তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতা রোধে জাতীয় নীতিমালা

তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে সুরক্ষার জন্য করণীয় নিয়ে জাতীয় গাইডলাইন বা নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে সরকার। এতে গরম থেকে নিজেদের সুরক্ষার উপায় এবং কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধে জাতীয় নির্দেশিকা’ উন্মোচন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কীভাবে এই তাপপ্রবাহ থেকে মানুষকে সুস্থ-সবল রাখা যায় ও তাপপ্রবাহে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া যায়, সেই লক্ষ্যে আমাদের কার্যক্রম চলছে।’

ঢাকায় তাপমাত্রার তীব্রতা বেশি হওয়ার পেছনে গাছ কমে যাওয়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি হলেও ঢাকায় এর তীব্রতা অনেক বেশি। কারণ শহরাঞ্চলে নির্বিচারে গাছপালা কাটা হয়েছে। তাপের তীব্রতা কমাতে হলে গাছ লাগাতে হবে। বনায়ন বাড়াতে হবে।

এই নীতিমালাকে একটি সময়োপযোগী কাজ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বছরই গরম থেমে যাবে এমনটা না। গরম আরও বাড়তে পারে বা এমনই থাকতে পারে। এরই মধ্যে এই নীতিমালা এলাকায় পাঠানো হয়েছে। অনলাইনে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। স্কুলগুলোতেও লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর, ইউনিসেফ বাংলাদেশের ডিপুটি রিপ্রেজেনটেটিভ এমা ব্রিংহাম প্রমুখ।

কী আছে নির্দেশিকায় : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, বাংলাদেশে সব শ্রেণির মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা ও চিকিৎসায় একটি জাতীয় নীতিমালা বা গাইডলাইন তৈরি করেছে সরকার। ইউনিসেফের সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই নীতিমালা তৈরি করে ইতিমধ্যেই তা দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে নীতিমালার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আগের শতকের তুলনায় তাপমাত্রা হঠাৎ করে দ্রুত বেড়ে গেছে। আগে যেটা ১৫-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকত, সেটা এখন ৩০-৩৫ ডিগ্রিতে থাকছে। ২০২৩ সালে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির ওপরে ওঠে এবং এ বছর সেটা ৪০ ডিগ্রির ওপর চলে গেছে। এটা বড় উদ্বেগ।

এই কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে ২৯ এপ্রিল স্বাভাবিক তাপমাত্রা ছিল শুধু দুটি জেলায়। আর সব জেলায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। সে অনুযায়ী হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে। হিট স্ট্রেসে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। মৃত্যুহার ও আক্রান্তের হার দুটোই বেড়ে যায়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে আগেভাগেই গর্ভপাত হতে পারে। এমনকি এই তাপমাত্রা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যাদের রোদের মধ্যে কাজ করতে হয় তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

এই কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ আবহাওয়া তথ্যমতে, তাপমাত্রা যখন ৩৬-৩৭.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তখন তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলে। ৩৮-৩৯.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা যখন ৪০-৪১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, তখন তাকে তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়। এ ছাড়া, তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে তাকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলে। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে তীব্র তাপপ্রবাহ পরিলক্ষিত হয়েছে। সাধারণত এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত গরম বেশি অনুভূত হয়।

তীব্র গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি এমন চার শ্রেণির মানুষের জন্য বিশেষ করণীয় দেওয়া হয়েছে নীতিমালায়। তারা হলোÑ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি, নবজাতক ও শিশু, শ্রমজীবী, গর্ভবতী নারী, রোদে সেবা প্রদানকারী, বয়স্ক ব্যক্তি, চিকিৎসা গ্রহণরত ব্যক্তি ও অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তি। এসব মানুষের চিকিৎসা কী হবে, কখন ও কোন উপসর্গ অনুযায়ী বাসায় চিকিৎসা নিতে পারবে ও হাসপাতালে যেতে হবে, সেসব বলা আছে নির্দেশিকায়।

এই কর্মকর্তা বলেন, শরীরে নিজস্ব তাপ তৈরি হয়। বাইরের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত শরীর গ্রহণ করতে পারে। তাপমাত্রা যখন ৩৫ ডিগ্রি পার হয়ে যায়, তখন আর শরীর সেটা ধারণ করতে পারে না এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, তাপপ্রবাহের কারণে অন্যান্য রোগ-জীবাণু বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি হয়, সংক্রমণ বাড়ে। যেমনÑ জ¦র, কলেরা, হেপাটাইটিস বা জন্ডিস, ডেঙ্গু, পানিশূন্যতা দেখা দেয়। শরীরের ইলেকট্রোলাইটিং ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

নির্দেশিকায় কখন রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার করতে হবে, সেটা বলা আছে। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে ইউনিয়ন সাব-সেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাপপ্রবাহের রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা স্পষ্ট করা হয়েছে।

এ ছাড়া নীতিমালায় দেশে তাপপ্রবাহ প্রতিরোধে সবুজ বনায়নের জন্য বলা হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে কীভাবে গাছ লাগাতে হবে ও সবুজায়ন করতে হবে, সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দেওয়া আছে।

কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন সাব-সেন্টার ও উপজেলা হাসপাতালে দরজা-জানালা দিয়ে পর্যাপ্ত বাতাস আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে। এসব হাসপাতালে সিলিং ফ্যান ও দেয়ালে ওয়াল মাউন্টেন ফ্যান স্থাপন ও বিদ্যুৎ চলে গেলে হাতপাখার ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে। এসবের পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালে সম্ভব হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি) ও কুলার ফ্যান স্থাপন করতে বলা হয়েছে।

জাতীয় নির্দেশিকায় হজের সময় তীব্র গরমের হাত থেকে রক্ষা পেতে ও অসুস্থ রোগীকে সহযোগিতা করতে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বলা হয়েছে, তীব্র তাপপ্রবাহের সময় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি দেওয়াসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

বছরে চারবারের বেশি তাপপ্রবাহের আশঙ্কা ইউনিসেফের : ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে বছরে চারবার বা তার বেশি তাপপ্রবাহ হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের শিশুর ৯৯ শতাংশ বা ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশু প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হবে। অথচ ২০২০ সালে দেশের ৫ শতাংশ বা ২৬ লাখ শিশু এ ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছিল।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিতে অপরিণত শিশু জন্মের ঝুঁকি ৫ শতাংশ বাড়ে এবং তাপপ্রবাহ না থাকা সময়ের তুলনায় তাপপ্রবাহের সময়ে এ হার ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থাৎ তাপপ্রবাহের সময়ে অপরিণত শিশু জন্মের ঝুঁকি অনেক বেশি। তাপপ্রবাহ যত বেশি এবং যত তীব্র হবে ঝুঁকি তত বাড়বে। বাংলাদেশে অপরিণত শিশু জন্মের হার ১৬ শতাংশ, যা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি এবং তাপপ্রবাহে এটি আরও বাড়ে।

ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতি তিন শিশুর একজন বা প্রায় ২ কোটি শিশু প্রতিদিন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। চলমান তাপপ্রবাহ, বন্যা, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট অন্যান্য পরিবেশগত অভিঘাতের মতো বিরূপ আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতিরও শিকার হচ্ছে শিশুরা।