধ্বংসী গোল ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা আবারও তাদের লড়াকু মানসিকতার প্রমাণ দিল, তবে সেই সঙ্গে দলের বেশ কিছু বড় ত্রুটিও স্পষ্ট হয়ে উঠল। নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার পথটা বেশ সহজই মনে হয়েছিল কেপ ভার্দে, মিসর এবং সুইজারল্যান্ড কিন্তু তারা প্রতিটি ম্যাচকেই যেন একেকটি বাধা-বিপত্তিতে ভরা কঠিন পথ বানিয়ে ছেড়েছে। দ্বিতীয় ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়াল তাদের। হজম করেছে ৫টি গোল এবং প্রতিটি ধাপেই তারা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছিল। তবে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে কীভাবে ম্যাচ জিততে হয়, তা এই দলটির ভালো করেই জানা।
কোচ লিওনেল স্কালোনি অন্তত এখানে নিজের কৌশলের কৃতিত্ব নিতে পারেন। তৃতীয় গোলটিতে তার দুই বদলি খেলোয়াড়ের অবদান ছিল থিয়াগো আলমাদার শট সুইস ডিফেন্সে আটকে যাওয়ার পর ফিরতি বলে গোল করেন লাউতারো। আলমাদা বদলি হিসেবে নেমে দারুণ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, এর আগে ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া তার একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। তা সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা সৃজনশীলতার চরম অভাবে ভুগছিল, বিশেষ করে উইংগুলোতে কোনো গতি বা আক্রমণের ধার ছিল না। মেসি যখন নিষ্প্রভ থাকেন তখন পুরো আর্জেন্টিনাকে বড্ড সাধারণ দেখায়। বিশ্বকাপে টানা ৯ ম্যাচে গোল করার যে রেকর্ড মেসির ছিল, তাও এই ম্যাচে এসে থেমে গেল। মাঠের খেলায় দীর্ঘ সময় আর্জেন্টিনাকে কেবল ওয়ান-ম্যান আর্মি মনে হচ্ছিল, আর সেই ‘একমাত্র মানুষ’টির দিনটিও চেনা ছন্দে ছিল না শনিবারের ম্যাচে। শেষ দিকে তিনি কিছুটা গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠেন, একবার গ্রেগর কোবেলকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হন এবং নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে তার একটি শট পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। তবে ম্যাচের সিংহভাগ সময়ই তাকে মাঠে হেঁটে বেড়াতে দেখা গেছে, তখন পুরো দলকে দিশাহীন মনে হচ্ছিল।
টুর্নামেন্টে দুটি পেনাল্টি পেয়ে গোল করতে ব্যর্থ হওয়ার মেসি কর্নার নিয়ে গোল করানোতে বেশ সফল। তাকে যে ডি-বক্সে ঢুকতে দেবে না সুইসরা, তা প্রথম ১০ মিনিটেই বুঝে ফেলেন পোড় খাওয়া এই ফুটবলার’...
