গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফাহ নগরীতে ইসরায়েলকে বড় কোনো অভিযান না চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সতর্ক করার পরও সেখানে ভারী গোলাবর্ষণ শুরু করেছে ইসরায়েল। গত বুধবার রাত থেকে নগরীটিতে তুমুল বোমা হামলা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, এমন বোমা হামলা গত দুই সপ্তাহেও দেখা যায়নি।
এদিকে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস জানিয়েছে, গাজার যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় ইসরায়েলকে আর কোনো ছাড়া দিতে রাজি না তারা। ফিলিস্তিনি ছিটমহলটিতে ইসরায়েলের সাত মাসব্যাপী হামলায় বিরতি টানার লক্ষ্যে কায়রোতে দুপক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে; তার মধ্যেই গত বুধবার রাতে এ কথা জানিয়েছে হামাস।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের কয়েকটি শর্ত নিয়েও আপত্তি তুলেছে তারা। তার অর্থ ইসরায়েল চাইছে সব দিক থেকে তারা লাভবান হতে। কিন্তু হামাসও সেই বিষয়টি মেনে নেবে বলে মনে হয় না। এ অবস্থায় যুদ্ধবিরতির যে আশাটা তৈরি হয়েছিল তা পুরোপুরি উবে গেল আপাতত। গতকাল ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক জাতিসংঘ ত্রাণ সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) এক কর্মী বিবিসিকে বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে কয়েকমাইল দূরে রাফার পূর্বাঞ্চলে ঘন ঘন বোমা হামলা হয়েছে। আর সেই বোমার আঘাতে কেঁপে কেঁপে উঠছে পশ্চিম রাফার ভবন যেখানে তিনি রয়েছেন। এমন হামলার মুখে বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিয়ে এলাকা ছেড়ে যাচ্ছে বেশকিছু গাড়ি। জানালা দিয়ে তা দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন লুইস নামের এই ত্রাণকর্মী। তিনি বলেন, রাফায় এমনকিছু মানুষ আছে যারা বেশিদূর যেতে অপারগ। কারণ তাদের অনেকেই বৃদ্ধ, আবার অনেকেই শিশু। লুইস বলেন, পুরো গাজায় নিরাপদ বলতে জায়গা খুব কম। গাজায় অল্পকিছু অবকাঠামোই দাঁড়িয়ে আছে। এ ছাড়া গাজার আর কোথাও নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে যে, ইসরায়েলি আক্রমণ বাড়তে থাকায় আর স্থল অভিযানের আতঙ্কে সোমবার থেকে প্রায় এক লাখ মানুষ দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফাহ শহর ছেড়েছেন।
এদিতে রাফাহ নগরীতে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন এরই মধ্যে প্রতিশ্রুত বোমার চালান ইসরায়েলে পাঠানো স্থগিত করে তাদের বড় সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইসরায়েলের সেনারা স্থল অভিযানে গাজার ঘনবসতিপূর্ণ রাফাহ নগরীতে ঢুকলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অস্ত্র ও গোলা সরবরাহ করবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
তারপরও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্রগোষ্ঠী হামাসের কয়েকটি ব্যাটালিয়ন রাফায় সক্রিয় থাকার দাবি করে ইসরায়েল সব হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে সেখানে ট্যাংকবহর পাঠিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের হুঁশিয়ারিকে ‘খুবই হতাশাজনক বক্তব্য’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত গিলাদ এরডান। একই মনোভাব দেখিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। তিনি বলেছেন, আমাদের পাশে কে থাকল না থাকল সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের সামনে একটা লক্ষ্য আছে। ইহুদিদের নিরাপদে রাখতে সেটা অর্জনের বিকল্প নেই। হামাসে নির্মূল করতে প্রয়োজনে ইসরায়েল একাই লড়াই চালিয়ে যাবে।
ওদিকে কায়রোতে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় থাকলেও গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফায় ট্যাংক ও বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। শহরটিতে বড় ধরনের আক্রমণ চালানোর হুমকি দিয়েছে তারা। গত মঙ্গলবার ইসরায়েলি বাহিনী গাজা ও মিসরের মধ্যবর্তী রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং দখল করে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ত্রাণ পথটি বন্ধ করে দিয়েছে, এতে গাজার আহত রোগীদের বাইরে নিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথটিও বন্ধ হয়ে গেছে।
কাতারে হামাসের রাজনৈতিক দপ্তরের সদস্য ইজ্জাত এল-রেশিক এক বিবৃতিতে বলেছেন, সোমবার তারা যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাবে রাজি হয়েছে তার থেকে সরবে না।
রয়টার্স জানিয়েছে, এ প্রস্তাবে অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে গাজা থেকে কিছু ইসরায়েলি জিম্মির মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েলে বন্দি কিছু ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুকে মুক্তি দেওয়ার কথাও রয়েছে।
রেশিক বলেছেন, একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে ইসরায়েল আন্তরিক না। তারা রাফায় আক্রমণ ও ক্রসিংটি দখল করতে আলাপ-আলোচনাকে একটি আড়াল হিসেবে ব্যবহার করছে।
এ বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য আসেনি। তবে হামাস যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গ্রহণ করার পর ইসরায়েল জানিয়েছিল, যে তিন ধাপের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা অগ্রহণযোগ্য, কারণ এর শর্তগুলোকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে।
এদিকে দিন যত যাচ্ছে গাজায় বাড়ছে ইসরায়েলি আগ্রাসন। গত সাত মাস ধরে উপত্যকাটিতে বর্বর হামলা ও গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে দখলদার দেশটি। অবরুদ্ধ এ উপত্যকার এমন কোনো স্থান বাকি নেই যেখানে ইসরায়েল হামলা চালায়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত সাত মাসে গাজায় দখলদার বাহিনীর হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৯০৪ জনে। এ ছাড়া একই সময়ের মধ্যে আরও ৭৮ হাজার ৫১৪ জন আহত হয়েছে।