১১ মিনিটে তার নিখুঁত কর্নার থেকে সুইস ডিফেন্ডার জিবরিল সো’র ওপর দিয়ে দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়ান আলেকিস ম্যাক অ্যালিস্টার। গোলটি বড্ড সহজে চলে এসেছিল। আর সম্ভবত এই সহজ গোলটিই সুইজারল্যান্ডকে আর্জেন্টিনার শক্তি সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা দিয়েছিল। এরপর সুইসরা এতটাই দুর্দান্ত রক্ষণভাগ গড়ে তোলে যে, প্রথমার্ধের পর আর্জেন্টিনার লক্ষ্যে থাকা পরবর্তী শটটি আসে ম্যাচের ৯৯ মিনিটে, লিসান্দ্রো মার্তিনেজের একটি অ্যাক্রোবেটিক ভলির সৌজন্যে।
এর মধ্যে সুইজারল্যান্ড ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, ৭২ বছর পর কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার এই যাত্রাকে তারা আরও দীর্ঘ করতে চায়। আচমকাই আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ড্যান এনডোয়ের হেড এবং গ্রানিট জাকার দূরপাল্লার শট ঠেকাতে হয়। এরপর এনদোয়ে আর্জেন্টিনার রাইট-ব্যাক নাহুয়েল মোলিনাকে পরাস্ত করে রিকার্ডো রদ্রিগেজের সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান পাস খেলে মার্তিনেজের পায়ের নিচ দিয়ে বল জালে পাঠান। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী এনদোয়ের এই গোলটি সম্পূর্ণ প্রাপ্য ছিল, কারণ তিনিই ছিলেন সুইসদের আক্রমণের প্রধান ভরসা।
তবে মুরাত ইয়াকিনের দল সমতায় ফেরার পরই ১০ জনের দলে পরিণত হয়। ৭২ মিনেটে আর্জেন্টিনার বক্স থেকে অনেক দূরে সাইড লাইনের ধারে ব্রিল এমবোলো লিয়ান্দ্রো পারেদেসের সঙ্গে কনটাক্ট হওয়ার আগেই ডাইভ দেন। রেফারি জোয়াও পিনহেইরো প্রথমে সিদ্ধান্তটি সুইজারল্যান্ডের পক্ষেই দিয়েছিলেন। পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান তিনি। কিন্তু ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ বা ভুলের সংশোধনের জন্য এক নতুন ধরনের ভিএআর রিভিউতে দেখা যায়, পারেদেসের কোনো সংঘর্ষই হয়নি, বরং এমবোলো ডাইভিং করেছিলেন। ফলে পারেদেসের কার্ড বাতিল করা হয় এবং এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়। সুইসদের হাজারো অভিযোগ সত্ত্বেও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এখানে দৃশ্যমান ছিল। কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়েন এমবোলো। ইনজুরির কারণে জোহান মানজাম্বিকে আগেই হারানো সুইজারল্যান্ড তখন বাধ্য হয়ে ম্যাচটি পেনাল্টি শুটআউটে নিয়ে যাওয়ার লড়াই শুরু করে।
কিন্তু সুইজারল্যান্ডের এই প্রশংসনীয় বিশ্বকাপ যাত্রারও অবসান ঘটে আলভারেজের ওই অবিশ্বাস্য শটের গোলে। টানা তৃতীয় ম্যাচে এভাবে ছিটকে পড়া থেকে বেঁচে যাওয়া আর্জেন্টিনার সমর্থকরা গ্যালারিতে জার্সি উড়িয়ে, তাদের সঙ্গে মেসি-আলভারেজদের নাচিয়ে উদযাপন করেছেন। মেসির কথায় ফুটে উঠেছে, এই দলের হার না মানার মানসিকতার কথা, ‘সামনে আমাদের যে কঠিন লড়াই (ইংল্যান্ড ম্যাচ) অপেক্ষা করছে, তার আগে এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি পার করা আমাদের জন্য খুবই দরকার ছিল। এর ফলে আমরা পরবর্তী ম্যাচের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক একটি সপ্তাহ পাব।’
কোচ স্কালোনি বুঝতে পেরেছেন জিতলেও খেলা ভালো হচ্ছে না, তাই উন্নতির তাগিদ দিয়েছেন শিষ্যদের, ‘আমাদের অনেক কিছু উন্নত করার জায়গা আছে, তবে জেতার চেয়ে ভালো অনুভূতি আর কিছুতে নেই। সব মিলিয়ে এই দলটা আজ যা অর্জন করেছে তা ঐতিহাসিক। হয়তো আমরা আরও ভালো খেলতে পারতাম, কিন্তু আরও একবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়াটা সত্যিই এক ঐতিহাসিক ঘটনা।’
ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে সেমিফাইনাল যে সহজ হবে না, তা বুঝতে পারাটা আর্জেন্টিনার জন্য জরুরি।